শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫২ অপরাহ্ণ
আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রকৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য একটি মূল্যবান সম্পদ। এই উপলব্ধিই আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবসের মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নদী, সমুদ্র ও স্থলভাগের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবন উপকূলীয় জীবন, জীববৈচিত্র্য ও মানবসভ্যতার সুরক্ষায় প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে। এই গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতি বছর ২৬ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস। ১৯৯৮ সালে ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের বিরুদ্ধে পরিবেশকর্মী হেইকো মেইনা’র আত্মত্যাগের স্মরণে ইউনেস্কো ২০১৫ সালে দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো ম্যানগ্রোভের দ্রুত অবক্ষয় সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে সরকার, বিজ্ঞানী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত পরিবেশে নিউমাটোফোর বা শ্বাসমূলের মাধ্যমে টিকে থাকা ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা বর্ম। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ৫০০ মিটার প্রশস্ত একটি ম্যানগ্রোভ বেল্ট সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি ৫০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া সিডর, আইলা, আম্পান ও রিমালের মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে সুন্দরবন উপকূলের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনন্য। অসংখ্য মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন ও খাদ্যের প্রধান উৎস হওয়ায় একে “সামুদ্রিক জীবনের নার্সারি” বলা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ম্যানগ্রোভ বন সাধারণ স্থলজ বনাঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। এর মাটি ও শিকড়ে সংরক্ষিত এই কার্বনকে “ব্লু কার্বন” বলা হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু কিছু গাছ বাঁচানো নয়; বরং পুরো জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক জীবনচক্রকে সচল রাখা। এর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া ও গরানের মতো অনন্য উদ্ভিদ রক্ষা করা, বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন ও বিভিন্ন পাখির আবাসস্থল সুরক্ষিত রাখা, চোরা শিকার, অবৈধ সম্পদ আহরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন বনায়ন ও নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কঠোর আইনি বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা।

পৃথিবীর ১২৩টি ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় দেশে বর্তমানে প্রায় ১,৪৭,২৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ বন বিস্তৃত। এর প্রায় ৪৭ শতাংশই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো ও অস্ট্রেলিয়ায়। প্রায় ৭০ প্রজাতির প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রে ৫,৭০০-এর বেশি প্রাণী প্রজাতি সরাসরি নির্ভরশীল। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এটি প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ রক্ষা করে এবং ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ৪১ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীর জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে ম্যানগ্রোভ প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, চিংড়ি চাষের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের কারণে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ অঞ্চল বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং জীববৈচিত্র্য আইন, ২০১৭-এর আওতায় সুন্দরবন সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে এবং সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের মাধ্যমে এর ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অবিভক্ত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে প্রায় ১০,২৭৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে এবং ৪,২৬০ বর্গকিলোমিটার ভারতে অবস্থিত। ভারতের সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান ১৯৮৭ সালে এবং বাংলাদেশের সুন্দরবন পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করে। এটি বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বসবাস করে। পাশাপাশি এটি চিত্রা হরিণ, গঙ্গা ও ইরাবতী ডলফিন, লবণাক্ত পানির কুমিরসহ তিন শতাধিক প্রজাতির পাখি ও ১২০টির বেশি প্রজাতির মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও প্রজননকেন্দ্র।

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ধারাবাহিক ধ্বংসের পেছনে কাজ করছে বেশ কিছু মারাত্মক বাণিজ্যিক ও মানবসৃষ্ট হুমকি। উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি ও মাছের ঘের স্থাপনের ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শিল্পকারখানা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণ পানি ও বায়ুকে দূষিত করছে। বড় নৌযানের তেল দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শ্বাসমূলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরী গাছে ‘টপ ডাইং’ রোগ দেখা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এই বাস্তুতন্ত্রকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গত চার দশকে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ বন বিলুপ্ত হয়েছে এবং এটি এখনও অন্যান্য বনাঞ্চলের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ দ্রুত হারে হারিয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউনেস্কো, ইউএনইপি, আইইউসিএন ও গ্লোবাল ম্যানগ্রোভ অ্যালায়েন্সের পাশাপাশি আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বন পর্যবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় উপকূলীয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, জলাধারগুলোর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা নিশ্চিত করা, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় শিল্পায়ন ও দূষণ রোধে কঠোর নজরদারি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ, স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্লু কার্বনভিত্তিক গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ম্যানগ্রোভ হারালে শুধু একটি বন হারায় না; হারিয়ে যায় উপকূলের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়, খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি এবং জলবায়ুর ভারসাম্য। তাই ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি উপকূলীয় নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কার্যকর আইন প্রয়োগ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অমূল্য বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দায়িত্ব।

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী