‘এক গ্রাম, এক শিল্প’: গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লবের রূপরেখা
সম্পাদকীয়
একটি দেশের টেকসই ও সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে তার গ্রামীণ জনপদের বিকাশের মধ্যে। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে নগরায়ণ ও শিল্পায়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলেও, গ্রামীণ অর্থনীতির চিরাচরিত কাঠামোকে আধুনিক ও স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এখনও নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আলোচিত ‘এক গ্রাম, এক শিল্প’ (ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট বা ওভিওপি মডেলের আদলে) ভাবনার বাস্তবায়ন গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারে। সরকারের এই উদ্যোগটি প্রাথমিকভাবে পাইলট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে।
‘এক গ্রাম, এক শিল্প’ ধারণার মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে গ্রামীণ জনশক্তির সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করার মধ্যে। আমাদের গ্রামে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত বা লক্ষ্যহীন শ্রম রয়েছে, যা সঠিক নির্দেশনার অভাবে জাতীয় উৎপাদনে অবদান রাখতে পারছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা যদি বাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু পালন কিংবা শাকসবজি চাষের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগকে একটি পরিকল্পিত কাঠামোর আওতায় এনে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তবে তা গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া, ১০ বছর বয়স থেকেই শিশুদের অর্থনৈতিক সচেতনতা ও কর্ম ব্যবস্থাপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার যে দর্শন এই উদ্যোগে রয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কর্মবিমুখ তাত্ত্বিক শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তবমুখী ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। শিক্ষা ও কর্মকে একে অপরের পরিপূরক করে তোলার এই চিন্তা আধুনিক যুগের চাহিদা।
তবে, সেমিনারে প্রধান অতিথি খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন যথার্থই বলেছেনÑযেকোনো নতুন উদ্যোগ নেওয়া সহজ, কিন্তু তার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। ‘এক গ্রাম, এক শিল্প’ প্রকল্পকে কেবল সরকারি ফাইলের লাল ফিতায় বন্দি না রেখে মাঠপর্যায়ে সফল করতে হলে ত্রিবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি গ্রামের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে সঠিক পণ্য বা খাতটি বেছে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, গ্রামে উৎপাদিত কাঁচামাল বা কৃষি পণ্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণের (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, হিমাগার ও ক্ষুদ্র শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা। এবং তৃতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এড়িয়ে উৎপাদকের উৎপাদিত পণ্য যাতে সরাসরি শহুরে বাজার বা পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত হতে পারে, তার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন বা রুট তৈরি করা।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল সরকারের একার পক্ষে বা একক কোনো দপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিন, সমাজসেবা কার্যালয়, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারি-বেসরকারি সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবেÑএই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে গ্রামীণ সম্পদ, শ্রম এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর এখনই সময়। ‘এক গ্রাম, এক শিল্প’ উদ্যোগটি যদি প্রতিটি গ্রামের নিজস্ব ঐতিহ্য ও কাঁচামালকে ব্র্যান্ডিং করতে পারে, তবে তা শুধু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানই উন্নত করবে না, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে। আমরা আশা করি, খুলনা বিভাগ থেকে শুরু হওয়া এই দূরদর্শী উদ্যোগটি সব বাধা পেরিয়ে দ্রুত দেশব্যাপী সফল রূপ লাভ করবে।






