সাকিবুর রহমান বাবলা
মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ভাষা। জীবনের শুরু থেকেই ভাষার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু তথ্য যদি জটিল শব্দ, দীর্ঘ বাক্য কিংবা দুর্বোধ্য প্রশাসনিক পরিভাষায় উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেই তথ্য অনেকের কাছেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফলে তথ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ তা বুঝতে পারে না, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না এবং কখনো কখনো নিজের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা দিবস। দিবসটির মূল বার্তাÑবোঝার অধিকার সবার আছে।
সহজ ভাষা বলতে শুধু ছোট বাক্য কিংবা পরিচিত শব্দের ব্যবহার বোঝায় না। কোনো তথ্যের শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, বিন্যাস ও উপস্থাপন এমন হতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট পাঠক সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পান, তা বুঝতে পারেন এবং বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেন। আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা ফেডারেশনের সংজ্ঞাতেও এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ভাষার উদ্দেশ্য পা-িত্য প্রদর্শন নয়; বরং মানুষের কাছে বক্তব্যকে স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা দিবসের সূচনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সহজ ভাষা নিয়ে কাজ করা দুই পেশাজীবী চেরিল স্টিফেনস ও কেট হ্যারিসন হোয়াইটসাইড। তাঁরা ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে সহজ ভাষার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক দিবস পালনের ধারণা সামনে আসে।
২০১০ সালের ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘প্লেইন রাইটিং অ্যাক্ট, ২০১০-এ স্বাক্ষর করেন। এই আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারি সংস্থাগুলোকে জনগণের জন্য তৈরি নথিপত্র স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত ও সুশৃঙ্খল ভাষায় লিখতে হয়। আইনটির স্বাক্ষরের বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর প্রথম আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা দিবস পালিত হয়।
একটি সরকারি চিঠি, চিকিৎসকের নির্দেশনা, ব্যাংকের ফরম কিংবা আইনি নথিÑএসবের প্রতিটি মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব রয়েছে। কোনো নাগরিক সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হলেও আবেদনপত্রের জটিল ভাষা বুঝতে না পারলে তিনি সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। রোগী চিকিৎসার নির্দেশনা বুঝতে না পারলে চিকিৎসা গ্রহণে ভুল হতে পারে। আবার আইনের ভাষা দুর্বোধ্য হলে সাধারণ মানুষ নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারেন না।
তাই সহজ ভাষা কোনো বিশেষ সুবিধা বা অনুগ্রহ নয়; এটি কার্যকর যোগাযোগের অপরিহার্য শর্ত। তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই তথ্য বোঝার উপযোগী হওয়াও জরুরি। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া কিংবা শুনে তথ্য গ্রহণকারী মানুষের জন্য সহজবোধ্য তথ্যের গুরুত্ব আরও বেশি। তথ্যের ভাষা সহজ হলে নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়ে, ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী হয়।
ভাষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এথ্নোলগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ১৬৮ থেকে ৭ হাজার ১৭০টি জীবিত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারের হিসাবে ইংরেজি প্রায় ১৪৫ কোটি বক্তা নিয়ে শীর্ষে এবং ম্যান্ডারিন চীনা প্রায় ১১৪ কোটি বক্তা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যায় ম্যান্ডারিন চীনা শীর্ষে। অন্যদিকে, প্রায় ২৭ কোটিরও বেশি বক্তা নিয়ে বাংলা বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং মোট বক্তার হিসাবে সপ্তম স্থানে রয়েছে।
যেহেতু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম। এমনকি আমাদের দৈনন্দিন ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারের মধ্যেও নানা বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই বাংলায় লেখা হলেই কোনো বক্তব্য সবার কাছে সহজবোধ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অপ্রয়োজনীয় কঠিন শব্দ, দীর্ঘ বাক্য, দুর্বোধ্য আইনি পরিভাষা এবং অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ভাষা সাধারণ পাঠকের জন্য বাধা তৈরি করতে পারে। যেমন, ‘যথাযোগ্য বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’ বলার পরিবর্তে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ লিখলে বক্তব্যটি আরও সহজে বোঝা যায়।
সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, হাসপাতাল, ব্যাংক ও বিচারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সহজ, স্পষ্ট ও প্রমিত বাংলা ব্যবহারের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ বিভিন্ন পাঠকের চাহিদা বিবেচনায় তথ্যের উপযোগী বিন্যাস, পাঠযোগ্য অক্ষর এবং প্রয়োজনমতো বিকল্প মাধ্যম নিশ্চিত করা দরকার। সহজ ভাষা মানে তথ্যকে ছোট করা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বাদ দিয়ে মূল বক্তব্য অক্ষুণœ রাখা।
সহজ ভাষার চর্চা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, সরকারি বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, আইন ও নাগরিক সেবার নির্দেশনা সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে লিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত তথ্যেও পরিচিত শব্দ এবং স্পষ্ট নির্দেশনা ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্য প্রকাশের আগে তা লক্ষ্য পাঠকের কাছে বোধগম্য কি না, তা যাচাই করা উচিত। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক ও যোগাযোগকর্মীদের সহজ ভাষায় লেখার প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
বিশ্বে ভাষার বৈচিত্র্য যেমন মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনন্য অংশ, তেমনি প্রতিটি ভাষায় সহজ ও স্পষ্ট যোগাযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষায় সঠিক তথ্য পাওয়া এবং তা সহজে বুঝতে পারা মানুষের জ্ঞান অর্জন ও সামাজিক অংশগ্রহণের পথকে প্রসারিত করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বে স্প্যানিশ ভাষার উচ্চারণ ও ব্যাকরণ তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এটি শেখা ও আয়ত্ত করা বেশ জনপ্রিয়।
‘আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা দিবস’ কেবল একটি দিবস উদযাপনের উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস পর্যালোচনারও সুযোগ। কোনো তথ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা শুধু তার বিষয়বস্তু দিয়ে নির্ধারিত হয় না; মানুষ সেটি বুঝতে ও কাজে লাগাতে পারছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহজ, স্পষ্ট ও বোধগম্য ভাষার চর্চা গড়ে তুলি। কারণ, তথ্য তখনই সত্যিকার অর্থে মানুষের কাজে আসে, যখন মানুষ তা বুঝতে পারে। বোঝার অধিকার সবারÑএই হোক আন্তর্জাতিক সহজ ভাষা দিবসের অঙ্গীকার।