আন্তর্জাতিক রেঞ্জার দিবস: প্রকৃতি সংরক্ষণের অগ্রসৈনিক
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রকৃতি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি। বন, নদী, পাহাড়, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিরও ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, দূষণ, ভূমি দখল এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে পৃথিবীর পরিবেশ আজ এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। এই সংকটময় সময়ে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন রেঞ্জাররা।
প্রতি বছর ৩১ জুলাই বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক রেঞ্জার দিবস পালিত হয়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় রেঞ্জারদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানাতে এবং কর্তব্যরত অবস্থায় আহত বা নিহত রেঞ্জারদের স্মরণে আন্তর্জাতিক রেঞ্জার ফেডারেশন (আইআরএফ)-এর উদ্যোগে এবং দ্য থিন গ্রিন লাইন ফাউন্ডেশন’ সহযোগিতায় এই দিবসটি উদযাপিত হয়। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইআরএফ-এর প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক রেঞ্জার দিবস পালিত হয়, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে রেঞ্জারদের কার্যক্রম ও আত্মত্যাগকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে আইআরএফ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেঞ্জার সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক রেঞ্জার ফেডারেশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী রেঞ্জার কেবল বন পাহারা দেওয়া কর্মী নন; বরং তাঁরা হলেন এমন পেশাদার ব্যক্তি, যিনি প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, সংরক্ষিত এলাকা, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ রক্ষায় সরকারি, বেসরকারি, আদিবাসী, সম্প্রদায়ভিত্তিক কিংবা স্বেচ্ছাসেবী ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষিত এলাকা কার্যকরভাবে রক্ষার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৫ লাখ অতিরিক্ত রেঞ্জারের প্রয়োজন হতে পারে।
রেঞ্জারদের কাজ বহুমাত্রিক ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তাঁরা বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা, অবৈধ শিকার ও বন উজাড় প্রতিরোধ, পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ, গবেষণায় সহায়তা, বন অগ্নিকান্ড মোকাবিলা এবং দুর্যোগকালীন উদ্ধার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আধুনিক যুগে জিপিএস, ড্রোন, স্যাটেলাইট তথ্য ও স্মার্ট প্যাট্রোলিং প্রযুক্তি তাঁদের কাজকে আরও কার্যকর করেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ কাঠ ও বন্যপ্রাণী পাচারসহ নানা চ্যালেঞ্জ তাঁদের দায়িত্বকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশ্বের অনেক দেশে রেঞ্জাররা জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আদিবাসী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রেঞ্জারদের অবদান শুধু পরিবেশগত নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে সুস্থ বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বায়ু বিশুদ্ধ রাখে, পানির উৎস সংরক্ষণ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রোগের বিস্তার কমাতে ভূমিকা রাখে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে ব্যবহৃত বহু আধুনিক ওষুধের উৎস উদ্ভিদ, অণুজীব ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ফলে বন্যপ্রাণী, আবাসস্থল এবং সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা এবং প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে রেঞ্জাররা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেঞ্জারদের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সুন্দরবন, পার্বত্য ও উপকূলীয় বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সাফল্যের পেছনে বন বিভাগের রেঞ্জার, ফরেস্টার ও বনপ্রহরীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের শত শত প্রশাসনিক রেঞ্জ এলাকায় তাঁরা বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দিনরাত কাজ করছেন। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকায় কর্মরত রেঞ্জারদের দায়িত্ব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, লজিস্টিক সহায়তা এবং ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্গম পরিবেশ, বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি ও সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও তাঁরা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করছেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, ডলফিনসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
বিশ্ব রেঞ্জার দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য “রেঞ্জাররা: পরিবর্তনশীল পৃথিবীর অভিভাবক” বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে রেঞ্জাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নানা ঝুঁকি, প্রতিকূলতা ও আত্মত্যাগের মধ্যেও তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। তাই রেঞ্জারদের নিরাপত্তা, দক্ষতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। আন্তর্জাতিক রেঞ্জার দিবসে এই নীরব প্রহরীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।












