সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: শিক্ষার্থীহীন মাদ্রাসায় ১৭ শিক্ষক-কর্মচারী!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল প্রাণ হলো শিক্ষার্থী। অথচ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার যে চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী নেই, কোনো শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা উপকরণ নেই, সেখানে কাগজে-কলমে বহাল তবিয়তে আছেন ১৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারী! দিনের বেলা যে মাদ্রাসার জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষগুলো ব্যবহৃত হয় গোয়ালঘর বা ছাগল বাঁধার স্থান হিসেবে আর রাতে যেখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডাÑসেই ভুতুড়ে প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে সরকারি বই, উপবৃত্তি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে কোন জাদুবলে, সেই প্রশ্ন এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
১৯৯৮ সালে স্থানীয়দের দান করা জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটি শুরুর দিকে ভালো চললেও পরবর্তী সময়ে সুপারিন্টেন্ডেন্টের নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ২০১১ সাল থেকে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। অথচ সরকারি খাতায় প্রতিষ্ঠানটিকে সচল দেখাতে প্রতি বছর জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো, চলতি বছরও প্রতিষ্ঠানটি ২২৫ সেট নতুন বইয়ের চাহিদা পাঠায় এবং প্রাক-প্রাথমিক থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি বই বরাদ্দও পায়! যেখানে বাস্তবে একজন শিক্ষার্থীরও অস্তিত্ব নেই, সেখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি বই এবং উপবৃত্তির টাকা কাদের পকেটে যাচ্ছে, তা বুঝতে খুব একটা বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, শিক্ষার পবিত্র আঙিনাকে ব্যবহার করে এখানে এক পারিবারিক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নামে বরাদ্দ হওয়া সমস্ত সরকারি অনুদান ও সুবিধা মূলত সুপার ও তাঁর সহকারী শিক্ষিকা স্ত্রী মিলে আত্মসাৎ করছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সরেজমিন অনুসন্ধানেও এর প্রমাণ মিলেছে। যখন মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে ছাগল ও গোখাদ্য মজুত থাকতে দেখা যায়, তখন সহকারী শিক্ষিকা নিজ বাড়িতে ধান শুকানোর ফাঁকে ‘এইমাত্র ক্লাস নিয়ে আসার’ যে দাবি করেন, তা এক চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। শিক্ষার নামে এমন প্রকাশ্য জালিয়াতি ও প্রতারণা বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে চলছে, তা ভাবতেই অবাক লাগে।
ইতিমধ্যেই জমিদাতারা শিক্ষাহীন এই প্রতিষ্ঠানের কবল থেকে তাঁদের সম্পত্তি ফেরত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এই জালিয়াতির খবর শুনে বিস্মিত হয়েছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আমরা মনে করি, শুধু সাধারণ খোঁজখবর নেওয়াই যথেষ্ট নয়। এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সরকারি সম্পদ ও অর্থ আত্মসাতের যে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তার শিকড় উপড়ে ফেলা জরুরি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে এমন তামাশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার এই জালিয়াতির ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় এনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।









