সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বর্ষা বাংলাদেশের প্রাণ। কৃষকের মাঠে সবুজের সমারোহ, নদীর বুকে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য, প্রকৃতির নবজাগরণÑসবকিছুর সঙ্গে বর্ষার এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের লাখো মানুষের কাছে বর্ষা আনন্দের নয়, বরং এক অজানা আতঙ্কের নাম। আষাঢ়ের প্রথম মেঘ আকাশে জমলেই সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের মানুষ উৎকণ্ঠায় দিন গুনতে শুরু করেন। তাদের চোখে ভেসে ওঠে ভাঙা বেড়িবাঁধ, লোনা পানিতে ডুবে যাওয়া জনপদ, ভেসে যাওয়া ফসলের মাঠ এবং আশ্রয়হীন মানুষের দীর্ঘশ্বাস।উপকূলবাসীর এই আতঙ্কের কারণও বাস্তব। চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের অন্তত ৪০টি পয়েন্টে ফাটল, ধস ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। আশাশুনির তেঁতুলিয়া সেতু সংলগ্ন মরিচ্চাপ নদীর তীর ভাঙন, প্রতাপনগরের কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালী ও চাকলা এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ, আনুলিয়ার কাকবাসিয়া ও বিছট গ্রামের ভয়াবহ ভাঙন, অন্যদিকে শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া ও মুন্সিগঞ্জের বাঁধের দুর্বলতাÑসব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।প্রকৃতপক্ষে, উপকূলের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি তাদের জীবনরেখা। এই বাঁধই লোনা পানির আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির-মসজিদ, বাজার ও জীবন-জীবিকাকে। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটি সরে যায় না, ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্নও।উপকূলের মানুষের দুর্ভোগের ইতিহাস নতুন নয়। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান এবং ২০২১ সালের ইয়াসের কথা এখনও মানুষের মনে জীবন্ত। বিশেষ করে আইলা সাতক্ষীরার ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে। বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছিল। বহু এলাকায় মাসের পর মাস লোনা পানি আটকে ছিল। কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে, মিঠা পানির উৎস নষ্ট হয়ে যায়, শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। আজও আশাশুনি ও শ্যামনগরের অনেক পরিবার আইলার ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা, কেউ হারিয়েছেন আবাদি জমি, কেউবা বাধ্য হয়েছেন পেশা পরিবর্তন করতে। জলবায়ু উদ্বাস্তু শব্দটি একসময় বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু আজ তা উপকূলের বাস্তবতা। সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন একটি বড় সংকট। কপোতাক্ষ, মরিচ্চাপ, খোলপেটুয়া, কালিন্দী, কদমতলী ও মালঞ্চ নদীর তীব্র স্রোত অনেক জায়গায় বাঁধের গোড়া দুর্বল করে দিচ্ছে। নদীভাঙন এখন শুধু জমি গ্রাস করছে না, পুরো জনপদকে অনিরাপদ করে তুলছে।আশাশুনির গোয়ালডাঙ্গা বাজার এলাকায় মরিচ্চাপ নদীর ভাঙন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাজারের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। একইভাবে কুড়িকাউনিয়া, বিছট ও কাকবাসিয়ার মানুষও প্রতিদিন ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন।বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান এক শতাংশেরও কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবের শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আর সেই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনÑসবকিছু মিলে উপকূলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকা স্থায়ীভাবে লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে শুধু বাঁধ সংস্কার নয়, জলবায়ু অভিযোজনের বৃহত্তর পরিকল্পনাও জরুরি হয়ে উঠেছে।প্রতিবছর বর্ষার আগে কিংবা কোনো দুর্যোগের পরে বাঁধ সংস্কারের কাজ হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সেই সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কয়েক মাস বা এক-দুই বছরের মধ্যেই আবার ভাঙন দেখা দেয়।অনেক সময় প্রকল্প গ্রহণ করা হয় জরুরি প্রয়োজনের ভিত্তিতে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন, বাঁধের কাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা বৈজ্ঞানিক নকশা বাস্তবায়নে গতি দেখা যায় না। ফলে জনগণের করের টাকা ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায় না। উপকূলবাসীর অভিযোগ, ভাঙন যখন শুরু হয় তখন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তখন তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু হয়। এতে ব্যয় বাড়ে, কিন্তু কার্যকারিতা কমে। অনেকে মনে করেন, বেড়িবাঁধ ভাঙন কেবল স্থানীয় সমস্যা। বাস্তবে বিষয়টি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম চিংড়ি উৎপাদন অঞ্চল। এখানকার হাজার হাজার হেক্টর ঘের এবং কৃষিজমি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একটি বড় বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু কয়েকটি গ্রাম নয়, পুরো অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।লোনা পানি প্রবেশ করলে ধান, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন কমে যায়। পুকুরের মাছ মারা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একটি ভাঙনের প্রভাব বহু বছর ধরে চলতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উপকূলীয় বাঁধকে শুধু মাটির বাঁধ হিসেবে দেখার সময় শেষ। বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন আধুনিক ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো।
এর জন্য প্রয়োজনÑবাঁধের উচ্চতা ও প্রস্থ বৃদ্ধি;নদীতীর সংরক্ষণে কংক্রিট ব্লক ও জিওটেক্সটাইল ব্যবহার; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী স্লোপ প্রটেকশন; নিয়মিত ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ; স্থানীয়জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি মনিটরিং; নদীশাসন ও ড্রেজিংয়ের সমন্বিত পরিকল্পনা;দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল গঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস, সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে আধুনিক বাঁধ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ করেছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপকূল রক্ষায় নতুন মডেল তৈরি করতে পারে। উপকূলের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। তারা চান নিরাপত্তা। তারা চান এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বর্ষার মেঘ দেখলে ভয় নয়, স্বস্তি অনুভব করবেন। তারা চান তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নদীগর্ভে হারিয়ে না যাক। আশাশুনির একজন কৃষকের ঘর, শ্যামনগরের একজন জেলের নৌকা কিংবা গাবুরার একজন শিক্ষার্থীর স্কুলÑসবকিছুই একটি নিরাপদ বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। তাই বেড়িবাঁধের প্রশ্নটি কেবল প্রকৌশলগত নয়; এটি মানবিক, সামাজিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
প্রতি বছর দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা, ত্রাণ বিতরণ করা কিংবা নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আজ যদি ঝুঁকিপূর্ণ ৪০টি পয়েন্টে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে আগামী দিনের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় আবারও কোনো এক ঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের পর আমরা উপকূলবাসীর কান্না দেখব, সহানুভূতি জানাব, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। উপকূলের মানুষের প্রশ্ন তাই শুধু সাতক্ষীরার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের প্রতি এক নীরব আবেদনÑ “আর কতবার ভাসতে হবে?” রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আজ সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। কারণ টেকসই বেড়িবাঁধ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নাম নয়; এটি উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। লেখক: সংবাদকর্মী