বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

কবিতার না-বলা বাঙ্গময়তা: হিমশৈলের অন্তরালে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
কবিতার না-বলা বাঙ্গময়তা: হিমশৈলের অন্তরালে

তৈমুর খান
কবিতায় যতখানি বলা থাকে তার অধিক থাকে না বলা। এই না বলাটিকেই পাঠককে আবিষ্কার করতে হয়। কবিতায় যা বলা থাকে, তা আসলে হিমশৈল বা আইসবার্গের চূড়াটুকুর মতো-যা দৃশ্যমান। আর যা বলা থাকে না, তা হলো সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল অংশ। এই চমৎকার ও গভীর বিশাল অংশটির উপলব্ধিই কবিতার আসল প্রাণ। কবিতার এই ‘না বলা’ বা অব্যক্ত বিষয়টি কীভাবে কাজ করে এবং পাঠক হিসেবে আমাদের কেন তা অনুধাবন করতে হয়, তা কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।
শব্দের পরিমিতিবোধ ও ইঙ্গিতের খেলা: গদ্য যেখানে কথা বলে মন খুলে, কবিতা সেখানে কথা বলে মন ছুঁয়ে—খুব অল্প শব্দে, নীরবতার ভাষা দিয়ে। কবিতায় “শব্দের পরিমিতিবোধ” হলো অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ছেঁটে ফেলে কেবল সবচেয়ে ধারালো ও অর্থপূর্ণ শব্দটুকুকে ধরে রাখা। আর “ইঙ্গিতের খেলা” হলো সবকিছু স্পষ্ট না করে শব্দের আড়ালে একটা বড় সত্য বা আবেগকে লুকিয়ে রাখা, যা পাঠক তাঁর নিজের মতো করে আবিষ্কার করবেন তার কল্পনা ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে। সহজ কিছু উদাহরণের সাহায্যে এই পরিমিতিবোধ ও ইঙ্গিতের খেলাটি বোঝা যাক: “সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
জীবনানন্দ দাশ: এখানে ‘অন্ধকার’ আর ‘মুখোমুখি বসিবার’ শব্দগুলোর আড়ালে যে কী বিপুল ক্লান্তি, শান্তি, একাকীত্ব কিংবা আশ্রয় লুকিয়ে আছে, তা কবি আলাদা করে ব্যাখ্যা করেননি। এই না বলা ভাবটুকুই পাঠককে বেশি নাড়া দেয়। শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতার এই চারটে লাইন লক্ষ্য করুন:
আমার তো কিছু নেই না-থাকার মরুদ্যান ছাড়া কোনো দিকে জল নেই, কোনো দিকে ছায়া নেই, তুমি
কেন তবে এই বক্ষে কড়া নাড়ো, হে প্রাচীন ক্ষত? এখন কী চাও বলো, এখন তো সময় সম্পূর্ণ। পরিমিতিবোধে কবি এখানে ভাঙা মন বা একাকিত্বের কোনো দীর্ঘ বিবরণ দেননি। তিনি শুধু দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—’না-থাকার মরুদ্যান’। মরুদ্যান এমনিতে আশার প্রতীক, কিন্তু তার আগে ‘না-থাকার’ বসিয়ে দিয়ে কবি এক নিমিষেই চরম এক শূন্যতার ছবি এঁকে দিলেন।
ইঙ্গিতের খেলায় কবি যখন বলছেন, “কেন তবে এই বক্ষে কড়া নাড়ো, হে প্রাচীন ক্ষত?”-এখানে ‘প্রাচীন ক্ষত’ বলতে তিনি ঠিক কোন পুরনো দুঃখ, কোন ভুল বা কোন হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা বলছেন, তা স্পষ্ট করেননি। এই ‘না বলা’ ইঙ্গিতটুকুই পাঠকের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করে। পাঠক নিজের জীবনের কোনো পুরনো কষ্টের কথা ভেবে লাইনটির সাথে একাত্ম হয়ে যান।
দেশভাগের পটভূমিতে লেখা অমিয় চক্রবর্তীর ‘সংগতি’ কবিতার দুটি লাইন: মেঠো সুরো সুর চিল্কায়,
ওখানে তো কেউ নেই, একা পথ মিল্কায়। পরিমিতিবোধে দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে, দাঙ্গা হয়েছে-এই সব ভয়ানক ইতিহাস কবি মাত্র দুটি লাইনে প্রকাশ করলেন। কোনো কান্নাকাটি বা চিৎকারের শব্দ নেই। ইঙ্গিতের খেলায় ‘ওখানে তো কেউ নেই, একা পথ মিল্কায়’—এই একটি মাত্র লাইনের ইঙ্গিতটি কত গভীর! যে গ্রাম বা যে পথ একসময় মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিল, আজ তা খাঁ খাঁ করছে। মানুষগুলো কোথায় গেল? তারা কি মারা গেছে, নাকি দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে? কবি তা বললেন না। এই নীরব ইঙ্গিতটি দাঙ্গার যেকোনো রক্তাক্ত বিবরণের চেয়েও পাঠককে বেশি স্তব্ধ করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্লান্তি’ কবিতার এই অংশটুকু দেখা যাক: পথের প্রান্তরে আমার এই ক্লান্তি, তোমার ওই করুণ চোখে হোক শান্তি। পরিমিতিবোধে জীবনের দীর্ঘ লড়াই, ব্যর্থতা আর অবসাদকে কবি কেবল একটি শব্দে বেঁধে ফেললেন-’ক্লান্তি’। আর সেই লড়াইয়ের পর যার কাছে একটু আশ্রয় পাওয়া যায়, তাঁর ভালোবাসাকে কোনো বিশেষণ না দিয়ে শুধু বললেন ‘করুণ চোখ’।
ইঙ্গিতের খেলায় এখানে কোনো প্রেমের উথালপাথাল স্বীকারোক্তি নেই। কিন্তু ‘করুণ চোখে হোক শান্তি’—এই ইঙ্গিতের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম আত্মসমর্পণ এবং ভরসার গল্প। চোখের চাওয়ার এই ইঙ্গিতটি হাজারটা “ভালোবাসি” শব্দের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কবিরা আসলে শব্দের সাশ্রয় করেন যাতে ভাবনার বিস্তার ঘটতে পারে। তাঁরা কবিতার খাতার পাতায় একটা ‘বিন্দু’ এঁকে দেন, আর পাঠক তাঁর নিজের অনুভূতি আর কল্পনা দিয়ে সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে মনের ভেতর একটা বিশাল ‘বৃত্ত’ তৈরি করে নেন। এটাই কবিতায় শব্দের পরিমিতিবোধ আর ইঙ্গিতের আসল খেলা।
অর্থের বহুমাত্রিকতা: কবিতায় “অর্থের বহুমাত্রিকতা” (খধুবৎং ড়ভ গবধহরহম) হলো এমন এক জাদুকরী গুণ, যার কারণে একটি কবিতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট অর্থে বেঁধে রাখা যায় না। গদ্যের ভাষা যেখানে অনেকটা সোজা রাস্তার মতো-একবার পড়লেই গন্তব্যে বা নির্দিষ্ট অর্থে পৌঁছানো যায়; কবিতার ভাষা সেখানে বহুতল ভবনের মতো-প্রতিটি তলায় পা রাখলে এক একটি নতুন অর্থ এবং নতুন অনুভূতির জগৎ উন্মোচিত হয়। কবি যখন একটি কবিতা লেখেন, তিনি কেবল একটি অর্থ মাথায় রেখে নাও লিখতে পারেন। আবার কবির অবচেতনের ভাবনা এবং পাঠকের নিজস্ব জীবনবোধের মিলনে কবিতার অর্থ ক্রমাগত ডালপালা মেলতে থাকে। কবিতায় এই অর্থের বহুমাত্রিকতা কীভাবে তৈরি হয়, তা কিছু চেনা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যাক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি অর্থের বহুমাত্রিকতার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একজন কৃষকের গল্প, যে নদীর চরে একা বসে আছে এবং তার কষ্টার্জিত ধান একটি নৌকায় তুলে দিচ্ছে, কিন্তু নৌকায় তার নিজের জায়গা হচ্ছে না। বাইরে থেকে এটি একটি সরল গল্প হলেও, এর গভীরে ডুব দিলে অন্তত তিনটি ভিন্ন মাত্রা পাওয়া যায়: প্রথম মাত্রা (সারফেস মিনিং): বর্ষার দিনে এক অসহায় কৃষকের ফসল বাঁচানোর আকুতি। দ্বিতীয় মাত্রা (দার্শনিক বা মহাজাগতিক অর্থ): মহাকাল মানুষের সৃষ্টিকে বা তার কর্মকে সাদরে গ্রহণ করে (নৌকায় ধান ধরে যায়), কিন্তু সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বা তার নশ্বর শরীরকে জায়গা দেয় না (মানুষটিকে চরেই পড়ে থাকতে হয়)।
তৃতীয় মাত্রা (ব্যক্তিগত বা শিল্পীসত্তার অর্থ): একজন শিল্পী তাঁর সারাজীবনের শিল্পকর্ম পৃথিবীর হাতে তুলে দেন। পৃথিবী সেই শিল্পকে মনে রাখে, কিন্তু ব্যক্তি শিল্পীকে একসময় ভুলে যায়।
জীবনানন্দ দাশের “আট বছর আগের একদিন” কবিতায় আমরা দেখি এক ব্যক্তি, যার জীবনে কোনো অভাব ছিল না—প্রেমিকা ছিল, বঁধু ছিল, সচ্ছলতা ছিল; তবুও সে হঠাৎ এক রাতে আত্মহত্যা করে।
এই কবিতার অর্থও পাঠকভেদে বহুমাত্রিক রূপ নেয়: সামাজিক মাত্রা: বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত জীবনের একঘেয়েমি মানুষকে কতটা ক্লান্ত করতে পারে, এটি তার প্রতীক। অস্তিত্ববাদী (ঊীরংঃবহঃরধষ) মাত্রা: মানুষের ভেতরের এক আদিম ও অবুজ একাকিত্ব বা “বিপন্ন বিস্ময়”, যা তাকে প্রকৃতির সমস্ত আয়োজন বা জাগতিক মায়া ছিন্ন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
ঐতিহাসিক মাত্রা: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে যে চরম হতাশা ও মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়েছিল, কবিতাটি সেই সময়ের অবক্ষয়িত মানসিকতার এক নিখুঁত দলিল।
কবিতায় অর্থের বহুমাত্রিকতা তৈরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো রূপক। কবি যখন একটি শব্দ ব্যবহার করেন, সেটি অভিধানের অর্থ ছাড়িয়ে এক নতুন প্রতীকে রূপ নেয়।
যেমন, কবিরা যখন ‘রাত’ বা ‘অন্ধকার’ শব্দটা ব্যবহার করেন, তখন তার অর্থ শুধু ‘সূর্যাস্তের পরের সময়’ নয়। এর অর্থ হতে পারে: কোনো স্বৈরশাসকের অন্ধকার শাসনকাল (রাজনৈতিক মাত্রা)।
মানুষের মনের ভেতরের বিষাদ বা হতাশা (মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা)।
সৃষ্টির আদিম রহস্য বা পরম শান্তি (আধ্যাত্মিক মাত্রা)। কেন অর্থের এই বহুমাত্রিকতা এত জরুরি?
কবিতার এই বহুমাত্রিকতার কারণেই একটি কবিতা কখনো ‘পুরনো’ হয় না। আপনি বিশ বছর বয়সে একটি কবিতা পড়ে যে অর্থ খুঁজে পাবেন, চল্লিশ বছর বয়সে জীবনের আরও অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সেই একই কবিতা পড়লে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থ আপনার সামনে উন্মোচিত হবে। কবিতা একাকিত্বের সময় একরকম অর্থ দেয়, আবার বিপ্লবের সময় অন্যরকম শক্তি জোগায়। কবিতা আসলে আয়নার মতো—যে পাঠক যেভাবে তার সামনে দাঁড়ান, কবিতাটি তাঁর ভেতরের আলো-ছায়া মিলিয়ে ঠিক সেই মাত্রার অর্থটিই তাঁর মনে প্রতিফলিত করে। কবি যদি সবকিছু স্পষ্ট করে বলে দিতেন, তবে কবিতার একটা মাত্র অর্থই তৈরি হতো। কিন্তু না বলার কারণে একটি কবিতাই একেকজন পাঠকের কাছে, তাঁদের নিজস্ব জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, একেক রকম অর্থ নিয়ে ধরা দেয়। কবি যা লেখেননি, পাঠক সেখানে নিজের আনন্দ, বেদনা বা স্মৃতিকে বসিয়ে নেন। ফলে কবিতাটি আর শুধু কবির থাকে না, পাঠকেরও হয়ে ওঠে।
নীরবতার ভাষা: কবিতায় নীরবতার ভাষা হলো সেই না-বলা কথা, যা শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। কবি যখন সাদা পাতার বুকে কয়েকটি শব্দ সাজান, তখন দুটি শব্দের বা দুটি পংক্তির মাঝখানের যে শূন্যতা—তা আসলে নিথর নয়, বরং এক গভীর বাঙ্ময়তা।
জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা কবিতার বহু বাঁকে এই নীরবতার খেলা আমরা দেখতে পাই। কবিতায় এই নীরবতার ভাষা মূলত কয়েকটি স্তরে কাজ করে।
সব কথা শব্দে প্রকাশ করা যায় না। তীব্র যন্ত্রণা, গভীর প্রেম কিংবা মহাজাগতিক একাকিত্ব প্রকাশের জন্য প্রচলিত অভিধানের শব্দগুলো অনেক সময় ছোট হয়ে পড়ে। কবি তখন শব্দের আলো-ছায়া দিয়ে একটা আবহ তৈরি করেন এবং আসল সত্যটাকে রেখে দেন দুই লাইনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় (জবধফ নবঃবিবহ ঃযব ষরহবং)। সেই শূন্যতাই তখন কথা বলে ওঠে।
কবিতার প্রতিটি যতিচিহ্ন, পংক্তিভেদ কিংবা স্তবকের মাঝের বিরতি আসলে নীরবতার এক একটি রূপ। এই বিরতি পাঠককে একটু থামতে, ভাবতে এবং সেই নিস্তব্ধতার গভীরে ডুব দিতে বাধ্য করে। শব্দের চেয়ে এই দীর্ঘশ্বাস বা স্তব্ধতার মুহূর্তগুলো অনেক বেশি তীব্র হয়।
নীরবতার নিজস্ব কিছু চিত্রকল্প থাকে। যেমন—কুয়াশা ঢাকা মাঠ, নিঝুম রাতের নদী, ঝরে পড়া পাতা কিংবা নির্জন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা কোনো চেনা বস্তু। কবি যখন এই দৃশ্যগুলো আঁকেন, তখন বাহ্যিক কোনো চিৎকার থাকে না, কিন্তু এক অপার্থিব নীরবতা পাঠকের মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যিনি কবিতা লেখেন, তিনি এক পরম নির্জনতার ভেতর ডুব দিয়ে শব্দের খোঁজ করেন। সেই নির্জনতার একটা অংশ কবিতার শরীরেও মিশে থাকে। ফলে কবিতা যখন পড়া হয়, তখন তা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটা ধ্যানমগ্ন অবস্থা। শব্দ যেখানে শেষ হয়, নীরবতার ভাষা সেখান থেকেই শুরু হয়। কবিতায় শব্দ যদি হয় সুর, তবে নীরবতা হলো সেই সুরের ভেতরের শ্রুতিমধুর বিরতি। শব্দ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, আর নীরবতা আমাদের সেই পথের গন্তব্যে, অর্থাৎ এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এটাই কবিতার আসল জাদু।
রূপক এবং প্রতীকের ব্যবহার: কবিতায় রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ) এবং প্রতীক (ঝুসনড়ষ) হলো কবির এমন দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা সাধারণ ভাষাকে অসাধারণ এবং বহুমাত্রিক করে তোলে। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটিকে এক মনে হলেও, কবিতার শরীরে এদের কাজ ও গভীরতা সম্পূর্ণ আলাদা।
সহজ কথায়, রূপক ও প্রতীক হলো শব্দের সেই চাদর, যা চেনা বাস্তবকে আড়াল করে এক অচেনা, গভীরতর সত্যকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করে।
রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ): অভেদ কল্পনা যখন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তুর মধ্যে কোনো অদৃশ্য সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন তাকে রূপক বলে। এখানে ‘তুলনা’ শব্দটা আড়ালে চলে যায়, উপমেয় এবং উপমান এক হয়ে মিশে যায়।
সহজ উদাহরণ: আমরা যখন বলি “জীবনটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র”, তখন জীবনকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো না বলে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রই বলে দেওয়া হচ্ছে।
কবিতায় রূপক: কবি যখন লেখেন—
“তুমি মোরে করেছ সম্রাট। তুমি মোরে / দিয়েছ গৌরবমুকুট- (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখানে ভালোবাসা বা সম্মানকে সরাসরি ‘সম্রাট’ বা ‘গৌরবমুকুট’-এর রূপকে প্রকাশ করা হয়েছে। রূপক কবিতার ভাবকে মুহূর্তের মধ্যে তীব্র এবং দৃশ্যমান করে তোলে।
প্রতীক (ঝুসনড়ষ): দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যমান; প্রতীক হলো এমন একটি চেনা বস্তু, চরিত্র বা দৃশ্য—যা নিজের রূপ ছাড়িয়ে অন্য কোনো গভীর ভাব, দর্শন বা চিরন্তন সত্যকে রিপ্রেজেন্ট (প্রতিনিধিত্ব) করে। প্রতীকের পেছনে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক বা মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি থাকে।
সহজ উদাহরণ: একটি ‘সাদা পায়রা’ কেবল একটি পাখি নয়, তা শান্তির প্রতীক। ‘শৃঙ্খল’ পরাধীনতার প্রতীক। কবিতায় প্রতীক: বাংলা কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার অত্যন্ত গভীর। যেমন-রবীন্দ্রনাথের ‘খেয়া’ বা ‘তরণী’: এটি কেবল নদী পারাপারের নৌকা নয়, এটি জীবন-মৃত্যুর পারাপার বা মহাকালের প্রতীক।
জীবনানন্দ দাশের ‘হরিণ’ বা ‘অন্ধকার’: তাঁর কবিতায় ‘চিতা বাঘের হাত থেকে বাঁচতে হরিণ’ কেবল বন্যপ্রাণীর লড়াই নয়, তা আধুনিক মানুষের বিপন্নতা ও অস্তিত্ব সংকটের প্রতীক। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘চাঁদ’: “পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”-এখানে চাঁদ সৌন্দর্য হারিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের তীব্র ক্ষিধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রূপক ও প্রতীকের মূল পার্থক্য-কবিতায় এদের ব্যবহার বুঝতে সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু জানা প্রয়োজন।
বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে রূপক (গবঃধঢ়যড়ৎ)-এ থাকে দুটি বিষয়ের মধ্যে সরাসরি তুলনা বা অভেদ কল্পনা, যেমন মন এবং মাঝি একসঙ্গে ‘মন-মাঝি’।
প্রতীক (ঝুসনড়ষ)-এ একটি মাত্র বস্তু বা শব্দ থাকে, যার আড়ালে একটি বিশাল ভাব লুকিয়ে থাকে।
গঠনগত দিক দিয়ে রূপকের ব্যাপ্তি বা পরিধি সাধারণত সেই নির্দিষ্ট পংক্তি বা কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রতীকের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। একটি প্রতীক পুরো কবিতা জুড়ে, এমনকি যুগের পর যুগ একই অর্থ বহন করতে পারে। কাজের ধরনে বিচার করলে রূপক মনকে নদী বা মাটির সাথে তুলনা করে সাময়িক একটা দৃশ্য তৈরি করে, যেমন: ‘মন-পবন’। কিন্তু প্রতীক কুয়াশা, রাত্রি, অরণ্য বা সমুদ্রের মতো শব্দ ব্যবহার করে এক মহাজাগতিক একাকিত্ব বা রহস্যের আবহ তৈরি করে।
কবিতায় কেন এই দুটি অপরিহার্য: ব্যঞ্জনা সৃষ্টির জন্য রূপক ও প্রতীক কবিতাকে বাচাল হতে দেয় না। কবি যা বলতে চান, তা সরাসরি না বলে ইশারায় বলেন। ফলে কবিতার গভীরতা বাড়ে।
সীমিত শব্দে অসীম ভাব জাগ্রত করে। অভিধানের শব্দের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে, কিন্তু প্রতীকের কোনো সীমা নেই। একটি মাত্র ‘পাখি’ বা ‘ঝড়’ শব্দ দিয়ে কবি একটি আস্ত যুগের অশান্তি বা মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখতে পারেন। পাঠককে সহ-রচয়িতা বানানোও অন্যতম একটি কারণ। রূপক ও প্রতীকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, এরা পাঠককে ভাবনার স্বাধীনতা দেয়। একেকজন পাঠক তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ দিয়ে সেই প্রতীকের একেক রকম অর্থ আবিষ্কার করেন। ফলে কবিতাটি আর কেবল কবির থাকে না, তা পাঠকেরও হয়ে ওঠে। সহজ কথায়, কবিরা কবিতায় কেবল একটি সুর বেঁধে দেন, আর সেই সুরে পাঠক তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের মতো করে একটি গান তৈরি করে নেন। তাই কবিতা পড়ার অর্থ কেবল লাইনগুলো রিডিং পড়া নয়; লাইনের অন্তরালে যে গভীর ভাব ও শূন্যতা লুকিয়ে আছে, নিজের অনুভূতি দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখাই হলো আসল কবিতা পাঠ।
একটি উদাহরণ: “যখন বৃষ্টি নামলো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো
কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল
নেই নিকটে-হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, তাই কি মনে জাগে
পোড়োবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে-মেশা দিনও?
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন।
বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!
এই কবিতাটিতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় কতখানি বলা আর কতখানি না বলার মধ্যে তাঁর ভাবনাকে সংগোপন করেছেন তা ব্যাখ্যা করা যাক। শক্তির কবিতার এক অদ্ভুত ম্যাজিক হলো-তিনি তীব্র আবেগকে খুব সহজ শব্দের মোড়কে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে এক গভীর তোলপাড় তৈরি করে। ‘যখন বৃষ্টি নামলো’ কবিতাটি “বলা” আর “না বলা”র সেই চমৎকার লুকোচুরি খেলার একটি সার্থক উদাহরণ। আইসবার্গ তত্ত্বের মতোই, এই কবিতায় কবি যা বলেছেন তা কেবলই উপলক্ষ, আর যা বলেননি—তাই-ই এই কবিতার আসল লক্ষ্য। কবিতায় যা বলা হয়েছে- বাইরে থেকে দেখলে কবিতাটির উপজীব্য অত্যন্ত চেনা ও চাক্ষুষ: প্রকৃতির রূপ: বাইরে আচমকা বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ মেঘে ঢাকা, শিউলিগাছ বৃষ্টিতে ভিজছে। কবির ক্রিয়া: কবি একা একা ঘরের ভেতর থেকে উঠোনের দিকে ছুটে গেছেন কারও সন্ধানে। হতাশা: যাকে তিনি খুঁজছিলেন (এক নারী, যার ‘আজানুকেশ’ বা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল), তাকে বাইরে কোথাও দেখা গেল না। ক্লাইম্যাক্স: বাইরে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে না পেয়ে কবির বুকের ভেতরে এক “ভারি ব্যাপক” বিষাদের বৃষ্টি শুরু হলো। কবিতায় যা না-বলা রয়ে গেছে: কবি যেটুকু বললেন, তা আসলে এক বিরাট শূন্যতা ও হাহাকারের খসড়া মাত্র। আসল কবিতাটি লুকিয়ে আছে লাইনের অন্তরালে, যা পাঠককে নিজের মতো করে বুঝে নিতে হয়: সম্পর্কের অতীত ও বর্তমান: কবি লিখেছেন-”হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে/চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি…”। এখানে ‘কী ছিল’ তা স্পষ্ট নয়। সম্ভবত কোনো ভরসা, কোনো প্রেম বা বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে ছিল, যা বৃষ্টি নামার সাথে সাথেই হারিয়ে গেছে। কবি কেন ‘চলচ্ছক্তিহীন’ বা পঙ্গু বোধ করছেন, সেই কারণটি তিনি চেপে গেছেন। পোড়োবাড়ি’র প্রতীক: কবি হঠাৎ বলে উঠলেন, “তাই কি মনে জাগে / পোড়োবাড়ির স্মৃতি?”। পোড়োবাড়ি হলো পরিত্যক্ত, জনমানবহীন এক ধ্বংসস্তূপ। কবির জীবন বা মন কেন আজ পোড়োবাড়ির মতো জনশূন্য আর পরিত্যক্ত? কার অভাবে এই শূন্যতা? কবি তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এই ‘না বলা’ বিষাদটুকুই পাঠককে বেশি আক্রান্ত করে।
সেই রহস্যময়ী নারী: উঠোনে যাকে খোঁজা হচ্ছে, তিনি কে? প্রেমিকা, কোনো হারিয়ে যাওয়া অতীত, নাকি অবাস্তব কোনো কল্পনা? কবি শুধু তার অবয়বের একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন (’আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে’), কিন্তু তাদের সম্পর্কের রসায়ন বা দূরত্বের কারণটি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছেন।
একাকিত্ব বনাম একাকিত্ব: বাইরে বৃষ্টি নামলে মানুষ সাধারণত ঘরে আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু কবি ঘর থেকে একাকী ছুটে যাচ্ছেন বাইরের বৃষ্টির দিকে। কেন? কারণ ঘরের ভেতরের একাকীত্ব বাইরের ঝড়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক। এই যে ভেতরের এক চরম ছটফটানি, কবি তা মুখে না বলে শুধু ‘ছুটে যাওয়ার’ ক্রিয়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন।
বলা ও না-বলার মিলন: অন্তরের মেঘ:
কবিতার শেষ দুই লাইনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় “বলা” আর “না বলা”র দূরত্বটুকু মুছে দিয়েছেন এক অসামান্য দক্ষতায়: “কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ কওে, ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে! বাইরে যে মানুষটি নেই, সে আসলে কবির ভেতরেও এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে গেছে। কবি সরাসরি বলেননি যে তিনি কতটা একাকী বা কতটা কষ্টে আছেন। তিনি শুধু বাইরের প্রাকৃতিক বৃষ্টিকে নিজের ভেতরের মানসিক কান্নার ওপর ‘সুপারইম্পোজ’ বা প্রতিস্থাপন করে দিলেন। বাইরে যে বৃষ্টি প্রকৃতিকে ভিজিয়ে দিচ্ছে, কবির ভেতরে সেই একই বৃষ্টি আসলে তাঁর অহংকার, তাঁর স্মৃতি আর তাঁর সত্তাকে ধুয়ে-মুছে চুরমার করে দিচ্ছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই কবিতায় বিরহ বা একাকিত্বের কোনো বড় বড় তত্ত্ব দেননি। তিনি কেবল কিছু দৃশ্য (শিউলিগাছ, উঠোন, মেঘ) আর কিছু অনুভূতি (চলচ্ছক্তিহীনতা, পোড়োবাড়ির স্মৃতি) সাজিয়ে দিয়েছেন। বাকি যে তীব্র হাহাকার, যে না-পাওয়ার যন্ত্রণা—তা কবি নিজের বুকের ভেতর সংগোপনে রেখে দিয়েছেন, যা প্রতিটি সংবেদনশীল পাঠক কবিতাটি পড়ার সময় নিজের অজান্তেই অনুভব করতে পারেন।

Ads small one

তালার উন্নয়নের সঙ্গে প্রেসক্লাব ভবনেরও উন্নয়ন হবে: হাবিবুল ইসলাম হাবিব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
তালার উন্নয়নের সঙ্গে প্রেসক্লাব ভবনেরও উন্নয়ন হবে: হাবিবুল ইসলাম হাবিব

তালা প্রতিনিধি: তালা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) মাগরিবের নামাজের পর তালা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

তালা প্রেসক্লাবের সভাপতি সেলিম হায়দারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জোয়ার্দার ফারুখ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তালা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মৃণাল কান্তি রায়, সাধারণ সম্পাদক শেখ শফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আবুল কালাম বিশ্বাস, রেজাউল ইসলাম রেজা এবং তালা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মীজা আতিয়ার রহমান।

এ সময় তালা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি আছাদুজ্জামান রাজু, যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান রেন্টু, সহসাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক মোতাহিরুল হক শাহিন, প্রচার সম্পাদক সেকেন্দার আবু জাফর বাবু, সাহিত্য সম্পাদক অর্জুন বিশ্বাস, নির্বাহী সদস্য জয়দেব চক্রবর্তী, ইমরান হোসেন, কাজী লিয়াকত হোসেন, মশিয়ার রহমান, কামাল হোসেন ও রফিকুল ইসলামসহ প্রেসক্লাবের সদস্য, স্থানীয় সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ছাত্রনেতা রিপন হোসেন ও যুবদল নেতা সরদার কামরুল উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও মানবতার জন্য তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, তালা প্রেসক্লাবকে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক প্রেসক্লাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তালার সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে তালা প্রেসক্লাব ভবনের উন্নয়নও এগিয়ে যাবে। তিনি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন তালা উপজেলা জামে মসজিদের খতিব মাওলানা তাওহিদুর রহমান।

সাতক্ষীরায় জেলা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৪৫ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় জেলা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ

সংবাদদাতা: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও দেশব্যাপী সবুজায়ন আন্দোলনকে বেগবান করতে সাতক্ষীরা জেলা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এক বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে এ বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও প্রায় ১০০টি পরিবারের মাঝে ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

 

সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, বর্তমান সরকারের ৫ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের যে মহাউদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতেই এ কর্মসূচির আয়োজন। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

বৃক্ষরোপণকালে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাঁচতে ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। তবে কেবল গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না নিয়মিত সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সেগুলোকে বড় করে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।

 

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খবর বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি ও সাপ্তাহিক সূর্যের আলো-এর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার শেখ রেজাউল ইসলাম বাবলু, সাধারণ সম্পাদক দৈনিক দক্ষিণের মশাল-এর স্টাফ রিপোর্টার ও দৈনিক গণ তদন্ত পত্রিকার সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি সাইফুল আজম খান মামুন, সহ-সভাপতি ও দৈনিক স্বাধীন মত-এর সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি আহাদুর রহমান জনি, সাপ্তাহিক সূর্যের আলো-এর সহকারী সম্পাদক মারুফ আহমেদ খান শামীম, দৈনিক যশোর বার্তা-এর সহসম্পাদক মোহাম্মদ মুজাহিদ, দৈনিক নব চেতনা ও দক্ষিণের মশাল পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শেখ হাসান গফুর, দৈনিক আইনবার্তা, দৈনিক আমাদের কণ্ঠ ও ডেইলি ফিন্যান্সিয়াল পোস্ট-এর জেলা প্রতিনিধি আক্তারুল ইসলাম, দৈনিক তৃতীয় মাত্রা পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি মো. ইদ্রিস আলী, শাহ নেওয়াজ মৃণাল, দৈনিক আজকের বসুন্ধরা-এর সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, দৈনিক সাতক্ষীরা সকাল-এর আতাউর রহমান, দৈনিক আলোকিত সকাল-এর স্টাফ রিপোর্টার জাহাঙ্গীর সরদার, গাজী হাবিব, আলমগীর হোসেন, মো. কামাল হোসেনসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 

সাতক্ষীরায় সম্পত্তির জেরে বৃদ্ধ পিতার উপর পুত্রের হামলার অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৯ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় সম্পত্তির জেরে বৃদ্ধ পিতার উপর পুত্রের হামলার অভিযোগ

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের ধানদিয়া চৌরাস্তা বাজারে ফসলি জমি নষ্ট করাকে কেন্দ্র করে সম্পত্তির জের ধরে এক বৃদ্ধ পিতার উপর ছোট ছেলের হামলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গত ২২ আগস্ট (শনিবার) দুপুর ১২টার দিকে ধানদিয়া চৌরাস্তা বাজার সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পিতা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নিলকণ্ঠপুর গ্রামের মৃত জালাল উদ্দীন মোড়লের ছেলে আব্দুল মজিদ মোড়ল (৭০) ধানদিয়া মৌজার ধানদিয়া চৌরাস্তা থেকে সরসকাটি বাজারগামী পিচ রাস্তার ধারের একটি জমিতে বোরো/আউশ ধান চাষের জন্য চারা রোপণ করেন।

 

অভিযোগ উঠেছে, সে সময় তার আপন ছোট ছেলে মো. লিটন হোসেন (৩২), লিটনের স্ত্রী মোছা. সামিরা খাতুন (২৮), ভাগনে সুজন হোসেন (২৪) ও বোন হালিমা খাতুনসহ (৪৭) কয়েকজন ব্যক্তি ওই ফসলি জমি নিজেদের স্ট্যাম্পকৃত সম্পত্তি দাবি করে রোপণ করা ধানের চারা তুলে নষ্ট করে ফেলেন। এ সময় পিতা আব্দুল মজিদ এবং তার বড় ছেলে মো. উজ্জ্বল হোসেন চারা উপড়ে ফেলতে বাধা দিলে ছোট ছেলে লিটন ক্ষিপ্ত হয়ে পিতার ওপর চড়াও হন। তিনি পিতাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধামকি দিয়ে হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির উপক্রম হলে স্থানীয় এলাকাবাসী এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ পিতা আব্দুল মজিদ মোড়ল অভিযোগ করে বলেন, “ছোট ছেলের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না। সে সবসময় আমার উপর চড়াও হয়ে মারতে আসে। বৃদ্ধ বয়সে তার কাছ থেকে কোনো ভালো ব্যবহার পাইনি। সে আমাকে খেতে দেয় না, দেখভালও করে না; তার এমন আচরণে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। যার কারণে আমি আমার মোট সম্পত্তির মধ্য থেকে ৭ বিঘা সম্পত্তি আমার বড় ছেলের নামে লিখে দিয়েছি। ইতোমধ্যে আমার বড় ছেলে তার অংশের সম্পত্তি থেকে ছোট ভাইকেও দলিল করে দিয়েছে। কিন্তু লিটন বড় ভাইয়ের অংশের সম্পত্তি ছাড়াও বিভিন্ন জাল দলিল ও স্ট্যাম্প তৈরি করে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে সব সম্পত্তি জবরদখল নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মো. লিটন হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার বাবা সব সম্পত্তি আমার বড় ভাইকে লিখে দিয়েছেন। পরে ভাই আমাকে টাকার বিনিময়ে সাড়ে তিন বিঘা জমি লিখে দিয়েছেন। কিন্তু লিখে দেওয়া সেই জমি আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। জমি বুঝে পাওয়ার জন্য আমি বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।

 

স্ট্যাম্পের বুনিয়াদে আমার পাওনা জমিতে বাবা ধান রোপণ করায় আমি ওই ধান রোয়া উপড়ে ফেলেছি। বড় ভাই মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, “আমার বাবা ছোট ভাইয়ের উপর অভিমান করে তার সম্পত্তি আমাকে লিখে দেন। আমি ছোট ভাইকে কোনো ফাঁকি দিইনি, বরং লিখে দেওয়া সম্পত্তির অর্ধেক আমি নিজেই ছোট ভাইকে রেজিস্ট্রি করে ফেরত দিয়েছি। সে তার ভাগের সব সম্পত্তি বুঝিয়ে নিয়ে বর্তমানে ভোগদখল করে খাচ্ছে, তবুও অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করছে। স্থানীয়রা এ ধরনের পারিবারিক কলহ ও পিতার গায়ে হাত তোলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।