শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

নবারুণ গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদ ও অনিয়মের সত্যতা, ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ
নবারুণ গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদ ও অনিয়মের সত্যতা, ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, বিধি বহির্ভূত নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর।
গত ১৫ জুলাই যশোর শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক মুঃ এনামুল কবীর স্বাক্ষরিত এক পত্রে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক কবীর আহমেদ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে একটি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা বোর্ডের অনুরোধে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসকের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করে। জেলা প্রশাসক উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত পোষণ করে তা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রেরণ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর বিরুদ্ধে মূলত ছয়টি সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো— সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে তাঁর প্রাথমিক নিয়োগ ও যোগদান প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। রয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জিত তাঁর বি.এড সনদটি ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। ২য় শ্রেণীতে স্নাতক পাশ করার পূর্বেই সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনি সিনিয়র স্কেল সুবিধা গ্রহণ করেছেন। সেকায়েপ (ঝঊছঅঊচ) প্রকল্পের অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালার চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে। নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে অতিরিক্ত শাখা খোলা এবং খ-কালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিধি বহির্ভূতভাবে ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত কিশোরী টয়লেট এবং ‘কমফোর্ট জোন’ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রেরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক দ্রুত আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এই চিঠির অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং অভিযোগকারী সিনিয়র শিক্ষক কবীর আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

Ads small one

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী

পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): পাইকগাছার নার্সারী গুলিতে গুটি কলম তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে মালিক ও শ্রমিকরা। গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। সাধারণত বৈশাখ-আষাঢ় গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময়। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়া ও মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় এই সময়ে কলমের ডালে খুব দ্রুত ও সফলভাবে শিকড় গজায়।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে গুটিকলম ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ মাতৃগাছে গুণাগুন সমৃদ্ধ চারা করার জন্য গুটিকলম জনপ্রিয়। কাগজি লেবু, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, ডালিম, করম চা, গোলাপ জামসহ বিভিন্ন গাছে গুটি কলম করা হয়।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। বর্ষা মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা গুটিকলম তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে। যে গাছের ডালে গুটি করা হবে সে ডালের বয়স কমপক্ষে ৬ মাস থেকে ২ বছর হতে হবে। গুটি কলম তৈরী করতে গাছের ডালের দুই ইঞ্চি মত ছাল পুরাটা গোল করে কেঁটে ফেলে জৈব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁটা অংশ ভাল করে বেঁধে গুটি করতে হবে। মাটির গুটি সবসময় ভিজা রাখতে হবে। মাটিতে পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ১ মাসের মধ্যেই মাটির ভিতর থেকে শিকড় বেড় হয়।

হিতামপুর গ্রামে অবস্থিত রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, এ বছর তার নার্সারীতে ২৫ হাজার গুটি কলমের চারা তৈরী করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মিস্টি জলপাই, মাল্টা, পেয়ারা ও লিচু।

গদাইপুর নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সরদার জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৪৫ হাজার গুটি কলম তৈরী করছেন। শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর গুটি কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। এছাড়া শামসুল, আক্তার, রওশনারা, মিজানুর, নাসির, নজরুল, বিল্লালসহ বিভিন্ন নার্সারি মালিক গুটি কলম তৈরি করছেন।

গদাইপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর হামিদ মোড়ল জানান, প্রতিটি গুটি দুই টাকা দরে তৈরী করছি। গোপালপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর মোক্তার ও সালাম বলেন, লেবু গুটি ২টাকা ও অন্য জাতের গুটি কলম ১ টাকা ৭০ পয়সা দরে তৈরী করছি।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার পাল জানান, কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় কারণে উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলার শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তেমনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১০ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

মো. মামুন হাসান

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু শিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় পর্যটন এমন একটি খাত, যা একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং একটি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত পর্যটন উন্নয়নের পরিবর্তে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকের পর্যটন উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত রোডম্যাপ।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটনের অবদান ছয় থেকে সাত শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল নতুন পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব ছিল। তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ কখনোই কার্যকর হতে পারে না। তাই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার অন্যতম শক্তি হলো দেশের এক হাজার চারশো আটানব্বইটি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা। এতদিন দেশের পর্যটন উন্নয়ন অনেকাংশে কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন পরিকল্পনা সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।

পর্যটন সম্পদকে তিপ্পান্নটি ক্লাস্টারে ভাগ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। একই নীতিতে সব অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির বিকাশ ঘটাবে।

তবে এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন।পর্যটন এমন একটি খাত, যেখানে একক কোনো মন্ত্রণালয় সফল হতে পারে না। সড়ক, রেল, নৌপরিবহন, বিমান, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, বন, প্রতœতত্ত্ব, সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা এবং তথ্য প্রযুক্তিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতে সমন্বয়ের অভাবই বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্পকে কাঙ্খিত সফলতা থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই এই মহাপরিকল্পনার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিশ্বমানের পর্যটন অবকাঠামো এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা কেবল কক্সবাজারকেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা ড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের পর্যটনকে বহুকেন্দ্রিক করে তুলবে। এর ফলে কক্সবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন।বিশ্বের কোনো পর্যটন শিল্পই দক্ষ জনবল ছাড়া সফল হয়নি। আধুনিক পর্যটন শিল্পে শুধু হোটেল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, হাউসকিপিং বিশেষজ্ঞ, ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। জাতীয় হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বিনিয়োগ।

এক্ষেত্রে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পর্যটন শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও আগামী দিনের পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি হতে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল ট্যুর, স্মার্ট ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল গাইডিং সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যটন সেবা বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। ভবিষ্যতের পর্যটক প্রথমে ইন্টারনেটে ভ্রমণ করেন, পরে বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছান। তাই ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্য অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর, নদী এবং উপকূলীয় পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ইকো ট্যুরিজম, কমিউনিটি ট্যুরিজম এবং জলবায়ু সহনশীল পর্যটন উন্নয়নকে এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।

স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। বরং স্থানীয় মানুষকে উদ্যোক্তা, গাইড, হোমস্টে পরিচালনাকারী, কারুশিল্প উৎপাদক এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত করতে পারলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যাবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ এবং টেকসই পর্যটনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের নদী, বন, সমুদ্র, পাহাড়, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন এবং আতিথেয়তার ঐতিহ্য এই পরিবর্তিত বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে মহাপরিকল্পনা সফল হবে তখনই, যখন এটি কেবল একটি সরকারি নথি হয়ে থাকবে না; বরং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পাবে।

আজ যে মহাপরিকল্পনার সূচনা হয়েছে, সেটি যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বয়ের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী দুই দশকে পর্যটন শুধু বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাতই থাকবে না; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, ব্যাপক কর্মসংস্থানের উৎস, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।