নোটারি পাবলিক দিবস: স্বচ্ছতা ও জালিয়াতি রোধে সচেতনতা
সাকিবুর রহমান বাবলা
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখতে নির্ভরযোগ্য দলিলপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তিগত ঘোষণা, চুক্তি, হলফনামা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত বিভিন্ন নথির সত্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নোটারি পাবলিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের দায়িত্ব কেবল কোনো কাগজে সিল ও স্বাক্ষর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিচয় যাচাই, স্বাক্ষরের সত্যতা নিশ্চিত করা, শপথ গ্রহণ করানো এবং আইনি লেনদেনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও জড়িত। আইন পেশা ও জনজীবনে নোটারি পাবলিকদের এই অবদানকে সম্মান জানাতে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর পালিত হয় নোটারি পাবলিক দিবস।
দিবসটির প্রচলন ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৪ সালে আমেরিকান সোসাইটি অব নোটারিজ ৭ নভেম্বরকে নোটারি পাবলিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রে দিবসটির বিশেষ গুরুত্ব থাকলেও নোটারি পেশার দায়িত্ব ও অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দিবসটির তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশটির নোটারি ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নোটারি পাবলিক হিসেবে পরিচিত টমাস ফুগিলকে ১৬৩৯ সালের ২৫ অক্টোবর তৎকালীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে নিউ হ্যাভেন কলোনিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখটি ৭ নভেম্বরের সঙ্গে মিলে যায়। এই ঐতিহাসিক স্মৃতিই দিবসটির তারিখ নির্বাচনের ভিত্তি।
নোটারি ব্যবস্থার শিকড় প্রাচীন মিসর ও রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিস্তৃত। সে সময় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, রাজকীয় নির্দেশ, সম্পত্তি ও লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লিপিকার নিয়োগ করা হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই দায়িত্ব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নোটারি পাবলিক একটি স্বীকৃত আইনি পেশায় পরিণত হন।
নোটারি পাবলিকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতারণা ও জালিয়াতি প্রতিরোধে সহায়তা করা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিলে স্বাক্ষরকারীর পরিচয় যাচাই, তাঁর স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শপথ বা ঘোষণা গ্রহণের মাধ্যমে নথির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো তাঁদের কাজ। হলফনামা, চুক্তিপত্র, সম্পত্তিসংক্রান্ত নথি, শিক্ষাগত সনদ ও বিভিন্ন অনুবাদিত দলিলের সত্যায়নে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নোটারি করা মানেই কোনো দলিলের প্রতিটি বক্তব্য সত্য প্রমাণিত হওয়া কিংবা সেটি সব ক্ষেত্রে আদালতে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া নয়। নোটারির ক্ষমতা ও দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্ধারিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও নোটারি পেশার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে। ১৯২৩ সালে দেশটির ৩০তম রাষ্ট্রপতি ক্যালভিন কুলিজ দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বাবা জন কুলিজ তাঁকে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করান। তিনি একজন নোটারি পাবলিক ছিলেন। বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন, যাঁর প্রকৃত নাম স্যামুয়েল ক্লেমেন্স, এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের শেষ স্বাক্ষরকারী থমাস ম্যাককিনও জীবনের একপর্যায়ে নোটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব ঘটনা পেশাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে।
আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে নোটারি ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। আগে কাগজ, কালি, সিল ও স্বাক্ষরনির্ভর এই কার্যক্রম এখন অনেক দেশে দূরবর্তী অনলাইন নোটারাইজেশন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। ভিডিও কনফারেন্স, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ইলেকট্রনিক সিলের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থান থেকেও নথি সত্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও ইলেকট্রনিক নোটারাইজেশনের উদ্যোগ রয়েছে। ‘নোটারি বিডি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম অনলাইন সেবা দেওয়ার দাবি করে। তবে এ ধরনের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নোটারির সরকারি নিয়োগ, কার্যকর সনদ এবং ইলেকট্রনিক দলিলটি যে প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া হবে, সেখানে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশে নোটারি পাবলিক নিয়োগ ও পেশা পরিচালিত হয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে প্রধান আইন হলো ‘দ্য নোটারিজ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬১’ এবং ‘নোটারিজ রুলস, ১৯৬৪’। আইন অনুযায়ী, যে কেউ ইচ্ছা করলেই নোটারি হতে পারেন না। সাধারণত অন্তত সাত বছর পেশাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী, পাঁচ বছর বিচার বিভাগে কর্মরত ব্যক্তি এবং সরকারি আইন প্রণয়ন ও আইনের খসড়া তৈরির কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নির্ধারিত শর্তে নিয়োগের যোগ্য বিবেচিত হন। নোটারির সনদ তিন বছর মেয়াদি এবং নির্ধারিত নিয়মে নবায়নযোগ্য। সরকার প্রতিবছর কার্যরত নোটারিদের তালিকা সরকারি গেজেটে প্রকাশ করে।
সাধারণ মানুষ জেলা জজ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ কিংবা লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবীদের চেম্বারে নোটারি সেবা নিতে পারেন। তবে সেবা গ্রহণের আগে নোটারির নিয়োগ ও সনদের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর সরকারি নোটারি সিল, নিবন্ধনসংক্রান্ত পরিচিতি, স্বাক্ষর, নোটারি রেজিস্টার এবং দলিলের তারিখ ও ক্রমিক নম্বর সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত। কেউ নিজেকে নোটারি পরিচয় দিলেই তাঁকে বিশ্বাস করা নিরাপদ নয়। কারণ বৈধ সনদ ছাড়া নোটারি কার্যক্রম পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয়।
নোটারি করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দলিলের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। নতুন কোনো ঘোষণা, অঙ্গীকারনামা বা চুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপার ব্যবহার করতে হয়। নাম বা বয়স সংশোধনসংক্রান্ত হলফনামায় প্রচলিতভাবে ২০০ বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহারের কথা বলা হলেও প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিলের ধরন ও সরকারি স্ট্যাম্প শুল্কের বিধান অনুসরণ করতে হবে। চুক্তিপত্রের ক্ষেত্রেও ৫০, ১০০ বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাগত সনদ, নম্বরপত্র, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ফটোকপি সত্যায়নে সাধারণ এ৪ বা লিগ্যাল সাইজের কাগজ ব্যবহার করা যায়। অনুবাদিত দলিলও সাধারণ সাদা কাগজে প্রস্তুত করা সম্ভব। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি ফি ও রাজস্ব স্ট্যাম্পের নিয়মও মানতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নোটারি করা আর বিবাহ নিবন্ধন এক বিষয় নয়। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে শুধু হলফনামা বা ঘোষণাপত্র তৈরি করলেই আইনগতভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় না। একইভাবে বিবাহবিচ্ছেদ বা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইনের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। নোটারি সেবার প্রকৃতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও সম্মতি যাচাই করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতারণা এড়াতে দালালের পরিবর্তে সরাসরি অনুমোদিত নোটারি পাবলিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, মূল কাগজপত্র প্রদর্শন করা এবং নোটারি করা দলিলের গ্রহণযোগ্যতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে নিশ্চিত করা উচিত। বিশেষ করে বিদেশে ব্যবহারের জন্য দলিল সত্যায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রত্যয়ন বা অ্যাপোস্টিলের প্রয়োজন হতে পারে।
নোটারি পাবলিকরা নেপথ্যে থেকে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি শক্তিশালী করেন। তাঁদের দায়িত্বশীলতা আইনি জটিলতা কমাতে, প্রতারণার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় সহায়তা করে। তাই ৭ নভেম্বরের নোটারি পাবলিক দিবস কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীকে সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি আইনি সচেতনতা, স্বচ্ছতা, সততা ও জনআস্থার গুরুত্ব স্মরণ করারও উপলক্ষ। যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং আইনের কঠোর অনুসরণের মাধ্যমে নোটারি পেশা আরও জনবান্ধব ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠুক—দিবসটির প্রত্যাশা হোক সেটিই।






