নিঃশব্দ বিপ্লবের নাম রক্তদান/ তারিক ইসলাম
তারিক ইসলাম
ডিজিটাল স্ক্রিনে তখন রাত দুটো। ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতেই চোখে পড়ল একটা পরিচিত আর্জি-“জরুরি ভিত্তিতে ও-নেগেটিভ রক্ত প্রয়োজন। স্থান: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। যোগাযোগের নম্বর…”। এই একটি পোস্টের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি পরিবারের আকুলতা, উৎকণ্ঠা আর বেঁচে থাকার শেষ লড়াই। প্রতি বছর ১৪ জুন ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ যখন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন এই স্ক্রিনশটগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়-বিজ্ঞান যতই মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখুক না কেন, ল্যাবরেটরিতে আজও এক ফোঁটা কৃত্রিম রক্ত তৈরি করা সম্ভব হয়নি। মানুষের জীবনের বিকল্প আজও কেবলই মানুষ।
আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে রক্তদান কেবল একটি ‘মানবিক কাজ’ বা ‘ধর্মীয় পুণ্য’ নয়; এটি মূলত একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক সচেতনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি-নির্ভর। ওপেন হার্ট সার্জারি, জটিল ক্যানসার থেরাপি, অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট কিংবা থ্যালাসেমিয়া ও হিমোফিলিয়ার মতো জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় রক্তের চাহিদা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে সেই দেশের রক্তের মৌলিক চাহিদা মেটানো সম্ভব।
উন্নত বিশ্বে যেখানে ‘ভলান্টিয়ার ব্লাড ডোনেশন’ বা স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার প্রায় শতভাগ, সেখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখনো সিংহভাগ রক্ত আসে রোগীর আত্মীয়-স্বজন বা ‘রিপ্লেসমেন্ট ডোনার’-দের কাছ থেকে। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দারুণ পারদর্শী। তারা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করছে, ফুড ডেলিভারি নিচ্ছে এক ক্লিকে। কিন্তু রক্তের মতো জরুরি প্রয়োজনের সময় এখনো আমাদের ফেসবুক গ্রুপ বা মেসেঞ্জার চ্যাটের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক সময় সঠিক সময়ে রক্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
আমাদের এখন ‘স্মার্ট ডোনেশন’ কালচারের দিকে যেতে হবে। রক্তদানকে একটি সামাজিক ফ্যাশন বা লাইফস্টাইল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বছরে তিনবার রক্ত দেওয়াকে যদি একজন তরুণ তার ফিটনেস রুটিনের অংশ করে নেয়, তবে ব্লাড ব্যাংকগুলো কখনোই শূন্য থাকবে না।
আপনি যখন এক ব্যাগ রক্ত দিচ্ছেন, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেটিকে ভেঙে লোহিত কণিকা, প্লাটিলেট এবং প্লাজমা-এই তিনটি উপাদানে ভাগ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, আপনার এক ব্যাগ রক্ত আধুনিক চিকিৎসায় তিনজন ভিন্ন রোগীকে নতুন জীবন দিচ্ছে। এর চেয়ে বড় ‘মাল্টিটাস্কিং’ আর কী হতে পারে?
অনেকে এখনো ভাবেন রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। নিয়মিত রক্তদান আসলে শরীরের এক চমৎকার ‘রিসেন্ট বাটন’।
নতুন রক্তকণিকা সৃষ্টি: রক্ত দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শরীরের তরল অংশ পূরণ হয়ে যায় এবং দ্রুত নতুন ও সতেজ রক্তকণিকা তৈরি হতে শুরু করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস: রক্তে অতিরিক্ত আয়রন জমা হলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত রক্তদান শরীরে আয়রনের ভারসাম্য বজায় রাখে, যা কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী।
ফ্রি হেলথ চেকআপ: প্রতিবার রক্ত দেওয়ার আগে হেপাটাইটিস বি, সি, এইডসের মতো মারাত্মক রোগের স্ক্রিনিং এবং রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
১৪ জুনের ক্যালেন্ডারে রক্তদাতা দিবস আসে মূলত সেইসব নায়কদের স্যালুট জানাতে, যারা কোনো প্রতিদান ছাড়াই নিজেদের শরীরের তরল সোনা বিলিয়ে দেন অন্যকে বাঁচানোর জন্য। তবে এই দিবসটিকে শুধু সেমিনার আর র্যালির ফ্রেমে বন্দি রাখলে চলবে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্লাড ব্যাংকগুলোর আধুনিকায়ন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রক্তের উপাদান পৃথকীকরণের প্রযুক্তি পৌঁছানো এবং রক্তদান প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ কাগজহীন ও ডিজিটাল করা এখন সময়ের দাবি।
আসুন, এই রক্তদাতা দিবসে আমরা ট্র্যাডিশনাল চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক হই। রক্ত দেওয়া কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি একজন সুস্থ মানুষের সুস্থ থাকার এবং অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার আধুনিক নাগরিক দায়িত্ব। আপনার রক্তে সচল থাকুক অন্য কারও লাইফ-সাপোর্ট।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












