তামিলনাড়ুতে ‘বিজয় রথের’ পথে এখনো কাঁটা, শপথ নিয়ে নাটকীয়তা তুঙ্গে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সিনেমার নায়ক থেকে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েই জননেতা বনে যাওয়া চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টি কাজগম (টিভিকে) তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এখনই সরকার গঠন করতে পারছে না।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় জোট গড়তে কংগ্রেসের দ্বারস্থ হতে হয়েছে বিজয়কে। কংগ্রেস তাদের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলেও জট কাটেনি। উল্টো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া এবং সরকার গঠনের জন্য বিজয়কে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিয়েছেন তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার। এমন পরিস্থিতিতে বিজয় ও তার দল আদালতে যেতে পারে বলে বৃহস্পতিবার খবর দিয়েছে এনডিটিভি।
এদিকে ২০১৫ সালে ‘পুলি’ নামে একটি তামিল চলচ্চিত্রের আয়কর সংক্রান্ত ‘অনিয়মের’ মামলায় বিজয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে মাদ্রাজ হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন হয়েছে। নিউজ এইটটিন বলছে, মামলা হলে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের শপথে আরো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
৪ মে ঘোষিত নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, তামিলনাড়ু বিধানসভার মোট ২৩৪ আসনের মধ্যে টিভিকে ১০৮টিতে জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ১১৮টি আসন প্রয়োজন, তাই জোট গড়ার কথাই ভাবছেন বিজয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্বাচনে জিতলেও বিজয়কে সরকার গঠনের জন্য দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) দলের নেতৃত্বাধীন ‘সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (এসপিএ)’ অথবা অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) দলের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের সমর্থন নিতে হবে। নির্বাচনে ডিএমকে জয়ী হয়েছে ৫৯ আসন আর এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি আসন।
তবে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৫টি আসনে জয় পাওয়া কংগ্রেসের সঙ্গেই জোট করার জন্য বিজয় যোগাযোগ করেছেন। নিজেদের ১০৮ এর সঙ্গে কংগ্রেসের আসনগুলো মিলে প্রথমে ১১৩ সংখ্যায় পৌঁছাতে চায় তারা। স্বতন্ত্র হিসেবে, ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের নিজেদের দিকে ভিড়িয়ে বাকি পাঁচটি আসন নিশ্চিত করে ১১৮ এর ‘ম্যাজিক ফিগারে’ পৌঁছাতে চায় টিভিকে।
কিন্তু তাতেও নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করার পর সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পেতে বুধবার রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের সঙ্গে দেখা করেন বিজয়। তখনই শপথের আগে বিজয়কে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দেন রাজ্যপাল। এনডিটিভি বলছে, রাজ্যপাল মনে করছেন, কংগ্রেস বিজয়কে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার গড়তে ‘ম্যাজিক ফিগার’ ১১৮-তে পৌঁছাতে বাকি আসনগুলো নিয়ে তার সন্দেহ আছে।
গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের এই ‘ত্রিশঙ্কু ফলাফল’ তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ গত ছয় দশক ধরে রাজ্যটিতে কেবল ডিএমকে বনাম এআিএডিএমকের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই চলছিল।
রাজ্যপাল অফিস সূত্রের বরাতে এনডিটিভি বলছে, বৃহস্পতিবার সকালে রাজ্যপালের সঙ্গে বিজয়ের আবার সাক্ষাৎ হয়। এ সময় বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় বিজয়কে।
রাজ্যপাল জানতে চান, কীভাবে মাত্র ১১৩ জন বিধায়ক নিয়ে টিভিকে সরকার পরিচালনা করবে? এ ক্ষেত্রে রাজ্যপাল আরলেকার জেদ ধরেছেন, বিজয়কে ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনের চিঠি দেখাতে হবে। এর বাইরে বিজয় শপথ নিতে পারবেন না।
এই অচলাবস্থা নিয়ে টিভিকি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছে, রাজ্যপালকে তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে তারা আইনি লড়াইয়ে নামতে পারে। এ বিষয়ে তারা বামপন্থি দলগুলো (সিপিআই ও সিপিএম) এবং ভিডুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চির (ভিসিকে) সমর্থন পেয়েছে। এই তিনটি দলই ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হলেও টিভিকে তাদের সঙ্গে আসন পরিবর্তনের বিষয়ে যোগাযোগ করেছে।
ভিজিসি প্রধান থিরুমাভালাভান এনডিটিভিকে বলেন, আমরা সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের সঙ্গে আছি। তবে আমরা আগামী দু-একদিনের মধ্যে বিজয়কে সমর্থনের বিষয়ে আলোচনা করব। তিনি রাজ্যপালকে বিজয়ের দাবি মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, একটি নতুন সরকারকে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয় বিধানসভায়, রাজ্যপালের কাছে নয়।
বিজয়ের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে ডিএমকেও। তামিলনাড়ুর বিদায়ি এই শাসক দল রাজ্যপালের পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং জনগণের রায়ের প্রতি ‘অসম্মান’ বলে অভিহিত করেছে। তামিলনাড়ুর আরেক চলচ্চিত্র অভিনেতা কমল হাসানও বিজয়ের হয়ে সরব হয়েছেন। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, বিজয় ১০৮টি আসন জিতেছে। তাকে সরকার গড়তে আমন্ত্রণ না জানানো তামিলনাড়ুর মানুষের প্রতি অসম্মান। এটি গণতন্ত্রের ক্ষতি।
এনডিটিভির আরেক খবরে বলা হয়, কংগ্রেসের পাঁচটি আসন বর্তমানে বিজয়ের পকেটে রয়েছে। এখন বামপন্থি এবং ছোট তামিল দলগুলো বাকি আসনগুলোর সমর্থন দিলে বিজয় তার সিনেমা থেকে রাজনীতিতে আসার পূর্ণতা পাবেন। যেমনটা এর আগে সি এন আন্নাদুরাই, এমজিআর, জয়ললিতা এবং করুণানিধি করেছিলেন।
বিজয়ের হাতে এখনও কিছুটা সময় আছে। বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১০ মে। এর মধ্যে তাকে রাজ্যপালকে বোঝাতে হবে, তার কাছে পর্যাপ্ত আসন রয়েছে। টিভিকের সঙ্গে কংগ্রেস, বাম ও ভিসিকের মধ্যে সম্ভাব্য জোট বিজয়কে ১১৯টি আসন দেবে। তবে বিজয়ের এই যাত্রাপথে ‘কাঁটা বিছিয়ে’ দিচ্ছে বিজেপি। রাজ্যপালের মত তারাও দাবি করছে, বিজয়ের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই এবং শপথের আগেই তাকে তা প্রমাণ করতে হবে।
এদিকে কর অনিয়মের অভিযোগে বিজয়েরর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবি জানিয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্টে হওয়া রিট পিটিশনও টিভিকের চিন্তা বাড়াচ্ছে।
নিউজ এইটটিনের খবরে বলা হয়, পিটিশনটি গত মাসে দাখিল করা হয়। তবে রেজিস্ট্রারি বিভাগ প্রাথমিকভাবে মামলাটি নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করে। এর প্রেক্ষিতে ৮ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সুশ্রুত অরবিন্দ ধর্মাধিকারী এবং বিচারপতি জি আরুল মুরুগানের একটি ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা সাপেক্ষে রেজিস্ট্রারি বিভাগকে এটি নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন।
২০১৫ সালে ‘পুলি’ সিনেমাটি মুক্তির পর শুরু হওয়া আয়কর কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করেই এই পিটিশন করা হয়েছে। পিটিশনে উদ্ধৃত নথি অনুযায়ী, আয়কর বিভাগ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়েছিল। সে সময় কিছু নথিপত্র উদ্ধার করা হয়, যাতে ওই সিনেমার জন্য বিজয়ের পারিশ্রমিক সংক্রান্ত অঘোষিত নগদ লেনদেনের ইঙ্গিত আছে।






