দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত আদালত: সাতক্ষীরার মানুষের প্রত্যাশা
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
সাতক্ষীরা জেলা জজ কোর্ট ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাম্প্রতিক মামলার পরিসংখ্যান যেকোনো সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। জেলাজুড়ে বর্তমানে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ৭৭ হাজার। একটি সীমান্তবর্তী জেলায় মামলার এই বিশাল সংখ্যা শুধু বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপই তৈরি করছে না, বরং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলছে স্থবির।
মামলার এই বিভাজন বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। জেলা জজের আওতাধীন আদালতে (দেওয়ানি ও ফৌজদারি) বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার-এর বেশি মামলা। এর মধ্যে দেওয়ানি মোকদ্দমার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-প্রায় ২৪ হাজার ৮৯৩টি। বছরের পর বছর ধরে চলা ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং পারিবারিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত জটিলতাও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। এর বাইরে ফৌজদারি মামলা রয়েছে ১৩ হাজার ২৮৭টি এবং ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আটকে আছে ৭ হাজার ২৩৬টি মামলা। অন্যদিকে, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (আমলি ও বিচারিক) মামলার সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৮১০টি।
এই পরিসংখ্যানের পেছনের গল্পটি বেশ বেদনাদায়ক। একটি মামলার পেছনে বছরের পর বছর ঘুরতে গিয়ে সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ আজ নিঃস্ব। জমিজমার বিরোধ কিংবা ফৌজদারি অপরাধের সুরাহা পেতে দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় জুতো ক্ষয় করছেন বিচারপ্রার্থীরা। মামলা পরিচালনার খরচ, যাতায়াত ব্যয় এবং বারবার আদালতে হাজির হওয়ার কারণে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ছে।
এর মধ্যে আদালতকেন্দ্রিক ঘুষ-বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে নিঃস্ব, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য এ ধরনের অনিয়ম ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ঘুষ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। সময়মতো বিচার না পাওয়া বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্তা হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মামলাজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিচারকের শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন মামলাগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সাক্ষীদের সময়মতো হাজির করা, তদন্তে অযথা বিলম্ব কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় মুলতবি এড়ানোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। দেওয়ানি বিরোধের ক্ষেত্রে আইনসম্মত মধ্যস্থতার সুযোগ কাজে লাগানো গেলে কিছু মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিও সম্ভব।
সাতক্ষীরার মামলাজট শুধু আদালতের সমস্যা নয়; এটি হাজারো বিচারপ্রার্থীর জীবন, সময় ও অর্থের সঙ্গে জড়িত। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা। আদালতের দীর্ঘ বারান্দায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করা মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বস্তিতে রূপ নেয় এটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা।









