কটূক্তি পেরিয়ে বাইশ গজে বিচারকের ভূমিকায় সাতক্ষীরার রাখি
আসাদুজ্জামান সরদার: একসময় মাঠে ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার পথে শুনতে হতো নানা সামাজিক কটূক্তি। নারী হয়ে ব্যাট-বল হাতে তুলে নেওয়াটাই যেন ছিল স্থানীয় অনেকের কাছে বিস্ময় আর অনভিপ্রেত। সেই চেনা প্রতিবন্ধকতা ও বাঁকা কথাকে পেছনে ফেলে বাইশ গজে নিজের নতুন পরিচয় নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরার মেয়ে ফাতিমাতুজ জোহরা রাখি। ঢাকা লীগের নিয়মিত এই ক্রিকেটার এবার উত্তীর্ণ হয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আম্পায়ারিং পরীক্ষায়; দাঁড়িয়েছেন ম্যাচ পরিচালনার মতো দায়িত্বশীল পদে।
ক্রিকেটের পাশাপাশি আম্পায়ারিং ও কোচিং-তিন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নারী ক্রিকেটকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন রাখি। সম্প্রতি নিজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প, সামাজিক কাঠগড়া পেরিয়ে আম্পায়ারিংয়ে আসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
কটূক্তি থেকে অর্জিত হাততালি
সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসার পথটা একেবারেই সুগম ছিল না রাখির। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের প্রাথমিক দিনগুলোতে প্রতিকূল সামাজিক আবহ সামলাতে হয়েছে তাঁকে।
রাখি বলেন, উঠে আসার গল্পটা অনেক বাধা ডিঙিয়ে তৈরি। এখন নারী ক্রিকেটারদের যেভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না। রাস্তায় চলাচলের সময় প্রায়ই কটু কথা শুনতে হতো।
তবে সময়ের আবর্তে পাল্টেছে সেই দৃশ্যপট। একসময় যারা সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তারাই এখন জয়ের বার্তা পাঠান। রাখির ভাষায়, যাঁরা একসময় বাঁকা চোখে দেখতেন, তাঁরাই এখন উৎসাহ দেন। এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত জয় নয়, নারী ক্রিকেটের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের স্পষ্ট প্রমাণ।
খেলোয়াড় থেকে ম্যাচ পরিচালনায়
মাঠের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই খেলাটির অন্যান্য কারিগরি দিক, যেমন-আম্পায়ারিং ও কোচিংয়ে যুক্ত হওয়ার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। জেলা থেকে বিসিবির আম্পায়ারিং কোর্সের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সুযোগটি কাজে লাগান রাখি।
পরীক্ষায় সাফল্য লাভের পর রাখির প্রতিক্রিয়া, একজন খেলোয়াড় আর একজন আম্পায়ারের দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, যা সবাইকে মেনে নিতে হয়। কোর্সে অংশ নেওয়ার ফলে ক্রিকেটের সূক্ষ্ম আইনকানুন গভীরভাবে শেখার সুযোগ হয়েছে। বিসিবির প্রস্তুতি পর্বে ম্যাচ শুরুর সময়সীমা, পরিবর্তনশীল আবহাওয়া বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল রপ্ত করতে হয়েছে তাঁকে।
ঢাকা লীগের অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রেরণা
ঢাকা লিগে খেলার অভিজ্ঞতা আম্পায়ারিংয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন রাখি। ম্যাচ চলাকালীন চাপ, খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব এবং মাঠের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের সাহস জোগাবে তাঁর মাঠের ক্যারিয়ার। পুরুষদের ঘরোয়া লিগে দায়িত্ব পালন নিয়ে কোনো মানসিক সংকোচ নেই তাঁর। অগ্রজ রেবেকা সুলতানা রিমাকে অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠদের পথনির্দেশনায় সামনে এগোতে চান তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী আম্পায়ার সাথীরা জাকিয়াকে নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বলে জানান রাখি। উল্লেখ্য, রেবেকা সুলতানা রিমা ও চায়নার পর রাখি যুক্ত হওয়ায় সাতক্ষীরা জেলায় নারী আম্পায়ারের সংখ্যা এখন তিনে দাঁড়াল।

তবে অবকাঠামোগত ঘাটতি নিয়ে সোচ্চার রাখি। নারী আম্পায়ারদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং যাতায়াত ও দূরবর্তী ম্যাচে মানসম্মত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
শিক্ষা, পরিবার ও আগামী
মাঠ সামলানোর পাশাপাশি একাডেমিক ধারাবাহিকতাও বজায় রেখেছেন রাখি। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেছেন প্রথম শ্রেণীতে, বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে করছেন মাস্টার্স।
ভবিষ্যৎ ভাবনায় ক্রিকেটার হিসেবে খেলে যাওয়ার পাশাপাশি আইসিসির প্যানেলভুক্ত আন্তর্জাতিক আম্পায়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রাখি। এছাড়া, নারী ক্রিকেটারদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে কোচ হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
এই দীর্ঘ পথচলায় নিজের বাবা, সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ আকতার হোসেনের অবদানকে সবচেয়ে বড় ভিত্তি হিসেবে দেখেন চার বোনের মধ্যে মেজো এই নারী ক্রিকেটার।
উদীয়মান নারী ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে রাখির আহ্বান-পরিবারকে মেয়েদের স্বপ্নের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। আলাদা মাঠ, জিমনেসিয়াম ও অ্যাকাডেমিক সুবিধা পেলে সাতক্ষীরা থেকে আন্তর্জাতিক মানের আরও অনেক নারী ক্রিকেটার ও ক্রীড়াবিদ তৈরি হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর।






