৪৮ বছরে বিএনপি : জনতার প্রত্যাশার রাজপথে
এম. এম হায়দার আলী
ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের আস্থার জন্য রাজনীতি, ৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির সামনে এখন নতুন পরীক্ষার সময়
রাজনীতির ইতিহাসে ৪৮ বছর কোনো ছোট সময় নয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকা শুধু সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় নয়, এটি সেই দলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, কর্মীদের ত্যাগ এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতারও প্রতিচ্ছবি। নানা প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন-সংগ্রাম, নেতৃত্বের সংকট ও কঠিন সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আজ ৪৮ বছরে পা দিচ্ছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে। সেই পথ কখনো মসৃণ ছিল না। রাজনীতির মাঠে যেমন এসেছে সাফল্য, তেমনি এসেছে পরাজয়, এসেছে কঠিন পরীক্ষা।
কিন্তু প্রতিটি সংকটের মধ্য দিয়ে দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন প্রজন্ম এবং অসংখ্য মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশা। বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সবচেয়ে কঠিন সময়েও দলের নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা দলটির নেতাকর্মীদের কাছে গভীরভাবে স্মরণীয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, প্রতিকূলতা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখার কারণে তিনি বিএনপির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম হয়ে আছেন। তারই রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বিএনপির সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললেই হবে না—আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর দিতে হবে। কারণ জনগণ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় বাস্তব পরিবর্তন। আর এখানেই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি তার কেন্দ্রীয় কার্যালয় কিংবা শীর্ষ নেতৃত্বে নয়—তার আসল শক্তি ছড়িয়ে থাকে গ্রামের মেঠোপথে, ইউনিয়নের চায়ের দোকানে, ওয়ার্ডের অলিগলিতে, উপজেলা-জেলা পর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে। দিনের পর দিন যারা মামলা-মোকদ্দমা, নির্যাতন, হয়রানি, আর্থিক সংকট কিংবা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের পাশে থেকেছেন, বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে তাদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ত্যাগের ইতিহাস যেমন স্মরণ করতে হয়, তেমনি আত্মসমালোচনার সাহসও থাকতে হয়।
কারণ একটি দল যত বড় হয়, তার দায়িত্বও তত বড় হয়। বিএনপির সামনে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দলটি কি শুধু একটি নির্বাচনী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে, নাকি একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের আরও শক্তিশালী করবে?
জনগণের কাছে রাজনীতির সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ক্ষমতা নয়, বিশ্বাস। আজ দেশের মানুষ দ্রব্য মূল্যের চাপ থেকে মুক্তি চায়। তরুণরা চায় কর্মসংস্থান। কৃষক চায় তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য। ব্যবসায়ী চায় নিরাপদ পরিবেশ। সাধারণ নাগরিক চায় আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা।
মানুষ চায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। এই প্রত্যাশাগুলোর উত্তর দিতে না পারলে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস কিংবা জনপ্রিয় স্লোগান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হোক শুধু উৎসবের দিন নয়,হোক আত্ম বিশ্লেষণের দিন। শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটির উত্তরাধিকার বহন করতে হলে নেতৃত্বকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও হতে হবে আরও সংযত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনবান্ধব।
দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেন অবহেলিত না হন এবং সংগঠনের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহিতা যেন শক্তিশালী হয়,এ প্রত্যাশা বিএনপির সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও। কারণ রাজনীতি ব্যক্তির জন্য নয়,রাজনীতি মানুষের জন্য। একটি দলের দীর্ঘায়ু নির্ভর করে জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর। জনগণ যদি মনে করে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের কথা বলছে, তাদের অধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম,তবেই সেই দল ইতিহাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি অনেক ঝড় দেখেছে। সামনে হয়তো আরও অনেক রাজনৈতিক ঝড় অপেক্ষা করছে। কিন্তু ঝড় যত বড়ই হোক, একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হওয়া উচিত জনগণের আস্থা। তাই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই দিনে বিএনপির প্রতি প্রত্যাশা একটাই,অতীতের ত্যাগকে সম্মান করে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে আরও শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এগিয়ে যাক দলটি। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম, তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত লাখো নেতাকর্মীর ত্যাগ যেন একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়।
৪৮ বছরের পথচলা শেষ নয়,এটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি এগিয়ে যাক,গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানুষের অধিকার ও দেশের কল্যাণের পথে। এটাই হোক ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রত্যাশা। একই সাথে বিএনপি’র এই মাহেন্দ্রক্ষণে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন, ভালোবাসা এবং শুভকামনা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট












