প্রসঙ্গ: জনবল-সংকটে আলোর মুখ দেখছে না চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামার
সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষত সাতক্ষীরা জেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই সম্ভাবনাময় খাতের বিশাল এক সম্রাজ্য। সরকারি তথ্যমতে, দেশের মোট উৎপাদিত বাগদা চিংড়ির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই সাতক্ষীরা থেকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং মানসম্মত পোনার অভাবে বর্তমানে এই শিল্প একটি কঠিন সময় পার করছে। এমন এক ক্রান্তিকালে দেশের চিংড়ি শিল্পকে আধুনিক, টেকসই ও বিজ্ঞানসম্মত করতে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবলের অভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই আধুনিক খামারটির সিংহভাগ কার্যক্রম এখন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খামারটিতে আধুনিক হ্যাচারি, পিসিআর ল্যাব ও কোয়ারেন্টাইন ল্যাবসহ রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত ভারী ও আধুনিক সব প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। চিংড়ি চাষের প্রধান শর্ত হলো পোনা ছাড়ার আগে তা রোগমুক্ত কি না এবং খামারের পানির গুণগত মান (তাপমাত্রা, পিএইচ, লবণাক্ততা, দ্রবীভূত অক্সিজেন) ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত করা। সাতক্ষীরার এই পিসিআর ল্যাবটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকলে চাষিরা খুব সহজেই পোনা ও পানির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারতেন। এতে পোনা মারা যাওয়ার হার কমত এবং উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। অথচ দক্ষ জনবলের অভাবে এই কোটি টাকার ল্যাবরেটরি আজ অলস পড়ে আছে। স্থানীয় চাষিদের যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় করে খুলনা কিংবা ঢাকায় ছুটতে হতো, সেখানে হাতের নাগালে সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এর সুফল পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, এই আধুনিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত মূল্যবান কেমিক্যালগুলোর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এই কেমিক্যালগুলোর মেয়াদ ২০২৮ সালে শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আগামী দুই বছরের মধ্যে যদি এখানে প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও অপারেটর নিয়োগ দেওয়া না যায়, তবে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে কেনা এই রাসায়নিকগুলো কোনো কাজেই আসবে না। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় অপচয় আর কী হতে পারে! অন্যদিকে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারের অভাবে এসব সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি চিরতরে অকেজো হয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তীতে সচল করতে আবারও বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে।
এই প্রদর্শনী খামারের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঠপর্যায়ের খামারিদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বলে, চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত করতে প্রদর্শনী খামারের কোনো বিকল্প নেই। অথচ জনবল সংকটের কারণে এখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমাদের উপকূলের হাজার হাজার খামারি সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে বারবার লোকসানের মুখে পড়ছেন, যা সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন মহলে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। আমরা মনে করি, এই আমলাতান্ত্রিক চিঠি চালাচালির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। চিংড়ি শিল্পের বৈশ্বিক বাজার ধরে রাখতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা সচল রাখতে সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এখন সময়ের দাবি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে এই আধুনিক ল্যাব ও খামারটি কার্যকর করবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।



