ম্যানগ্রোভ ও সমুদ্রের মেলবন্ধন: বিশ্ব পর্যটনে সুন্দরবনের নতুন দুয়ার
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশ বলতেই বিশ্বমঞ্চে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের নাম।আমাদের গর্ব, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। হরিণের পাল, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, রূপালী নদী আর গহিন সবুজ নিয়ে সুন্দরবন সবসময়ই আলোচনার শীর্ষে। কিন্তু এই সবুজ অরণ্যের কোল ঘেষেই যে লুকিয়ে আছে এক রূপসী সমুদ্র, সে খবর কজন রাখে? কটকা, জামতলা, কচিখালী কিংবা দুবলার চরের মতো অনবদ্য সৈকতগুলো আজও আমাদের পর্যটনের মূল স্রোতে আড়ালেই রয়ে গেছে। অথচ একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশকে একদম নতুনভাবে চেনানোর শক্তিশালী জাদু লুকিয়ে আছে এই নীরব সৈকতগুলোতেই।
গবেষণা ও বৈশ্বিক পর্যটন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে গত এক দশকে প্রথাগত বিলাসিতার চেয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রকৃতি ভ্রমণ এবং সবুজ পর্যটনের চাহিদা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের জন্য। তবে আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, এই গহিন অরণ্যের কোলে লুকিয়ে থাকা সমুদ্র সৈকতগুলো বৈশ্বিক ইকো-ট্যুরিজমের এমন এক অনাবিষ্কৃত স্বর্ণখনি, যা সঠিক আন্তর্জাতিক কৌশল গ্রহণ করলে বাংলাদেশকে রাতারাতি বিশ্ব রূপালী অর্থনীতির শীর্ষে পৌঁছে দিতে পারে। সুন্দরবনের কটকা, জামতলা, কচিখালী এবং দুবলার চরের মতো সমুদ্র সৈকতগুলো কেবল মনোরম প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারের জন্য এক অতি-মূল্যবান এবং বিরল ইকো-সম্পদ।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র মালদ্বীপ, থাইল্যান্ডের ফুকেট কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি মূলত সমুদ্রের নীল পানি, কৃত্রিম রিসোর্ট এবং সাদা বালুকাবেলা নির্ভর পর্যটন মডেল অনুসরণ করে। তবে পর্যটন গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিবেশসচেতন উচ্চ আয়ের পর্যটকরা এখন কৃত্রিম রিসোর্ট ছেড়ে কম অন্বেষণ করা নির্জন প্রকৃতির সন্ধান করছেন। ঠিক এখানেই সুন্দরবনের রূপালী উপকূল অন্য যেকোনো দেশের সৈকতের চেয়ে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে। বিশ্বের অধিকাংশ সমুদ্র সৈকতে কেবল সুনীল জলরাশি দেখা যায়, কিন্তু সুন্দরবনের কটকা বা জামতলায় একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক একই সাথে দেখতে পান ম্যানগ্রোভের সবুজাভ গভীরতা, সৈকতের বালিয়াড়িতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রা হরিণের পায়ের ছাপ এবং সমুদ্রের দিগন্তজোড়া নীরবতা। এই বহুমুখী ইকো-সিস্টেম বিশ্ব পর্যটনে বাংলাদেশের এক পরম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে।আন্তর্জাতিক উচ্চমানের পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রথাগত অবকাঠামো চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে পুরোপুরি আধুনিক এবং যুগোপযোগী কিছু গবেষণাধর্মী সবুজ উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।
প্রথমত, জিরো-ইমপ্যাক্ট ভাসমান রিসোর্ট এবং পরিবেশবান্ধব গাছবাড়ি ধারণা। কাদার ওপর ইট-কংক্রিট গেঁথে হোটেল নির্মাণের বদলে ম্যানগ্রোভের খালের ওপর ভেসে থাকা হালকা কাঠের তৈরি ভাসমান ঘর নির্মাণ করা যেতে পারে। এসব আবাসে ব্যবহৃত হবে সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ এবং বিশ্বমানের বায়ো-ডাইজেস্টার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ইউরোপ বা আমেরিকার একজন উচ্চ আয়ের আন্তর্জাতিক পর্যটক কৃত্রিম পাঁচ তারকা হোটেল ছেড়ে খালের শান্ত পানিতে ভেসে থেকে ম্যানগ্রোভের রাতে তারা দেখার অনুভূতি পেতে প্রতি রাতে বিশাল অংকের অর্থ খরচ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।
দ্বিতীয়ত, দুবলার চর এবং আলোরকোলকে কেন্দ্র করে সাগরের জীবন্ত জীবনধারা ও কৃত্রিমতা মুক্ত লোকজ মেলা গড়ে তোলা। বিদেশি পর্যটকরা শুধুমাত্র দৃশ্য দেখতে আসেন না, তারা মানুষের গল্প ও জীবন সংগ্রাম জানতে ভালোবাসেন। জেলেদের সাথে প্রথাগত উপায়ে সাগরে মাছ ধরা পর্যবেক্ষণ করা, অর্গানিক উপায়ে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ দেখা এবং স্থানীয় সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ নেওয়ার এক অনন্য প্যাকেজ তৈরি করা সম্ভব। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্লু-ইকোনমি বা রূপালী অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করবে।
তৃতীয়ত, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা রক্ষায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সংবেদনশীল বন্যপ্রাণী এলাকায় অতিরিক্ত পর্যটকদের পায়ের ছাপ না ফেলে বিশেষ ক্যামেরা ট্রেইল, অনুকরণীয় বাস্তবতা এবং দূরবীন পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের মাধ্যমে পর্যটন পরিচালনা করা সম্ভব। এমনকি রাতে সমুদ্রে প্রাকৃতিকভাবে আলো ছড়ানো মাইক্রো-জীবের দীপ্তি দেখার জন্য নিয়ন্ত্রিত তারকা অবলোকন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যা বৈশ্বিক পর্যটকদের গভীরভাবে আকর্ষণ করবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একজন আন্তর্জাতিক পর্যটকের দৈনিক ব্যয় প্রথাগত দেশীয় পর্যটকের চেয়ে গড়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। সুন্দরবনের এই উপকূলীয় সৈকতগুলোকে ঘিরে যদি বাৎসরিক একটি নিয়ন্ত্রিত উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম ইকো-ট্যুরিজম চালু করা যায়, তবে কেবল এই খাত থেকেই প্রতিবছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। আর এই বিপুল অর্থনৈতিক রাজস্বের প্রত্যক্ষ সুফল পাবে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনগোষ্ঠী। বন নির্ভর বাওয়ালী, মাওয়ালী ও জেলে পরিবারের সদস্যরা পর্যটক নির্দেশক, নৌকা চালক, স্থানীয় হস্তশিল্প উদ্যোক্তা এবং ইকো-হোমস্টে পরিচালকে রূপান্তরিত হবেন। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এলে বনের সম্পদ অবৈধভাবে আহরণের হার শূন্যে নেমে আসবে এবং স্থানীয়রাই সুন্দরবনের প্রধান রক্ষকে পরিণত হবেন।
এই পুরো মহাপরিকল্পনা সফল করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার ও প্রশিক্ষিত ইকো-ট্যুরিজম জনবল। আর ঠিক এই কৌশলগত ভূমিকাটি সফলভাবে পালন করছে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। সুন্দরবনের উপকণ্ঠে অবস্থিত হওয়ায় এই ইনস্টিটিউটটি বৈশ্বিক পর্যটনের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষভাবে দক্ষ ও কারিগরি মানবসম্পদ গড়ে তোলার এক অনন্য আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে। আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিদেশি ভাষার দক্ষতা, আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা কৌশল, বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ নীতি এবং পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট পরিচালনায় বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করছে। আমাদের তৈরি এই তরুণ গবেষক ও দক্ষ মানবসম্পদই আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে পারবে, যা বৈশ্বিক পর্যটন অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে সুন্দরবনের সমুদ্র সৈকতগুলোকে ব্র্যান্ডিং করতে “ঝঁহফধৎনধহং ঈড়ধংঃধষ ঊপড়-ঊীঢ়বৎরবহপব” নামে বৈশ্বিক প্রচারণা চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিশ্বখ্যাত ট্রাভেল আইকন এবং বিশিষ্ট ওয়াইল্ডলাইফ সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাদের এই নীরব অলৌকিক সৌন্দর্যের গল্প বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে হবে।
সুন্দরবনের কটকা, জামতলা কিংবা দুবলার চরের মতো সমুদ্র সৈকতগুলো কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত নয়, এগুলো রূপালী অর্থনীতির এক মহাজাগতিক চাবিকাঠি। সঠিক পরিবেশবান্ধব গবেষণা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, বিশ্বমানের মার্কেটিং এবং আমাদের সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দক্ষ জনবলকে কাজে লাগাতে পারলে এই উপকূল বিশ্ব ইকো-ট্যুরিজমের ইতিহাসে এক সোনালী বিপ্লব ঘটাবে।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












