বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হোক জাতীয় অগ্রাধিকার, সম্মিলিত দায়িত্ব হোক বাস্তবায়নের শক্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৫ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হোক জাতীয় অগ্রাধিকার, সম্মিলিত দায়িত্ব হোক বাস্তবায়নের শক্তি

শেখ আমিনুর হোসেন

‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ’-এমন প্রত্যাশাকে সামনে রেখে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটি ঘিরে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি এখনো বাংলাদেশের অন্যতম বড় জননিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, আহত হয়ে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে পারে, থামিয়ে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কিংবা কেড়ে নিতে পারে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে।

সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিপর্যয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট জাতীয় উন্নয়নের পথেও বাধা সৃষ্টি করে। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কোনো আনুষ্ঠানিক দিবসের প্রতিপাদ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, রোড সেফটি সেল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, চালক, পথচারী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

দিবসের তাৎপর্য ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ-
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, প্রচারাভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির সুফল পেতে হলে সারা বছর ধরে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু চালকদের সচেতন করলেই চলবে না; একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা, সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দিবসটির প্রতিপাদ্য যে প্রত্যাশার কথা বলে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সড়ক ব্যবহারকারী প্রত্যেককে বুঝতে হবে-সড়ক নিরাপত্তা কারও একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার।

দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ-
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং চালকের ক্লান্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং যাত্রী তোলার জন্য যানবাহনের মধ্যে পাল্লাপাল্লি করার প্রবণতা।

অন্যদিকে, অপরিকল্পিত সড়ক নকশা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, অস্পষ্ট সড়কচিহ্ন, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র পার্কিং, অনিরাপদ পারাপার এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

অনেক ক্ষেত্রে সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের সময় পথচারী ও সাইকেলচালকদের নিরাপত্তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও জনবহুল এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে অনুমানের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোন স্থানে, কী কারণে এবং কোন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, তা শনাক্ত করা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।

জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি-
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে জেলা প্রশাসন।

জেলার দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া, নিয়মিত সমন্বয় সভা করা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা জরুরি। বিশেষ করে বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনবহুল এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং, অনুমোদনহীন স্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র যানবাহন থামানোর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারাভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ শুধু সভা বা নির্দেশনা জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব ও আইনের প্রয়োগ-
সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা অপরিহার্য। ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশকে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিথিলতা কিংবা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক হয়রানি-কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।

মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহনের গতিনিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের বৈধ কাগজপত্র, লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার, যান চলাচল স্বাভাবিক করা এবং যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে সাহায্য করার পরিবর্তে ভিড় সৃষ্টি বা ভিডিও ধারণের প্রবণতা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের করণীয়-
নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে উন্নত ও ঝুঁকিমুক্ত অবকাঠামোর বিকল্প নেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে সড়কের নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপর্যাপ্ত দৃশ্যমানতা, ভাঙা সেতু বা কালভার্ট এবং বিপজ্জনক প্রবেশপথ দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

মহাসড়কে যথাযথ সড়কচিহ্ন, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, রোড মার্কিং, প্রতিফলক এবং প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে হবে। জনবহুল এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারের কাছে নিরাপদ পারাপার এবং উপযুক্ত গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

নির্মাণ বা সংস্কারকাজ চলাকালে বিকল্প চলাচলের পথ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন করতে হবে। কারণ অপর্যাপ্ত সতর্কতার কারণে নির্মাণাধীন সড়কেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে উন্নয়ন করতে হবে। শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, বিদ্যমান সড়কগুলোকে নিরাপদ রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রোড সেফটি সেল ও বিআরটিএর কার্যকর ভূমিকা-
সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিকল্পনা গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়ে রোড সেফটি সেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে কোন সড়কে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে, বিআরটিএকে চালকের লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ এবং পরিবহনসংক্রান্ত বিধিবিধান বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। চালকের দক্ষতা যাচাই ছাড়া লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ফিটনেস সনদ নবায়ন কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচলের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর ঝুঁকি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল শেখানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন মালিকদেরও যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের উপযুক্ত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করতে হবে।

চালক, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দায়বদ্ধতা-
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চালকদের দায়িত্ব সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং পরিহার এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে গাড়ি চালানো প্রতিটি চালকের কর্তব্য।

ঘুম ঘুম অবস্থায়, অসুস্থ শরীরে কিংবা মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। দীর্ঘ যাত্রায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে এবং যাত্রী তোলার জন্য প্রতিযোগিতা কিংবা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর অতিরিক্ত চাপ পরিহার করতে হবে।

পরিবহন মালিকদের ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে নামানো বন্ধ করতে হবে। চালকের বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি যানবাহনের ব্রেক, টায়ার, হেডলাইট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

শ্রমিক সংগঠনগুলো চালকদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পেশাগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। ন্যায্য মজুরি, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত হলে চালকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ কমবে। সড়ক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।

পথচারী ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা-
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পথচারীদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ কিংবা নির্ধারিত পারাপারের স্থান ব্যবহার করা জরুরি। চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া, মোবাইল ফোনে মনোযোগ রেখে হাঁটা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক আইন, সড়কচিহ্ন, নিরাপদ পারাপার, গণপরিবহনে ওঠানামা এবং মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীরা নিজেরা নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও সচেতন করতে পারে। এভাবে সড়ক নিরাপত্তাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা সম্ভব।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা-
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্ঘটনার কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের অবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা প্রয়োজন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদেরও সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

আনুষ্ঠানিকতা নয়, চাই কার্যকর বাস্তবায়ন-
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে-সচেতনতার বার্তা দেওয়ার পরও কেন সড়কে মানুষের নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, দক্ষ চালক তৈরি, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা-এসব উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য প্রকাশ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সরকারকে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে, প্রশাসনকে সমন্বয় ও তদারকি করতে হবে, পুলিশকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে এবং চালক ও পথচারীদের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অঙ্গীকার হোক-সড়ক সবার জন্য নিরাপদ করা। একটি দুর্ঘটনাও যেন অবহেলা, অনিয়ম কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে না ঘটে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রত্যেককে কাজ করতে হবে। কারণ প্রতিটি প্রাণ অমূল্য, প্রতিটি পরিবার নিরাপত্তার অধিকারী এবং নিরাপদে চলাচল করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক প্রত্যাশা।

আসুন, দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলি এমন বাংলাদেশ, যেখানে সড়কে বেরিয়ে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।

নিরাপদ সড়ক হোক সবার অধিকার, সবার দায়িত্ব-সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: শেখ আমিনুর হোসেন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, সাতক্ষীরা।

Ads small one

আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস: দুর্বলতা নয়, সহমর্মিতা চাই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩২ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস: দুর্বলতা নয়, সহমর্মিতা চাই

সাকিবুর রহমান বাবলা

২২ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস। তোতলামি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ গড়ে তোলাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল স্টাটারিং অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল ফ্লুয়েন্সি অ্যাসোসিয়েশন এবং ইউরোপিয়ান লীগ অব স্টাটারিং অ্যাসোসিয়েশনসের যৌথ উদ্যোগে দিবসটি প্রথম পালিত হয়। এর আগে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের মাইকেল সুগারম্যান একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দিবসটি পালনের প্রস্তাব দেন।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘তোতলামির নানা রূপ—আপনারটি কেমন?’ এই প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয়, সবার তোতলামির অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। এর প্রকাশভঙ্গি ও চ্যালেঞ্জও ভিন্ন হতে পারে। তাই তাদের অভিজ্ঞতা বোঝা, এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশ্বে প্রায় এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রায় পাঁচ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় তোতলামির সমস্যায় ভোগে। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে এর লক্ষণ দেখা দেয়। ছেলেদের মধ্যে এটি মেয়েদের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায়।

তোতলামি হলো কথা বলার গতি ও স্বাভাবিক প্রবাহের একটি সমস্যা। কথা বলার সময় একই বর্ণ বা শব্দ বারবার বলা, কোনো ধ্বনি টেনে উচ্চারণ করা কিংবা হঠাৎ আটকে যাওয়া এর সাধারণ লক্ষণ। একজন ব্যক্তি মনে মনে কী বলতে চান, তা পরিষ্কারভাবে জানলেও মুখে স্বাভাবিক ছন্দে প্রকাশ করতে অসুবিধা হতে পারে। এটি বুদ্ধির ঘাটতি, অলসতা বা মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কথা বলার সময় মস্তিষ্কের প্রক্রিয়া ও স্নায়বিক সমন্বয়ের পার্থক্য এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তোতলামির সম্পর্ক থাকতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৬০ শতাংশের পরিবারে তোতলামির ইতিহাস রয়েছে।

শিশুর ভাষা শেখার দ্রুত বিকাশের সময় তোতলামি শুরু হতে পারে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে এটি কমে যায়। আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শিশু বিকাশজনিত তোতলামি থেকে সেরে ওঠে। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ তোতলামির মূল কারণ নয়। কিন্তু এসব কারণে সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে, অথবা শিশুর কথা বলা, পড়াশোনা ও সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা হলে দ্রুত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তোতলামি মোকাবিলায় স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলার কৌশল শেখান। তারা বাচনপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগে স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানোর অনুশীলনও করান। তোতলামির কারণে ভয়, লজ্জা বা উদ্বেগ তৈরি হলে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি সহায়ক হতে পারে। তোতলামি পুরোপুরি দূর করার জন্য সর্বজনস্বীকৃত কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে অন্য কোনো মানসিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারেন। ধীরে ও স্বচ্ছন্দে কথা বলার অনুশীলন, শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল, বই পড়া এবং নিজের কথা রেকর্ড করে শোনা কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবে এসব অনুশীলনের ফল সবার ক্ষেত্রে এক নয় এবং এগুলো পেশাদার থেরাপির বিকল্প নয়।

তোতলামি মানুষের সম্ভাবনা বা সাফল্যের পথে অনিবার্য বাধা নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শৈশবে তোতলামির অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। অভিনেতা জেমস আর্ল জোন্স, এমিলি ব্লান্ট ও রোয়ান অ্যাটকিনসন এবং সংগীতশিল্পী এড শিরানও জীবনের বিভিন্ন সময়ে বাচনগত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাদের জীবন দেখায়, কোনো একটি সীমাবদ্ধতা দিয়ে মানুষের প্রতিভা ও অর্জন বিচার করা উচিত নয়। সাফল্যের জন্য তোতলামি পুরোপুরি দূর হওয়া জরুরি নয়। তোতলামি থাকলেও একজন মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলে ধৈর্য ধরে তার কথা শুনতে হবে। মাঝপথে বাধা দেওয়া বা তার হয়ে বাক্য শেষ করে দেওয়া যাবে না। তার কথা বলার ধরন নকল করে হাসাহাসি, ব্যঙ্গ বা কটূক্তি করা বন্ধ করতে হবে। অপমানজনক নামে ডাকাও উচিত নয়। ‘আস্তে বলো’, ‘গভীর শ্বাস নাও’ বা ‘আগে ভেবে নাও’-এ ধরনের অযাচিত উপদেশ অনেক সময় তার মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। বরং স্বাভাবিক চোখের যোগাযোগ রেখে তাকে কথা শেষ করার যথেষ্ট সময় দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষ, সভা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের মতামত প্রকাশের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তোতলামি কারও নিজের তৈরি সমস্যা নয়। এর পেছনে জৈবিক, স্নায়বিক ও বংশগত কারণ থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া বা তার মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায়। শুরুতেই বিশেষজ্ঞের সহায়তা, পরিবারের সহযোগিতা এবং সমাজের গ্রহণযোগ্যতা তাদের জীবনকে সহজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবসের শিক্ষা হোক-কথা বলার ধরন নয়, মানুষের চিন্তা, প্রতিভা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়েই তাকে বিচার করা উচিত। সহমর্মিতা, ধৈর্য ও সম্মানের মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারি, যেখানে সবাই নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে এবং নিজের মতো করে বিকশিত হতে পারে।

 

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত প্রয়াস ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২১ অপরাহ্ণ
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত প্রয়াস ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন

প্রকাশ ঘোষ বিধান

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এবং পরিবারগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এ জন্য কেবল চালকদের দায়ী না করে পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার ওপর জোর দিতে হবে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য চালক, পথচারী, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিশেষজ্ঞদের যৌথ অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে একটি সমন্বিত প্রয়াস এবং সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণহানি এবং পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ধাক্কা। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কোনো একক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে সকল সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত যানের পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী, বেপরোয়া চালক এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। রাস্তায় চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্সবিহীন বা ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, আধুনিক এবং দুর্নীতিমুক্ত করা। গতিসীমা মানা, সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং মদ্যপান বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো রোধে আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে।

সড়কে পর্যাপ্ত আলো, স্পষ্ট সাইনবোর্ড, জেব্রাক্রসিং এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সড়ক ও বাঁক নির্মাণ করতে হবে। নগর পরিকল্পনা ও গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে যাতে অতিরিক্ত ঝুঁকি কমে। মহাসড়কের বিপজ্জনক মোড় বা ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করা এবং লেন বিভাজক (ডিভাইডার) স্থাপন করা। পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস এবং জেব্রা ক্রসিং তৈরি ও তা ব্যবহারে বাধ্য করা। দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে ধীরগতির যানবাহন রিকশা, ভ্যান, নসিমন জন্য আলাদা সার্ভিসের লেনের ব্যবস্থা করা।

মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেপরোয়া ড্রাইভিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে আইটিএস বা ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু করা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত কার্যকর। গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা উচিত। চালকদের জন্য নিয়মিত পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা। চালকদের নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করা জরুরি। দূরপাল্লার চালকদের একটানা অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার তৈরি প্রয়োজন।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত রোগী স্থানান্তরের জন্য ডেডিকেটেড অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু রাখতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা বিনা প্রশ্নে দেওয়া আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শিশুদের ট্রাফিক নিয়ম ও সড়ক সচেতনতা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে কেবল একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নয়, বরং সরকার, চালক, যাত্রী এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন।

সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক সংস্থার দায়িত্ব নয়। পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সমন্বয়ে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেই কেবল সড়ক দুর্ঘটনা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। জাতিসংঘের দ্বিতীয় দশক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১-২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি একক কোনো কর্তৃপক্ষ বা নিয়মের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে একটি সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে একটি সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ কেবল বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত প্রয়াস ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একটি নিরাপদ ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। সড়ক দুর্ঘটনা কেবল অসংখ্য মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নেয় না, বরং এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সব অংশীজনদের একত্রে কাজ করা এবং একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শার্শায় দুই কেজি ৯০ গ্রাম স্বর্ণসহ এক পাচারকারী গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৭ অপরাহ্ণ
শার্শায় দুই কেজি ৯০ গ্রাম স্বর্ণসহ এক পাচারকারী গ্রেপ্তার

বাগআঁচড়া (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের শার্শায় দুই কেজি ৯০ গ্রাম ওজনের ১৮ পিস স্বর্ণেরবার ও একটি সুজুকি মোটরসাইকেলসহ আলাউদ্দিন (৫২) নামে এক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের সময় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন যশোরের নাভারণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আরিফ হোসেন।

এর আগে একই দিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে শার্শা থানাধীন দক্ষিণ বুরুজবাগান গ্রামস্থ প্রাইম ব্রিকস্ নামক ইটভাটা সংলগ্ন নাভারণ-সাতক্ষীরা মহাসড়কের উপর থেকে আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত আলাউদ্দিন (৫২) উপজেলার হাড়িখালী যদুনাথপুর গ্রামের মৃত গোলাম রসুলের ছেলে।

পুলিশ জানায়, স্বর্ণের চালান পাচার হবে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শার্শা থানা পুলিশের একটি চৌকস টিম নাভারণ-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খাজুরা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানকালে সন্দেহভাজন ব্যক্তি আলাউদ্দিন গ্রেপ্তার করেন পুলিশ। এসময় অপর দুই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সুকৌশলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার আসামির হেফাজতে থাকা ১৮ পিস স্বর্ণেরবার ও একটি সুজুকি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।

নাভারণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আরিফ হোসেন জানান এঘটনায় চোরাচালান বিরোধী আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে, এবং পালাতক অপর দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও জানান স্বর্ণের মান, আনুমানিক বাজার মূল্য নির্ধারণ ও যশোর ট্রেজারি শাখায় স্বর্ণেরবার গুলো জমা দেওয়ার বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।