মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

কবিতার না-বলা বাঙ্গময়তা: হিমশৈলের অন্তরালে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
কবিতার না-বলা বাঙ্গময়তা: হিমশৈলের অন্তরালে

তৈমুর খান
কবিতায় যতখানি বলা থাকে তার অধিক থাকে না বলা। এই না বলাটিকেই পাঠককে আবিষ্কার করতে হয়। কবিতায় যা বলা থাকে, তা আসলে হিমশৈল বা আইসবার্গের চূড়াটুকুর মতো-যা দৃশ্যমান। আর যা বলা থাকে না, তা হলো সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল অংশ। এই চমৎকার ও গভীর বিশাল অংশটির উপলব্ধিই কবিতার আসল প্রাণ। কবিতার এই ‘না বলা’ বা অব্যক্ত বিষয়টি কীভাবে কাজ করে এবং পাঠক হিসেবে আমাদের কেন তা অনুধাবন করতে হয়, তা কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।
শব্দের পরিমিতিবোধ ও ইঙ্গিতের খেলা: গদ্য যেখানে কথা বলে মন খুলে, কবিতা সেখানে কথা বলে মন ছুঁয়ে—খুব অল্প শব্দে, নীরবতার ভাষা দিয়ে। কবিতায় “শব্দের পরিমিতিবোধ” হলো অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ছেঁটে ফেলে কেবল সবচেয়ে ধারালো ও অর্থপূর্ণ শব্দটুকুকে ধরে রাখা। আর “ইঙ্গিতের খেলা” হলো সবকিছু স্পষ্ট না করে শব্দের আড়ালে একটা বড় সত্য বা আবেগকে লুকিয়ে রাখা, যা পাঠক তাঁর নিজের মতো করে আবিষ্কার করবেন তার কল্পনা ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে। সহজ কিছু উদাহরণের সাহায্যে এই পরিমিতিবোধ ও ইঙ্গিতের খেলাটি বোঝা যাক: “সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
জীবনানন্দ দাশ: এখানে ‘অন্ধকার’ আর ‘মুখোমুখি বসিবার’ শব্দগুলোর আড়ালে যে কী বিপুল ক্লান্তি, শান্তি, একাকীত্ব কিংবা আশ্রয় লুকিয়ে আছে, তা কবি আলাদা করে ব্যাখ্যা করেননি। এই না বলা ভাবটুকুই পাঠককে বেশি নাড়া দেয়। শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতার এই চারটে লাইন লক্ষ্য করুন:
আমার তো কিছু নেই না-থাকার মরুদ্যান ছাড়া কোনো দিকে জল নেই, কোনো দিকে ছায়া নেই, তুমি
কেন তবে এই বক্ষে কড়া নাড়ো, হে প্রাচীন ক্ষত? এখন কী চাও বলো, এখন তো সময় সম্পূর্ণ। পরিমিতিবোধে কবি এখানে ভাঙা মন বা একাকিত্বের কোনো দীর্ঘ বিবরণ দেননি। তিনি শুধু দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—’না-থাকার মরুদ্যান’। মরুদ্যান এমনিতে আশার প্রতীক, কিন্তু তার আগে ‘না-থাকার’ বসিয়ে দিয়ে কবি এক নিমিষেই চরম এক শূন্যতার ছবি এঁকে দিলেন।
ইঙ্গিতের খেলায় কবি যখন বলছেন, “কেন তবে এই বক্ষে কড়া নাড়ো, হে প্রাচীন ক্ষত?”-এখানে ‘প্রাচীন ক্ষত’ বলতে তিনি ঠিক কোন পুরনো দুঃখ, কোন ভুল বা কোন হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা বলছেন, তা স্পষ্ট করেননি। এই ‘না বলা’ ইঙ্গিতটুকুই পাঠকের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করে। পাঠক নিজের জীবনের কোনো পুরনো কষ্টের কথা ভেবে লাইনটির সাথে একাত্ম হয়ে যান।
দেশভাগের পটভূমিতে লেখা অমিয় চক্রবর্তীর ‘সংগতি’ কবিতার দুটি লাইন: মেঠো সুরো সুর চিল্কায়,
ওখানে তো কেউ নেই, একা পথ মিল্কায়। পরিমিতিবোধে দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে, দাঙ্গা হয়েছে-এই সব ভয়ানক ইতিহাস কবি মাত্র দুটি লাইনে প্রকাশ করলেন। কোনো কান্নাকাটি বা চিৎকারের শব্দ নেই। ইঙ্গিতের খেলায় ‘ওখানে তো কেউ নেই, একা পথ মিল্কায়’—এই একটি মাত্র লাইনের ইঙ্গিতটি কত গভীর! যে গ্রাম বা যে পথ একসময় মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিল, আজ তা খাঁ খাঁ করছে। মানুষগুলো কোথায় গেল? তারা কি মারা গেছে, নাকি দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে? কবি তা বললেন না। এই নীরব ইঙ্গিতটি দাঙ্গার যেকোনো রক্তাক্ত বিবরণের চেয়েও পাঠককে বেশি স্তব্ধ করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্লান্তি’ কবিতার এই অংশটুকু দেখা যাক: পথের প্রান্তরে আমার এই ক্লান্তি, তোমার ওই করুণ চোখে হোক শান্তি। পরিমিতিবোধে জীবনের দীর্ঘ লড়াই, ব্যর্থতা আর অবসাদকে কবি কেবল একটি শব্দে বেঁধে ফেললেন-’ক্লান্তি’। আর সেই লড়াইয়ের পর যার কাছে একটু আশ্রয় পাওয়া যায়, তাঁর ভালোবাসাকে কোনো বিশেষণ না দিয়ে শুধু বললেন ‘করুণ চোখ’।
ইঙ্গিতের খেলায় এখানে কোনো প্রেমের উথালপাথাল স্বীকারোক্তি নেই। কিন্তু ‘করুণ চোখে হোক শান্তি’—এই ইঙ্গিতের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম আত্মসমর্পণ এবং ভরসার গল্প। চোখের চাওয়ার এই ইঙ্গিতটি হাজারটা “ভালোবাসি” শব্দের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কবিরা আসলে শব্দের সাশ্রয় করেন যাতে ভাবনার বিস্তার ঘটতে পারে। তাঁরা কবিতার খাতার পাতায় একটা ‘বিন্দু’ এঁকে দেন, আর পাঠক তাঁর নিজের অনুভূতি আর কল্পনা দিয়ে সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে মনের ভেতর একটা বিশাল ‘বৃত্ত’ তৈরি করে নেন। এটাই কবিতায় শব্দের পরিমিতিবোধ আর ইঙ্গিতের আসল খেলা।
অর্থের বহুমাত্রিকতা: কবিতায় “অর্থের বহুমাত্রিকতা” (খধুবৎং ড়ভ গবধহরহম) হলো এমন এক জাদুকরী গুণ, যার কারণে একটি কবিতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট অর্থে বেঁধে রাখা যায় না। গদ্যের ভাষা যেখানে অনেকটা সোজা রাস্তার মতো-একবার পড়লেই গন্তব্যে বা নির্দিষ্ট অর্থে পৌঁছানো যায়; কবিতার ভাষা সেখানে বহুতল ভবনের মতো-প্রতিটি তলায় পা রাখলে এক একটি নতুন অর্থ এবং নতুন অনুভূতির জগৎ উন্মোচিত হয়। কবি যখন একটি কবিতা লেখেন, তিনি কেবল একটি অর্থ মাথায় রেখে নাও লিখতে পারেন। আবার কবির অবচেতনের ভাবনা এবং পাঠকের নিজস্ব জীবনবোধের মিলনে কবিতার অর্থ ক্রমাগত ডালপালা মেলতে থাকে। কবিতায় এই অর্থের বহুমাত্রিকতা কীভাবে তৈরি হয়, তা কিছু চেনা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যাক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি অর্থের বহুমাত্রিকতার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একজন কৃষকের গল্প, যে নদীর চরে একা বসে আছে এবং তার কষ্টার্জিত ধান একটি নৌকায় তুলে দিচ্ছে, কিন্তু নৌকায় তার নিজের জায়গা হচ্ছে না। বাইরে থেকে এটি একটি সরল গল্প হলেও, এর গভীরে ডুব দিলে অন্তত তিনটি ভিন্ন মাত্রা পাওয়া যায়: প্রথম মাত্রা (সারফেস মিনিং): বর্ষার দিনে এক অসহায় কৃষকের ফসল বাঁচানোর আকুতি। দ্বিতীয় মাত্রা (দার্শনিক বা মহাজাগতিক অর্থ): মহাকাল মানুষের সৃষ্টিকে বা তার কর্মকে সাদরে গ্রহণ করে (নৌকায় ধান ধরে যায়), কিন্তু সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বা তার নশ্বর শরীরকে জায়গা দেয় না (মানুষটিকে চরেই পড়ে থাকতে হয়)।
তৃতীয় মাত্রা (ব্যক্তিগত বা শিল্পীসত্তার অর্থ): একজন শিল্পী তাঁর সারাজীবনের শিল্পকর্ম পৃথিবীর হাতে তুলে দেন। পৃথিবী সেই শিল্পকে মনে রাখে, কিন্তু ব্যক্তি শিল্পীকে একসময় ভুলে যায়।
জীবনানন্দ দাশের “আট বছর আগের একদিন” কবিতায় আমরা দেখি এক ব্যক্তি, যার জীবনে কোনো অভাব ছিল না—প্রেমিকা ছিল, বঁধু ছিল, সচ্ছলতা ছিল; তবুও সে হঠাৎ এক রাতে আত্মহত্যা করে।
এই কবিতার অর্থও পাঠকভেদে বহুমাত্রিক রূপ নেয়: সামাজিক মাত্রা: বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত জীবনের একঘেয়েমি মানুষকে কতটা ক্লান্ত করতে পারে, এটি তার প্রতীক। অস্তিত্ববাদী (ঊীরংঃবহঃরধষ) মাত্রা: মানুষের ভেতরের এক আদিম ও অবুজ একাকিত্ব বা “বিপন্ন বিস্ময়”, যা তাকে প্রকৃতির সমস্ত আয়োজন বা জাগতিক মায়া ছিন্ন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
ঐতিহাসিক মাত্রা: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে যে চরম হতাশা ও মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়েছিল, কবিতাটি সেই সময়ের অবক্ষয়িত মানসিকতার এক নিখুঁত দলিল।
কবিতায় অর্থের বহুমাত্রিকতা তৈরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো রূপক। কবি যখন একটি শব্দ ব্যবহার করেন, সেটি অভিধানের অর্থ ছাড়িয়ে এক নতুন প্রতীকে রূপ নেয়।
যেমন, কবিরা যখন ‘রাত’ বা ‘অন্ধকার’ শব্দটা ব্যবহার করেন, তখন তার অর্থ শুধু ‘সূর্যাস্তের পরের সময়’ নয়। এর অর্থ হতে পারে: কোনো স্বৈরশাসকের অন্ধকার শাসনকাল (রাজনৈতিক মাত্রা)।
মানুষের মনের ভেতরের বিষাদ বা হতাশা (মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা)।
সৃষ্টির আদিম রহস্য বা পরম শান্তি (আধ্যাত্মিক মাত্রা)। কেন অর্থের এই বহুমাত্রিকতা এত জরুরি?
কবিতার এই বহুমাত্রিকতার কারণেই একটি কবিতা কখনো ‘পুরনো’ হয় না। আপনি বিশ বছর বয়সে একটি কবিতা পড়ে যে অর্থ খুঁজে পাবেন, চল্লিশ বছর বয়সে জীবনের আরও অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সেই একই কবিতা পড়লে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থ আপনার সামনে উন্মোচিত হবে। কবিতা একাকিত্বের সময় একরকম অর্থ দেয়, আবার বিপ্লবের সময় অন্যরকম শক্তি জোগায়। কবিতা আসলে আয়নার মতো—যে পাঠক যেভাবে তার সামনে দাঁড়ান, কবিতাটি তাঁর ভেতরের আলো-ছায়া মিলিয়ে ঠিক সেই মাত্রার অর্থটিই তাঁর মনে প্রতিফলিত করে। কবি যদি সবকিছু স্পষ্ট করে বলে দিতেন, তবে কবিতার একটা মাত্র অর্থই তৈরি হতো। কিন্তু না বলার কারণে একটি কবিতাই একেকজন পাঠকের কাছে, তাঁদের নিজস্ব জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, একেক রকম অর্থ নিয়ে ধরা দেয়। কবি যা লেখেননি, পাঠক সেখানে নিজের আনন্দ, বেদনা বা স্মৃতিকে বসিয়ে নেন। ফলে কবিতাটি আর শুধু কবির থাকে না, পাঠকেরও হয়ে ওঠে।
নীরবতার ভাষা: কবিতায় নীরবতার ভাষা হলো সেই না-বলা কথা, যা শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। কবি যখন সাদা পাতার বুকে কয়েকটি শব্দ সাজান, তখন দুটি শব্দের বা দুটি পংক্তির মাঝখানের যে শূন্যতা—তা আসলে নিথর নয়, বরং এক গভীর বাঙ্ময়তা।
জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা কবিতার বহু বাঁকে এই নীরবতার খেলা আমরা দেখতে পাই। কবিতায় এই নীরবতার ভাষা মূলত কয়েকটি স্তরে কাজ করে।
সব কথা শব্দে প্রকাশ করা যায় না। তীব্র যন্ত্রণা, গভীর প্রেম কিংবা মহাজাগতিক একাকিত্ব প্রকাশের জন্য প্রচলিত অভিধানের শব্দগুলো অনেক সময় ছোট হয়ে পড়ে। কবি তখন শব্দের আলো-ছায়া দিয়ে একটা আবহ তৈরি করেন এবং আসল সত্যটাকে রেখে দেন দুই লাইনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় (জবধফ নবঃবিবহ ঃযব ষরহবং)। সেই শূন্যতাই তখন কথা বলে ওঠে।
কবিতার প্রতিটি যতিচিহ্ন, পংক্তিভেদ কিংবা স্তবকের মাঝের বিরতি আসলে নীরবতার এক একটি রূপ। এই বিরতি পাঠককে একটু থামতে, ভাবতে এবং সেই নিস্তব্ধতার গভীরে ডুব দিতে বাধ্য করে। শব্দের চেয়ে এই দীর্ঘশ্বাস বা স্তব্ধতার মুহূর্তগুলো অনেক বেশি তীব্র হয়।
নীরবতার নিজস্ব কিছু চিত্রকল্প থাকে। যেমন—কুয়াশা ঢাকা মাঠ, নিঝুম রাতের নদী, ঝরে পড়া পাতা কিংবা নির্জন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা কোনো চেনা বস্তু। কবি যখন এই দৃশ্যগুলো আঁকেন, তখন বাহ্যিক কোনো চিৎকার থাকে না, কিন্তু এক অপার্থিব নীরবতা পাঠকের মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যিনি কবিতা লেখেন, তিনি এক পরম নির্জনতার ভেতর ডুব দিয়ে শব্দের খোঁজ করেন। সেই নির্জনতার একটা অংশ কবিতার শরীরেও মিশে থাকে। ফলে কবিতা যখন পড়া হয়, তখন তা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটা ধ্যানমগ্ন অবস্থা। শব্দ যেখানে শেষ হয়, নীরবতার ভাষা সেখান থেকেই শুরু হয়। কবিতায় শব্দ যদি হয় সুর, তবে নীরবতা হলো সেই সুরের ভেতরের শ্রুতিমধুর বিরতি। শব্দ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, আর নীরবতা আমাদের সেই পথের গন্তব্যে, অর্থাৎ এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এটাই কবিতার আসল জাদু।
রূপক এবং প্রতীকের ব্যবহার: কবিতায় রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ) এবং প্রতীক (ঝুসনড়ষ) হলো কবির এমন দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা সাধারণ ভাষাকে অসাধারণ এবং বহুমাত্রিক করে তোলে। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটিকে এক মনে হলেও, কবিতার শরীরে এদের কাজ ও গভীরতা সম্পূর্ণ আলাদা।
সহজ কথায়, রূপক ও প্রতীক হলো শব্দের সেই চাদর, যা চেনা বাস্তবকে আড়াল করে এক অচেনা, গভীরতর সত্যকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করে।
রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ): অভেদ কল্পনা যখন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তুর মধ্যে কোনো অদৃশ্য সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন তাকে রূপক বলে। এখানে ‘তুলনা’ শব্দটা আড়ালে চলে যায়, উপমেয় এবং উপমান এক হয়ে মিশে যায়।
সহজ উদাহরণ: আমরা যখন বলি “জীবনটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র”, তখন জীবনকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো না বলে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রই বলে দেওয়া হচ্ছে।
কবিতায় রূপক: কবি যখন লেখেন—
“তুমি মোরে করেছ সম্রাট। তুমি মোরে / দিয়েছ গৌরবমুকুট- (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখানে ভালোবাসা বা সম্মানকে সরাসরি ‘সম্রাট’ বা ‘গৌরবমুকুট’-এর রূপকে প্রকাশ করা হয়েছে। রূপক কবিতার ভাবকে মুহূর্তের মধ্যে তীব্র এবং দৃশ্যমান করে তোলে।
প্রতীক (ঝুসনড়ষ): দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যমান; প্রতীক হলো এমন একটি চেনা বস্তু, চরিত্র বা দৃশ্য—যা নিজের রূপ ছাড়িয়ে অন্য কোনো গভীর ভাব, দর্শন বা চিরন্তন সত্যকে রিপ্রেজেন্ট (প্রতিনিধিত্ব) করে। প্রতীকের পেছনে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক বা মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি থাকে।
সহজ উদাহরণ: একটি ‘সাদা পায়রা’ কেবল একটি পাখি নয়, তা শান্তির প্রতীক। ‘শৃঙ্খল’ পরাধীনতার প্রতীক। কবিতায় প্রতীক: বাংলা কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার অত্যন্ত গভীর। যেমন-রবীন্দ্রনাথের ‘খেয়া’ বা ‘তরণী’: এটি কেবল নদী পারাপারের নৌকা নয়, এটি জীবন-মৃত্যুর পারাপার বা মহাকালের প্রতীক।
জীবনানন্দ দাশের ‘হরিণ’ বা ‘অন্ধকার’: তাঁর কবিতায় ‘চিতা বাঘের হাত থেকে বাঁচতে হরিণ’ কেবল বন্যপ্রাণীর লড়াই নয়, তা আধুনিক মানুষের বিপন্নতা ও অস্তিত্ব সংকটের প্রতীক। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘চাঁদ’: “পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”-এখানে চাঁদ সৌন্দর্য হারিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের তীব্র ক্ষিধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রূপক ও প্রতীকের মূল পার্থক্য-কবিতায় এদের ব্যবহার বুঝতে সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু জানা প্রয়োজন।
বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ)-এ থাকে দুটি বিষয়ের মধ্যে সরাসরি তুলনা বা অভেদ কল্পনা, যেমন মন এবং মাঝি একসঙ্গে ‘মন-মাঝি’।
প্রতীক (ঝুসনড়ষ)-এ একটি মাত্র বস্তু বা শব্দ থাকে, যার আড়ালে একটি বিশাল ভাব লুকিয়ে থাকে।
গঠনগত দিক দিয়ে রূপকের ব্যাপ্তি বা পরিধি সাধারণত সেই নির্দিষ্ট পংক্তি বা কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রতীকের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। একটি প্রতীক পুরো কবিতা জুড়ে, এমনকি যুগের পর যুগ একই অর্থ বহন করতে পারে। কাজের ধরনে বিচার করলে রূপক মনকে নদী বা মাটির সাথে তুলনা করে সাময়িক একটা দৃশ্য তৈরি করে, যেমন: ‘মন-পবন’। কিন্তু প্রতীক কুয়াশা, রাত্রি, অরণ্য বা সমুদ্রের মতো শব্দ ব্যবহার করে এক মহাজাগতিক একাকিত্ব বা রহস্যের আবহ তৈরি করে।
কবিতায় কেন এই দুটি অপরিহার্য: ব্যঞ্জনা সৃষ্টির জন্য রূপক ও প্রতীক কবিতাকে বাচাল হতে দেয় না। কবি যা বলতে চান, তা সরাসরি না বলে ইশারায় বলেন। ফলে কবিতার গভীরতা বাড়ে।
সীমিত শব্দে অসীম ভাব জাগ্রত করে। অভিধানের শব্দের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে, কিন্তু প্রতীকের কোনো সীমা নেই। একটি মাত্র ‘পাখি’ বা ‘ঝড়’ শব্দ দিয়ে কবি একটি আস্ত যুগের অশান্তি বা মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখতে পারেন। পাঠককে সহ-রচয়িতা বানানোও অন্যতম একটি কারণ। রূপক ও প্রতীকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, এরা পাঠককে ভাবনার স্বাধীনতা দেয়। একেকজন পাঠক তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ দিয়ে সেই প্রতীকের একেক রকম অর্থ আবিষ্কার করেন। ফলে কবিতাটি আর কেবল কবির থাকে না, তা পাঠকেরও হয়ে ওঠে। সহজ কথায়, কবিরা কবিতায় কেবল একটি সুর বেঁধে দেন, আর সেই সুরে পাঠক তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের মতো করে একটি গান তৈরি করে নেন। তাই কবিতা পড়ার অর্থ কেবল লাইনগুলো রিডিং পড়া নয়; লাইনের অন্তরালে যে গভীর ভাব ও শূন্যতা লুকিয়ে আছে, নিজের অনুভূতি দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখাই হলো আসল কবিতা পাঠ।
একটি উদাহরণ: “যখন বৃষ্টি নামলো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো
কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল
নেই নিকটে-হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, তাই কি মনে জাগে
পোড়োবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে-মেশা দিনও?
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন।
বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!
এই কবিতাটিতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় কতখানি বলা আর কতখানি না বলার মধ্যে তাঁর ভাবনাকে সংগোপন করেছেন তা ব্যাখ্যা করা যাক। শক্তির কবিতার এক অদ্ভুত ম্যাজিক হলো-তিনি তীব্র আবেগকে খুব সহজ শব্দের মোড়কে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে এক গভীর তোলপাড় তৈরি করে। ‘যখন বৃষ্টি নামলো’ কবিতাটি “বলা” আর “না বলা”র সেই চমৎকার লুকোচুরি খেলার একটি সার্থক উদাহরণ। আইসবার্গ তত্ত্বের মতোই, এই কবিতায় কবি যা বলেছেন তা কেবলই উপলক্ষ, আর যা বলেননি—তাই-ই এই কবিতার আসল লক্ষ্য। কবিতায় যা বলা হয়েছে- বাইরে থেকে দেখলে কবিতাটির উপজীব্য অত্যন্ত চেনা ও চাক্ষুষ: প্রকৃতির রূপ: বাইরে আচমকা বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ মেঘে ঢাকা, শিউলিগাছ বৃষ্টিতে ভিজছে। কবির ক্রিয়া: কবি একা একা ঘরের ভেতর থেকে উঠোনের দিকে ছুটে গেছেন কারও সন্ধানে। হতাশা: যাকে তিনি খুঁজছিলেন (এক নারী, যার ‘আজানুকেশ’ বা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল), তাকে বাইরে কোথাও দেখা গেল না। ক্লাইম্যাক্স: বাইরে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে না পেয়ে কবির বুকের ভেতরে এক “ভারি ব্যাপক” বিষাদের বৃষ্টি শুরু হলো। কবিতায় যা না-বলা রয়ে গেছে: কবি যেটুকু বললেন, তা আসলে এক বিরাট শূন্যতা ও হাহাকারের খসড়া মাত্র। আসল কবিতাটি লুকিয়ে আছে লাইনের অন্তরালে, যা পাঠককে নিজের মতো করে বুঝে নিতে হয়: সম্পর্কের অতীত ও বর্তমান: কবি লিখেছেন-”হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে/চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি…”। এখানে ‘কী ছিল’ তা স্পষ্ট নয়। সম্ভবত কোনো ভরসা, কোনো প্রেম বা বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে ছিল, যা বৃষ্টি নামার সাথে সাথেই হারিয়ে গেছে। কবি কেন ‘চলচ্ছক্তিহীন’ বা পঙ্গু বোধ করছেন, সেই কারণটি তিনি চেপে গেছেন। পোড়োবাড়ি’র প্রতীক: কবি হঠাৎ বলে উঠলেন, “তাই কি মনে জাগে / পোড়োবাড়ির স্মৃতি?”। পোড়োবাড়ি হলো পরিত্যক্ত, জনমানবহীন এক ধ্বংসস্তূপ। কবির জীবন বা মন কেন আজ পোড়োবাড়ির মতো জনশূন্য আর পরিত্যক্ত? কার অভাবে এই শূন্যতা? কবি তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এই ‘না বলা’ বিষাদটুকুই পাঠককে বেশি আক্রান্ত করে।
সেই রহস্যময়ী নারী: উঠোনে যাকে খোঁজা হচ্ছে, তিনি কে? প্রেমিকা, কোনো হারিয়ে যাওয়া অতীত, নাকি অবাস্তব কোনো কল্পনা? কবি শুধু তার অবয়বের একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন (’আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে’), কিন্তু তাদের সম্পর্কের রসায়ন বা দূরত্বের কারণটি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছেন।
একাকিত্ব বনাম একাকিত্ব: বাইরে বৃষ্টি নামলে মানুষ সাধারণত ঘরে আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু কবি ঘর থেকে একাকী ছুটে যাচ্ছেন বাইরের বৃষ্টির দিকে। কেন? কারণ ঘরের ভেতরের একাকীত্ব বাইরের ঝড়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক। এই যে ভেতরের এক চরম ছটফটানি, কবি তা মুখে না বলে শুধু ‘ছুটে যাওয়ার’ ক্রিয়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন।
বলা ও না-বলার মিলন: অন্তরের মেঘ:
কবিতার শেষ দুই লাইনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় “বলা” আর “না বলা”র দূরত্বটুকু মুছে দিয়েছেন এক অসামান্য দক্ষতায়: “কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ কওে, ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে! বাইরে যে মানুষটি নেই, সে আসলে কবির ভেতরেও এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে গেছে। কবি সরাসরি বলেননি যে তিনি কতটা একাকী বা কতটা কষ্টে আছেন। তিনি শুধু বাইরের প্রাকৃতিক বৃষ্টিকে নিজের ভেতরের মানসিক কান্নার ওপর ‘সুপারইম্পোজ’ বা প্রতিস্থাপন করে দিলেন। বাইরে যে বৃষ্টি প্রকৃতিকে ভিজিয়ে দিচ্ছে, কবির ভেতরে সেই একই বৃষ্টি আসলে তাঁর অহংকার, তাঁর স্মৃতি আর তাঁর সত্তাকে ধুয়ে-মুছে চুরমার করে দিচ্ছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই কবিতায় বিরহ বা একাকিত্বের কোনো বড় বড় তত্ত্ব দেননি। তিনি কেবল কিছু দৃশ্য (শিউলিগাছ, উঠোন, মেঘ) আর কিছু অনুভূতি (চলচ্ছক্তিহীনতা, পোড়োবাড়ির স্মৃতি) সাজিয়ে দিয়েছেন। বাকি যে তীব্র হাহাকার, যে না-পাওয়ার যন্ত্রণা—তা কবি নিজের বুকের ভেতর সংগোপনে রেখে দিয়েছেন, যা প্রতিটি সংবেদনশীল পাঠক কবিতাটি পড়ার সময় নিজের অজান্তেই অনুভব করতে পারেন।

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।