শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার যোগ্য নয়, কিন্তু আইন শেখানোর দায়িত্ব কার?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:১৩ অপরাহ্ণ
আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার যোগ্য নয়, কিন্তু আইন শেখানোর দায়িত্ব কার?

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

আমাদের আইনি ব্যবস্থার একটি বহুল প্রচলিত নীতি হলো—Ignorantia juris non excusat। অর্থাৎ, আইনের অজ্ঞতা সাধারণত আইনি দায় থেকে মুক্তির অজুহাত হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যে আইন সম্পর্কে জানার সুযোগ কিংবা আগ্রহ—কোনোটিই বেশির ভাগ নাগরিকের মধ্যে তৈরি হয়নি, সেই আইন সম্পর্কে তাঁদের সচেতনতা গড়ে উঠবে কীভাবে? রাষ্ট্র যখন নাগরিকের কাছে আইন মেনে চলার প্রত্যাশা করে, তখন নাগরিককে আইন জানার সুযোগ করে দেওয়ার দায়িত্ব কার?

বাংলাদেশে সংবিধান রয়েছে, প্রচলিত আইন রয়েছে, নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্বও নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এসব অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেকেই জানেন না, সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে, পুলিশের কাছ থেকে সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের আইনগত অধিকার কী, ভাড়াবাড়ির চুক্তিতে কী কী বিষয় থাকা প্রয়োজন কিংবা অনলাইনে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হলে কোথায় প্রতিকার চাইতে হবে। ফলে কোনো আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁরা অনেক সময় অন্যের পরামর্শ, মধ্যস্থতাকারী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ রাইট টু ইনফরমেশন সার্ভেতে। বাংলাদেশ রাইট টু ইনফরমেশন ফোরামের উদ্যোগে পরিচালিত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জানতেন। অর্থাৎ, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই এ গুরুত্বপূর্ণ আইন সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আইনটি সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ তথ্য চাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা রাখেন। অর্থাৎ, তথ্য পাওয়ার অধিকার থাকলেও কীভাবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে হয়, তা জানেন না অধিকাংশ মানুষ।

সমস্যাটি শুধু তথ্য অধিকার আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে আইনি জ্ঞানের অভাব সাধারণ মানুষকে অসহায় করে তুলছে। জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, ভাড়াবাড়ির চুক্তি, পারিবারিক বিরোধ, কর্মক্ষেত্রে অধিকার, ভোক্তা অধিকার কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির মতো ঘটনায় অনেকেই নিজের আইনগত অবস্থান সম্পর্কে জানেন না। ফলে কেউ প্রতারণার শিকার হন, কেউ অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মুখে পড়েন, আবার কেউ প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারেন না।

এখানে আমাদের সমাজের আরেকটি বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে আইন সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। অনেকের কাছে আইন মানেই মামলা, আদালত, থানা কিংবা নানা ধরনের ঝামেলা। আইন নিয়ে পড়াশোনা করা বা আইনি অধিকার সম্পর্কে জানার বিষয়টিকেও অনেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করেন না। বরং যাঁরা আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন, আইনগত অধিকার সম্পর্কে কথা বলেন কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনসম্মত প্রতিকারের পরামর্শ দেন, তাঁদের কখনো কখনো নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কাউকে কাউকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়, তিনি বেশি আইন বোঝেন কিংবা সবকিছুতেই আইন খোঁজেন।

অথচ আইন জানা মানেই মামলা করা নয়, অন্যের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোও নয়। বরং আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে অনেক বিরোধ ও প্রতারণা শুরুতেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। নিজের অধিকার, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়। সমাজে আইনজ্ঞানকে নেতিবাচকভাবে দেখার এই প্রবণতা পরিবর্তন করা জরুরি। আইন নিয়ে পড়াশোনা করা কিংবা আইন সম্পর্কে সচেতন হওয়াকে উৎসাহিত করতে হবে, নিরুৎসাহিত নয়।

বর্তমান সমাজে এক ধরনের আইনি পরনির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। নিজের অধিকার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা না থাকায় একজন নাগরিককে সামান্য সমস্যার সমাধানেও অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই নির্ভরশীলতা শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধাই সৃষ্টি করে না, বরং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বাড়িয়ে দেয়। অথচ নাগরিকের আইনি সচেতনতা থাকলে এসব পরিস্থিতি অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব।

আইনি শিক্ষা গ্রহণের অর্থ সবাইকে আইনজীবী হতে হবে, এমন নয়। বরং একজন সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে পারেন কখন তাঁর অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, কোন বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন এবং কীভাবে আইনসম্মত উপায়ে প্রতিকার চাইতে হয়—সেই মৌলিক জ্ঞান নিশ্চিত করাই আইনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক কেবল ভোটার নন, তিনি রাষ্ট্রের অধিকারসম্পন্ন অংশীদার। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাওয়া, সরকারি সেবা গ্রহণ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিকের প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। নাগরিক যত বেশি আইন সম্পর্কে সচেতন হবেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির ক্ষেত্রও তত বেশি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে নাগরিকেরও মনে রাখতে হবে, অধিকার ভোগের পাশাপাশি আইন মেনে চলা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করা তাঁর দায়িত্ব।

আমরা প্রায়ই দুর্নীতি, অনিয়ম, হয়রানি ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে কথা বলি। কিন্তু এসব সমস্যা মোকাবিলায় নাগরিকের আইনি সচেতনতা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। আইন সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষ অনেক সময় নিজের অধিকার হারান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পান কিংবা প্রতিকারের সঠিক পথ খুঁজে পান না। অন্যদিকে সচেতন নাগরিক আইনসম্মতভাবে নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

অতএব, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা আইন প্রয়োগ করলেই চলবে না; আইনের ভাষা, উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের পথ সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিকের আইন জানার সুযোগ তৈরি করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মৌলিক আইনি জ্ঞান দিতে হবে, পরিবার ও সমাজকে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, গণমাধ্যমকে সচেতনতা ছড়াতে হবে এবং নাগরিককেও আইন জানার আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

Ads small one

পাটকেলঘাটার মেলেকবাড়ি দারুস সালাম আলিম মাদ্রাসার সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৬ অপরাহ্ণ
পাটকেলঘাটার মেলেকবাড়ি দারুস সালাম আলিম মাদ্রাসার সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

পাটকেলঘাটা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার মেলেকবাড়ি দারুস সালাম আলিম মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন কুমিরা মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি এর আগে তালা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে তালা উপজেলা কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মাদ্রাসাটির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন তালা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মৃণালকান্তি রায়, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম এবং কুমিরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও তালা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা।

এদিকে, গতকাল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নবনির্বাচিত অ্যাডহক কমিটির সভাপতিকে সংবর্ধনা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

খেজুর রসের মিষ্টি সুবাস ও শীতের স্নিগ্ধ পরশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:২৮ অপরাহ্ণ
খেজুর রসের মিষ্টি সুবাস ও শীতের স্নিগ্ধ পরশ

তারিক ইসলাম

শীত মানেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, নরম রোদ আর চারদিকে এক অদ্ভুত আলস্যমাখা আবহ। ভোরের প্রথম আলো যখন গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের ওপর পড়ে, তখন চারপাশটা যেন মুক্তোর মতো ঝলমল করে ওঠে। শীতের এই আগমনী বার্তা গ্রামবাংলায় নিয়ে আসে আমাদের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ—খেজুরগাছ। ঋতুচক্রের আবর্তনে হেমন্তের শেষ থেকেই বাংলার গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় এই গাছকে ঘিরে এক অপূর্ব কর্মব্যস্ততা। গাছিদের নিপুণ হাতে হাঁড়ি বাঁধার শব্দ, রসের মিষ্টি গন্ধ আর শীতের সকালে উনুনের ধোঁয়া মিলে তৈরি করে এক মায়াবী আবহ।

শীতকালে গ্রামবাংলার মেঠোপথে হাঁটলে কিংবা দীঘির পাড়ে তাকালে সারি সারি খেজুরগাছ আমাদের শৈশবের স্মৃতি ও নস্টালজিয়াকে জাগিয়ে তোলে। বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে ওঠা এই গাছটি শীত মৌসুমে বাংলার মানুষকে উপহার দেয় এক অমূল্য সম্পদ—সুমিষ্ট রস। ভোরের মিষ্টি রোদে বসে কাঁচা খেজুরের রস পান করার আনন্দই আলাদা। এর সঙ্গে গরম ভাপা পিঠা কিংবা চিতই পিঠার সঙ্গে পাটালি গুড়ের স্বাদ—এ যেন বাঙালির কাছে অমৃতসুধা। শহুরে যান্ত্রিকতার ভিড়েও এই চিরচেনা স্বাদ ফিরে পাওয়ার আকুলতা প্রবাসী ও শহুরে বাঙালিসহ সবার মনেই এক গভীর নস্টালজিয়া তৈরি করে।

শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, খেজুরের রস ও গুড়ের রয়েছে পুষ্টিগুণ। খেজুরের রসে বিভিন্ন খনিজ উপাদান ও প্রাকৃতিক শর্করা থাকে। তবে কাঁচা রস পান করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি। রস থেকে যখন ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি তৈরি হয়, তখন এর সুবাস ও স্বাদ হয়ে ওঠে অনন্য। খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস, পুলি, চিতই কিংবা পাটিসাপটা পিঠার সুবাসে শীতের সকালগুলো হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর।

কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছ আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা, দ্রুত নগরায়ণ, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং নতুন গাছ রোপণের প্রতি উদাসীনতার কারণে দিন দিন খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একসময় যে গ্রামগুলোতে শত শত গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হতো, আজ সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি গাছ টিকে আছে। ঐতিহ্যবাহী গাছি পেশার মানুষও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিকড় দুর্বল হয়ে যাওয়া।

প্রকৃতির এই অমূল্য দান ও আমাদের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গ্রামীণ রাস্তার পাশে, জমির আইলে কিংবা অব্যবহৃত জমিতে বেশি করে খেজুরের চারা রোপণ করতে হবে। পাশাপাশি, এই প্রাচীন পেশার সঙ্গে যুক্ত গাছিদের সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা দিতে হবে। রস সংগ্রহের জন্য আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

শীতের মিষ্টি রোদ, খেজুরের রস আর গ্রামীণ পিঠাপুলির এই ঐতিহ্য কেবল আমাদের খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়; এটি বাঙালি পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। আসুন, খেজুরগাছ রক্ষা ও এর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমরা সবাই সচেতন হই, যাতে আগামী প্রজন্মও শীতের সকালে এই অমলিন স্বাদ ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে পারে।

লেখক: তারিক ইসলাম
সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

শ্যামা কালী: সৃষ্টি, শক্তি ও অশুভ বিনাশের আদ্যশক্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:২০ অপরাহ্ণ
শ্যামা কালী: সৃষ্টি, শক্তি ও অশুভ বিনাশের আদ্যশক্তি

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি। চারদিকে ঘন অন্ধকার, আর সেই অন্ধকার দূর করতে জ্বলে ওঠে অগণিত প্রদীপ। মন্দিরে মন্দিরে শোনা যায় শ্যামাসংগীত, ধূপের গন্ধে মুখরিত হয় পূজামণ্ডপ। ভক্তদের প্রার্থনা ও আরাধনায় উদ্ভাসিত হন দেবী শ্যামা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা ও দীপাবলি এভাবেই নিয়ে আসে ভক্তি, সাধনা ও আলোর বার্তা।

শ্যামা কালী বা দক্ষিণাকালী শক্তির এক বিশেষ রূপ। হিন্দুধর্মীয় দর্শনে তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির মূল উৎস। তিনি সৃষ্টি, পালন ও সংহারের শক্তির প্রতীক। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী কালীর আরাধনায় জীবনের অশুভ, অন্ধকার, ভয় ও বাধা দূর হয়। তাঁর কাছে মানুষ প্রার্থনা করে সাহস, শক্তি, জ্ঞান ও কল্যাণ।

দেবী কালীর উৎপত্তি নিয়ে পুরাণে নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। দেবীমাহাত্ম্য অনুসারে, অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গার ক্রোধ থেকে তাঁর ললাটে কৃষ্ণবর্ণের এক ভয়ংকর শক্তির আবির্ভাব ঘটে। সেই শক্তিই দেবী কালী। অসুরবিনাশের জন্যই তাঁর আবির্ভাব। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অসুরদের পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দেন।

রক্তবীজ বধের কাহিনি দেবী কালীর অন্যতম পরিচিত পৌরাণিক আখ্যান। রক্তবীজ নামের অসুরের বিশেষ ক্ষমতা ছিল, তার রক্তের এক ফোঁটা মাটিতে পড়লেই সেখান থেকে আরেক অসুরের জন্ম হতো। ফলে তাকে পরাজিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন দেবী কালী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করতে থাকেন। এভাবে তিনি রক্তবীজকে বধ করে দেবতাদের বিপদমুক্ত করেন। এই কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

দেবী কালীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে শ্যামা কালী বিশেষভাবে পূজিত। বাংলার ঘরে ঘরে তিনি মা শ্যামা, আদ্যামা কিংবা মহামায়া হিসেবে পরিচিত। তাঁর গায়ের রং সাধারণত কৃষ্ণ বা নীল বর্ণের। চার হাতে থাকে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড এবং বর ও অভয় মুদ্রা। গলায় মুণ্ডমালা, কোমরে কর্তিত হাতের মালা, উন্মুক্ত কেশ ও প্রসারিত জিহ্বা তাঁর পরিচিত প্রতীকী রূপ। তাঁর পদতলে শায়িত থাকেন দেবাদিদেব মহাদেব।

পুরাণের একটি কাহিনি অনুসারে, অসুরবিনাশের পর দেবী কালী ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রলয়ংকরী নৃত্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিলে দেবতারা তাঁকে থামাতে ব্যর্থ হন। তখন শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে পড়েন। শিবের বুকে পা পড়তেই দেবী নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে বিস্মিত ও লজ্জিত হন। তিনি জিহ্বা বের করে ফেলেন। কালীর এই রূপে শক্তি ও চেতনার এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। শক্তি ও শিব পরস্পরের পরিপূরক—এই ভাবনাও এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

হিন্দুধর্মীয় দর্শনে কালীকে দশমহাবিদ্যার অন্যতম প্রধান দেবী হিসেবে মানা হয়। শাক্ত ও তান্ত্রিক সাধনায় তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। শ্মশানকালী, দক্ষিণাকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, তারা ও চামুণ্ডা—বিভিন্ন নামে ও রূপে তিনি পূজিত হন। তবে বাংলায় শ্যামা কালী বা দক্ষিণাকালীর মাতৃরূপের আরাধনা বিশেষ জনপ্রিয়।

দুর্গাপূজার বিজয়ার পর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই রাতেই উদযাপিত হয় দীপাবলি বা দীপান্বিতা উৎসব। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে মানুষ অন্ধকারের ওপর আলোর, অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের এবং অশুভের ওপর শুভশক্তির বিজয় কামনা করে।

দীপাবলি শুধু আলোকসজ্জার উৎসব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা পৌরাণিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস। রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে রাবণকে পরাজিত করে শ্রীরাম যখন অযোধ্যায় ফিরে আসেন, তখন নগরবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। সেই আনন্দ থেকেই দীপ জ্বালানোর ঐতিহ্যের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

আবার বিষ্ণুপুরাণের কাহিনিতে বামন অবতারের মাধ্যমে অসুররাজ বলিকে পাতালে পাঠানোর কথা রয়েছে। দীপাবলির সঙ্গে এই কাহিনিরও যোগসূত্র রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলি উদযাপনের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আখ্যান প্রচলিত।

বাংলার অনেক পরিবারে দীপাবলির রাতে পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় বাড়ির আঙিনা, মন্দির ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। কোথাও কোথাও বাঁশের মাথায় প্রদীপ বসিয়ে আলো জ্বালানোর ঐতিহ্যও দেখা যায়।

কালীপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। তবে এই শক্তি কেবল অসুরবিনাশের প্রতীক নয়; অন্যায়, অবিচার, হিংসা, লোভ, অহংকার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে মানুষের নৈতিক শক্তিরও প্রতীক। দেবী কালীর মাতৃরূপ মানুষকে সাহস ও আশ্রয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তন্ত্রশাস্ত্রে পঞ্চমকারের যে ব্যাখ্যা রয়েছে, তার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বিশেষভাবে আলোচিত। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুনের আক্ষরিক অর্থের বাইরেও আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়জয়, সাধনা এবং জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের প্রতীকী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোপলব্ধির গুরুত্ব প্রকাশ পায়।

ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করা। অন্ধকার দূর করতে যেমন একটি প্রদীপই যথেষ্ট, তেমনি সমাজের অন্যায় ও অমানবিকতা দূর করতে প্রত্যেক মানুষের বিবেক, সততা ও মানবিকতার আলো প্রয়োজন।

শ্যামাপূজা উপলক্ষে মন্দিরে মন্দিরে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পূজার সূচিতে থাকে দেবীর আবাহন, বাল্যভোগ, পূজা-অর্চনা, ভোগ নিবেদন, প্রসাদ বিতরণ, শ্যামাসংগীত, ভক্তিমূলক গান, ধর্মীয় আলোচনা, চণ্ডীপাঠ ও প্রদীপ প্রজ্বালন। মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী শ্যামা মায়ের মহাপূজা।

এদিন ভক্তরা দেবীর কাছে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং বিশ্বমানবতার শান্তির জন্যও প্রার্থনা করা হয়।

শ্যামা কালী সৃষ্টির আদ্যাশক্তির প্রতীক। তাঁর আরাধনা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো শেষ হয় না। অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, শুভশক্তির জয়ই চিরন্তন প্রত্যাশা। তাই শ্যামাপূজা ও দীপাবলির মূল বাণী হোক—অশুভের বিনাশ, শুভবোধের জাগরণ এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

লেখক: সংবাদকর্মী