পটপটি: আমাদের শৈশব-স্মৃতি/ তারিক ইসলাম
তারিক ইসলাম
ইটের দেয়ালের ফাটলে, রাস্তার ধারে কিংবা পরিত্যক্ত কোনো ঝোপঝাড়ে বেগুনী রঙের ছোট্ট ফুলটি আমাদের প্রায়ই চোখে পড়ে। অযতœ আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদের দিকে হয়তো আমরা অনেকেই ফিরেও তাকাই না। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেই মনের কোণে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া রঙিন শৈশব। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন-কথা হচ্ছে আমাদের চিরচেনা ‘পটপটি’ গাছ নিয়ে। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি Ruellia tuberosa নামে পরিচিত হলেও, আমাদের লোকালয়ে এর পরিচিতি চমৎকার সব নামে। কেউ একে ডাকেন ‘টপাসিন’ নামে, আবার কারও কাছে এটি শুধুই ‘ফাটাফাটি’।
নব্বইয়ের দশক বা তার আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে পটপটি কেবল একটি সাধারণ আগাছা নয়, এটি ছিল শৈশবের এক জাদুকরী খেলনা। বর্ষার দিনে কিংবা বিকেলে খেলার মাঠে পটপটি গাছের শুকনো খয়েরি রঙের বীজ সংগ্রহ করার ধুম পড়ে যেত। সেই শুকনো বীজ মুখে নিয়ে থুতু দিয়ে কিংবা এক বাটি জলে ভিজিয়ে রাখলেই ঘটত সেই কাঙ্ক্ষিত ম্যাজিক! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ‘পট’ করে এক শব্দে ফেটে যেত বীজটি। এই সাধারণ একটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকত এক অদ্ভুত অনাবিল আনন্দ। আজকের দিনে ভিডিও গেম আর স্মার্টফোনের ভিড়ে বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা এই সহজ ও প্রাকৃতিক আনন্দ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত।
কেবল খেলার ছলেই নয়, পটপটি বা টপাসিন উদ্ভিদের রয়েছে নানা ভেষজ গুণাগুণ। লোকজ চিকিৎসায় এর শিকড় ও পাতার রস বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়ে আসছে। অথচ সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সচেতনতার অভাবে এই উদ্ভিদটি আজ আমাদের চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নগরায়ণের আগ্রাসনে ইট-পাথরের শহরে এখন আর আগের মতো পটপটি গাছের দেখা মেলে না।
আমাদের যান্ত্রিক জীবনে প্রকৃতির ছোঁয়া দিন দিন কমে আসছে। পটপটির মতো এই সাধারণ উদ্ভিদগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আনন্দ পেতে সবসময় দামী খেলনার প্রয়োজন হয় না; প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে থাকে সুখের চাবিকাঠি।
শৈশবের নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলা এই পটপটি গাছটি আমাদের জীববৈচিত্র্যেরই একটি অংশ। আগাছা ভেবে একে উপড়ে ফেলার আগে অন্তত একবার ভাবা উচিত, এটি আমাদের কতশত স্মৃতির সাক্ষী। আসুন, প্রকৃতির এই অবহেলিত উপহারগুলোকে চিনে রাখি এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই চেনা ইতিহাসগুলো বাঁচিয়ে রাখি।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।









