তারুণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই বাস্তব পরিকল্পনা
আব্দুর রহমান
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে কতটা দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা হচ্ছে তার ওপর। তরুণেরা শুধু জনসংখ্যার অংশ নন, তাঁরা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাসংগ্রাম, গণতন্ত্রের আন্দোলন এবং বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামে তরুণদের সাহসী ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তাঁদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আজ ১ নভেম্বর জাতীয় যুব দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে পুরস্কার প্রদান, চাকরি মেলা, প্রশিক্ষণ ও যুব ঋণ বিতরণের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ উৎসাহব্যঞ্জক হলেও যুব উন্নয়নকে দিবসকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর পরিকল্পনা।
তরুণদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও সবার জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব ও হতাশা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য। তাই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষি প্রযুক্তি ও আধুনিক শিল্পে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে চাকরির পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের তরুণদের জন্য এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রয়োজন। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলায় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনে জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে মৎস্য চাষ, কাঁকড়া-চিংড়ি উৎপাদন, লবণসহিষ্ণু কৃষি, পশুপালন, পর্যটন ও ক্ষুদ্র শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় যুব উন্নয়ন কর্মসূচি সাজালে আঞ্চলিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
উদ্যোক্তা তৈরিতে শুধু ঋণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। ব্যবসা পরিচালনা, হিসাব সংরক্ষণ, উৎপাদন, বিপণন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। কতজন ঋণ পেলেন, তার চেয়ে কতজন উদ্যোক্তা টিকে থাকলেন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেনÑসেই বিবেচনায় কর্মসূচির সাফল্য মূল্যায়ন করা উচিত।
যুবসমাজের উন্নয়নে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বিকাশও জরুরি। মাদক, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও অপরাধপ্রবণতা থেকে তরুণদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
রাষ্ট্র ও সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা কিংবা নির্বাচনের সময় সমর্থন চাওয়াই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। মেধা, যোগ্যতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেই তরুণদের সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকশিত হবে।
যুব উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশির সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগ্য তরুণেরা যেন সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় যুব দিবসের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজনে নয়, তরুণদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরিতে। তাঁদের দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষিত তরুণ যেন বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় না থাকেন, একজন গ্রামীণ তরুণ যেন পুঁজি ও প্রশিক্ষণের অভাবে উদ্যোগ হারিয়ে না ফেলেন এবং মেধাবীরা যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারেনÑএমন পরিবেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
তরুণদের বোঝা নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। তারুণ্যের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশ উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে। তাই যুব দিবসের অঙ্গীকার হোকÑদক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ বিকাশে ধারাবাহিক বাস্তব পদক্ষেপ। লেখক: সম্পাদক, সাহিত্যপাতা






