কৃতজ্ঞতার শক্তি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গল্প ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গল্পটি ছিল একটি ছোট্ট পাখিকে নিয়ে। চারদিকে তপ্ত বালু, নেই কোনো গাছ, নেই কোনো জলাশয়। প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রামে তার পালক ঝরে পড়ছে, শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। একদিন সে জানতে পারল, তার এই দুর্দশা আরও বহু বছর চলবে। এমন সংবাদ যে কাউকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে পাখিটি অভিযোগ না করে প্রতিদিন সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করল। আর কিছুদিনের মধ্যেই তার চারপাশ বদলে গেল।
শুষ্ক ভূমি সবুজে ভরে উঠল, জল এলো, জীবন ফিরে এলো।এটি নিছক একটি গল্প। বাস্তবতার নিরিখে এর সত্যতা বিচার করার প্রয়োজন নেই। কারণ গল্পের শক্তি তার ঘটনার মধ্যে নয়, তার বার্তার মধ্যে। আর এই গল্পের বার্তা হলোÑকৃতজ্ঞতা মানুষের জীবনবোধ বদলে দিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজ কাজ গুলোর একটি হলো অভিযোগ করা। রাষ্ট্র নিয়ে অভিযোগ, সমাজ নিয়ে অভিযোগ, পরিবার নিয়ে অভিযোগ, নিজের ভাগ্য নিয়ে অভিযোগÑআমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ জুড়েই যেন অসন্তোষের ভাষা।
অভিযোগের অনেক কারণও আছে। দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশগত বিপর্যয় কিংবা সামাজিক বৈষম্যÑএসব বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অভিযোগ কি আমাদের সমস্যার সমাধান দেয়? নাকি আমাদের আরও হতাশ করে তোলে? মানুষের মনোবিজ্ঞানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মন সাধারণত যা নেই, তার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘নেগেটিভিটি বায়াস’। অর্থাৎ ইতিবাচক ঘটনার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাই আমাদের মনে বেশি প্রভাব ফেলে।
দশটি ভালো ঘটনার মধ্যে একটি খারাপ ঘটনা ঘটলে আমরা সেই একটিকেই বেশি মনে রাখি। ফলে জীবনের অসংখ্য প্রাপ্তি আড়ালে পড়ে যায়। আমাদের চারপাশে তাকালেই এর উদাহরণ পাওয়া যায়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেনি। তখন তার মনোযোগ থাকে ব্যর্থতার দিকে। একজন চাকরিজীবী হয়তো একটি স্থায়ী আয়ের উৎস পেয়েছেন, কিন্তু কাক্সিক্ষত পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। একজন কৃষক হয়তো গত বছরের তুলনায় ভালো ফলন পেয়েছেন, কিন্তু বাজারদর প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় সব অর্জনকেই ব্যর্থতা মনে করেন। এভাবে আমরা জীবনের প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির হিসাবই বেশি করি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
প্রতিদিন আমরা অন্যের সাফল্যের ছবি দেখি। কেউ বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনছে, কেউ ব্যবসায় সফল হচ্ছে, কেউ ঘুরতে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এসব দেখে অজান্তেই আমরা নিজের জীবনকে তাদের সঙ্গে তুলনা করি। ফলে নিজের অর্জনগুলোকে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অন্যের জীবনের পুরো গল্প দেখায় না। দেখায় কেবল নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত। যে মানুষটির হাসিমাখা ছবি আমরা দেখছি, তার জীবনেও হয়তো আছে গভীর উদ্বেগ, সংগ্রাম কিংবা একাকিত্ব। তাই তুলনার এই সংস্কৃতি মানুষকে সুখী করার বদলে আরও অসন্তুষ্ট করে তুলছে। কৃতজ্ঞতা এই অসন্তোষের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ।
কৃতজ্ঞতা মানে শুধু ‘ধন্যবাদ’ বলা নয়। কৃতজ্ঞতা হলো জীবনের প্রতি এক ধরনের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার জীবনে অনেক কিছুই আছে, যা মূল্যবান।আমরা কি কখনও ভেবে দেখি, সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের পায়ে হেঁটে চলতে পারা কত বড় আশীর্বাদ? পরিবারের সদস্যদের সুস্থভাবে পাশে পাওয়া কত বড় প্রাপ্তি? প্রতিদিন খাবার জোগাড় করতে পারা, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারা কিংবা নিরাপদে ঘুমাতে পারাÑপৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এগুলো স্বপ্নের মতো।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনও বিশ্বের বহু মানুষ নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য কিংবা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখো মানুষ অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের অভিযোগের পাশাপাশি কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণও কম নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তবু তারা জীবন থামিয়ে রাখে না।
ঝড়ের পর আবার ঘর তোলে, ভেঙে যাওয়া জমিতে আবার চাষ করে, সন্তানদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। এই যে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, এর পেছনে রয়েছে আশাবাদ ও কৃতজ্ঞতার এক অদৃশ্য ভিত্তি। মানুষের ইতিহাসও মূলত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগÑকত বিপর্যয়ই তো এসেছে। কিন্তু মানুষ আবার নতুন করে শুরু করেছে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিক স্থিতি। আর কৃতজ্ঞতা সেই স্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে কৃতজ্ঞতার উপকারিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। গবেষণাগুলো বলছে, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চা করেন, তারা তুলনামূলক ভাবে কম হতাশায় ভোগেন, তাদের মানসিক চাপ কম থাকে এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি বেশি থাকে।
কৃতজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ তৈরি করে, সম্পর্ক উন্নত করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়েছিল। যখন পৃথিব জুড়ে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছিল, তখন অনেক মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোর মূল্য। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, সুস্থ শরীরে শ্বাস নিতে পারা কিংবা প্রিয়জনের উপস্থিতিÑএসবই তখন অমূল্য হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয় দর্শনেও কৃতজ্ঞতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনের মধ্যেই একটি অভিন্ন বার্তা রয়েছেÑঅহংকার নয়, কৃতজ্ঞতাই মানুষকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। তবে কৃতজ্ঞতা মানে এই নয় যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। সমাজের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা যাবে না। বরং কৃতজ্ঞতা মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। কারণ যে মানুষ নিজের প্রাপ্তির মূল্য বোঝে, সে অন্যের বঞ্চনাও উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সে সমাজ পরিবর্তনের কাজেও বেশি আন্তরিক হয়। আমাদের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় কৃতজ্ঞতার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।
শিশুদের শেখাতে হবে, প্রতিটি অর্জনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। একজন কৃষক খাবার উৎপাদন করেন, শ্রমিক রাস্তা তৈরি করেন, শিক্ষক জ্ঞান দেন, চিকিৎসক জীবন বাঁচান। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে উপলব্ধি করতে পারলেই মানুষের মধ্যে বিনয় ও মানবিকতা বাড়বে। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে প্রত্যাশাও। আমরা যত বেশি পাচ্ছি, তত বেশি চাইছি। ফলে সন্তুষ্টি যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
এই অন্তহীন চাওয়ার সংস্কৃতির মধ্যে কৃতজ্ঞতা আমাদের থামতে শেখায়। শেখায়, জীবনের মূল্য শুধু ভবিষ্যতের অর্জনে নয়, বর্তমানের প্রাপ্তিতেও নিহিত। ছোট্ট পাখিটির গল্পে দশ বছরের কষ্ট এক মাসে শেষ হয়ে যায়। বাস্তব জীবন এত সহজ নয়। এখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই সব সমস্যা দূর হয়ে যায় না। কিন্তু কৃতজ্ঞতা মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। আর সেই শক্তিই তাকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বাইরের জগতে নয়, মানুষের ভেতরে ঘটে। যখন একজন মানুষ অভিযোগের ভাষা ছেড়ে কৃতজ্ঞতার ভাষা শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে অনেক সময় জীবনও বদলে যায়। এই অস্থির সময়ে তাই কৃতজ্ঞতার শিক্ষা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একবার নিজের প্রাপ্তিগুলোর কথা স্মরণ করি, যদি উপলব্ধি করি যে জীবনে এখনও অনেক সৌন্দর্য, অনেক সম্ভাবনা এবং অনেক আশীর্বাদ আছে, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজও কিছুটা ইতিবাচক হবে। কারণ সুখের সবচেয়ে বড় উৎস সবসময় বেশি পাওয়া নয়; বরং যা পেয়েছি, তার মূল্য বুঝতে শেখা। আর সেই শিক্ষার নামই কৃতজ্ঞতা।
লেখক: সাংবাদকর্মী












