কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের ব্যাংকিং খাতে আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে নগদ অর্থ সংকট ও আর্থিক দুর্বলতার পুরোনো চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক এটিএম বুথে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও বুথ পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও আবার সীমিত করা হয়েছে টাকা উত্তোলনের পরিমাণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলায় বিধিনিষেধ। ফলে ঈদের আগে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, কোরবানির ঈদের সময় প্রতিবছরই নগদ টাকার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পশু কেনাবেচা, ঈদ কেনাকাটা, গ্রামের বাড়িতে যাওয়া এবং উৎসবকেন্দ্রিক বাড়তি ব্যয়ের কারণে মানুষ এই সময় ব্যাংক ও এটিএম বুথে বেশি ভিড় করেন। কিন্তু এবার সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অস্থিরতা এবং নতুন নোট সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত জটিলতা।
চাহিদামতো টাকা পায়নি ব্যাংকগুলো
একাধিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে এটিএম সচল রাখতে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ চেয়েছিলেন। কিন্তু চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করা হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের সীমিত নগদ ব্যবস্থাপনা দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঈদের সময় এটিএম বুথে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি টাকা লাগে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও উপজেলা পর্যায়ের বুথগুলোতে চাপ বেশি পড়ে। কারণ ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ও বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানে বুথের সংখ্যা কম হওয়ায় দ্রুত টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
একটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের বুথগুলোতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি টাকার চাহিদা তৈরি হয়েছে। সিআরএম মেশিনে জমা হওয়া টাকার একটি অংশ পুনর্ব্যবহার করা গেলেও পুরো চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
নতুন নোটে প্রযুক্তিগত জটিলতা
এবার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে নতুন গভর্নরের স্বাক্ষরযুক্ত নোট। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটিএম মেশিন সাধারণত নতুন নোট শনাক্ত করতে কিছুটা সময় নেয়। কিন্তু এবার নতুন নোট বাজারে ছাড়ার আগে এটিএম সফটওয়্যার ও যন্ত্রগুলোকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে মেশিন টাকা আটকে দিচ্ছে অথবা নোট শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত নতুন নোটের সঙ্গে এটিএম মেশিনের পুরোপুরি সামঞ্জস্য আনতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু ঈদের চাপের মধ্যে সেই সুযোগ পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকারদের মতে, পুরোনো নকশার নোটে শুধু গভর্নরের স্বাক্ষর পরিবর্তন হওয়ায় শুরুতে সমস্যা হবে না বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, মেশিনগুলো নতুন স্বাক্ষরযুক্ত নোট শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছে।
দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহকদের ভোগান্তি বেশি
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে দুর্বল হয়ে পড়া কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এসব ব্যাংকের অনেক এটিএম বুথ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের গ্রাহকরা অন্য ব্যাংকের বুথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
কিন্তু ঈদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক ব্যাংক এখন নিজেদের গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের বুথে অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের বুথগুলোতে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের চাপ অত্যন্ত বেশি। কিন্তু নিজেদের গ্রাহকদের চাহিদাই পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিজস্ব গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
নগদ সংকট নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে এবং এটিএম বুথ সচল রাখতে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, সব ব্যাংককে সার্বক্ষণিক এটিএম সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে দ্রুত সমাধানের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক আর্থিক সংকটে রয়েছে, তারা পর্যাপ্ত নগদ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এটিএম সংকট শুধু ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক সমস্যা নয়; এটি দেশের ব্যাংক খাতের গভীর দুর্বলতারও প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমে গেছে। ফলে সামান্য চাপেই সেবাব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
পশুর হাটে বিশেষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা
এদিকে নগদ টাকার চাহিদা সামাল দিতে কোরবানির পশুর হাটসংলগ্ন বেশ কিছু ব্যাংক শাখা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পশুর হাট ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাট এলাকায় বিশেষ লেনদেন সেবা চালু রাখা হয়েছে।
এসব শাখা ঈদের আগের রাত পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এছাড়া তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট কিছু শাখায় গভীর রাত পর্যন্ত লেনদেনের সুবিধা রাখা হয়েছে, যাতে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে সমস্যা না হয়।
ডিজিটাল লেনদেনেও বাড়ছে নির্ভরতা
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিএম সংকটের কারণে মোবাইল ব্যাংকিং, কিউআর কোড, পস মেশিন ও অনলাইন লেনদেনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তবে কোরবানির পশুর হাটে এখনো বড় অংশের লেনদেন নগদ নির্ভর হওয়ায় নগদ টাকার চাহিদা কমছে না।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাংকগুলোকে শুধু এটিএম বুথ বাড়ালেই হবে না; বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নগদ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃব্যাংক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। না হলে প্রতি ঈদেই গ্রাহকদের একই ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে।