কৌতুক; হাসির বিজ্ঞান ও নৈতিকতার নির্মল রম্যরস
সাকিবুর রহমান বাবলা
পহেলা জুলাই আন্তর্জাতিক কৌতুক দিবস (International Joke Day। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও ব্যস্ততার এই পৃথিবীতে দিবসটি যেন একটি মৃদু স্মরণিকাÑমানুষের জীবনে হাসিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান আছে। হাসি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়; এটি সামাজিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন, মানসিক প্রশান্তির উৎস এবং বাস্তবতাকে সহজে গ্রহণ করার এক মানবিক কৌশল।
কৌতুকের ইতিহাস মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত কৌতুকের সন্ধান পাওয়া যায় প্রায় চার হাজার বছর পুরোনো সুমেরীয় সভ্যতার একটি প্রবাদে। মজার বিষয় হলো, সেই প্রাচীন কৌতুকটিও ছিল দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে। এতে বোঝা যায়, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যেমন হাসত, আজও তেমনি হাসে; শুধু ভাষা ও প্রেক্ষাপট বদলেছে।
প্রাচীন গ্রিসে কৌতুক ও ব্যঙ্গরস ছিল সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাট্যকার এরিস্টোফেনিসের কমেডি নাটকগুলো জনজীবনের নানা অসঙ্গতিকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরত। পরবর্তীকালে রোমান সভ্যতা, মধ্যযুগের রাজদরবারের ভাঁড় এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁস যুগের রম্যসাহিত্য কৌতুককে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
কৌতুক সংরক্ষণের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত কৌতুকসংকলন ‘ফিলোজেলোস’ (Philogelos), যা খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে গ্রিক ভাষায় সংকলিত হয়েছিল। এতে ২৬৪টি কৌতুক সংরক্ষিত আছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেই সংকলনের অনেক কৌতুকের কাঠামো আজও আধুনিক রসিকতায় দেখা যায়।
মানুষ কেবল কৌতুক সৃষ্টি করেনি, সংরক্ষণও করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাস্যরস ও ব্যঙ্গচর্চা নিয়ে বিশেষ জাদুঘর গড়ে উঠেছে। কানাডার মন্ট্রিয়লে অবস্থিত ‘জাস্ট ফর লাফস’ উৎসব ও সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে বিশ্বের অন্যতম হাস্যরসকেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া বিভিন্ন দেশে কমেডি, কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্র সংরক্ষণের জন্য পৃথক জাদুঘরও রয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, হাসি মানুষের শরীরে ইতিবাচক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। হাসলে শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসৃত হয়, পেশির টান কমে, মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং মনোসামাজিক যোগাযোগ আরও দৃঢ় হয়। এমনকি প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসকেরাও রোগীদের মন ভালো রাখতে নাটক ও কৌতুক উপভোগের পরামর্শ দিতেন। আধুনিক গবেষণাও দেখায় যে হাসি উদ্বেগ কমাতে এবং মানসিক সুস্থতা বাড়াতে সহায়ক।
তবে কৌতুকেরও একটি নৈতিক সীমারেখা রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে হাসি ও কৌতুক নিষিদ্ধ নয়; বরং তা মানবিক ও স্বাভাবিক আচরণের অংশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও সাহাবিদের সঙ্গে কখনও কখনও রসিকতা করতেন, তবে সেই রসিকতায় মিথ্যা, অপমান, বিদ্রুপ বা কঠোরতা থাকত না। ইসলামী ঐতিহ্যে কৌতুককে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় যা মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে, সম্পর্ক মজবুত করে এবং মানসিক চাপ কমায়। তবে কাউকে হেয় করা, মিথ্যা বলা বা ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপহাস করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। হযরত আলী (রা.)-এর মতে, “কথায় কৌতুক ততটুকুই মেশানো উচিত, যতটুকু খাবারে লবণ দেওয়া হয়।”
আসলে কৌতুকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি মানুষের মধ্যে দূরত্ব ও জড়তা কমানো। রাজনৈতিক মতভেদ, সামাজিক বিভাজন কিংবা ব্যক্তিগত সংকট—সবকিছুর মাঝেও একটি নির্মল হাসি মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে। হাসি মানুষের বেঁচে থাকার শক্তিকে জাগিয়ে রাখে।
ডিজিটাল বিপ্লবে কৌতুকের রূপ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাসির তৃষ্ণা রয়েই গেছে। লোককথা আর বৈঠকখানার আসরের সেই রসিকতা এখন মিম ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওতে নতুন প্রাণ পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক কৌতুক দিবস আমাদের সেই চিরন্তন মানবিক সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়তো হাসি নয়, কিন্তু কিছু হাসি সমস্যার ভার কিছুটা হলেও হালকা করতে পারে। তাই কৌতুক হোক নির্মল, মানবিক ও ইতিবাচক; হাসি হোক সুস্থ সমাজ গঠনের এক অনন্য শক্তি।









