ভালুকঘর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
এম এ রহমান, কেশবপুর (যশোর): যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর আজিজিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মশিহুর রহমানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও উপঢৌকন গ্রহণসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা চলাকালে ঝাড়ফুঁক ও তদবিরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
একই প্রতিষ্ঠানের আরবি প্রভাষক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ছুটি নিয়ে হজ কাফেলার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। এসব কারণে মাদ্রাসাটির শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকে চেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন গ্রহণের বিনিময়ে ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান না করে দুপুর ১টার পর মুভমেন্ট রেজিস্টারে স্বাক্ষর করে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, আরবি প্রভাষক মুহিবুল্লাহ গত ২১ কর্মদিবসের মধ্যে আট দিন দুপুর ১টার পর মুভমেন্ট রেজিস্টারে স্বাক্ষর করে মাদ্রাসা ত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া তাঁর পেশাগত শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, বাংলা প্রভাষক সঙ্গীতার বিরুদ্ধে মুভমেন্ট রেজিস্টারে স্বাক্ষর না করেই কয়েক মাস ধরে দুপুর ১টার আগেই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি এর আগে টানা ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে তিনি ছুটির আবেদন জমা দেওয়ার কথা জানালেও অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরবি প্রভাষক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষকে বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে বছরে ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত ছুটি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, তিনি কখনো ওমরাহ পালন, কখনো চিকিৎসা, আবার কখনো ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে ছুটি নিয়ে হজ্ব কাফেলা পরিচালনা করেন। বর্তমানে তিনি হজ্ব কাফেলা নিয়ে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে মাদ্রাসার শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মাদ্রাসার দাতা সদস্য ইব্রাহিম মোল্লা দাবি করেন, অধ্যক্ষের নিয়োগ বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটির নম্বর ৫১/২৪। তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুসরণ না করে তৎকালীন সরকারের আমলে মাদ্রাসার তৎকালীন সভাপতি এডিসি শিক্ষা রেখা বেগম ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অধ্যক্ষের পদে নিয়োগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আদালতের নথি ও নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
মাদ্রাসার অভিভাবক সদস্য ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। পড়াশোনার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টির একটি সুষ্ঠু সমাধান হওয়া দরকার।
এ বিষয়ে মাদ্রাসার সভাপতি মাওলানা জালাল উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেশবপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ ফিরোজ আহমেদ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সুযোগ থাকার কথা নয়। নিয়ম-শৃঙ্খলা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।
কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী চলবে। কোনো শিক্ষক বা অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত ইচ্ছায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আবু জাফর খান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকরা অন্য কাজে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। কোনো শিক্ষক বৈধ প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ বা অন্য কোনো কাজে যেতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিধি অনুযায়ী সরকারি আদেশ (জিও) গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ম্যানেজ করে এ ধরনের সুযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।। তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এদিকে, মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষকদের উপস্থিতি, ছুটি ব্যবস্থাপনা এবং অধ্যক্ষের নিয়োগের বৈধতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাঁরা উপজেলা প্রশাসন ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মশিহুর রহমান সব দায় কমিটির উপরে চাপিয়ে দিয়ে বলেন আমার কোন ক্ষমতা নেই সভাপতি যেটা করেছে সেটাই হয়েছে।












