মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রাইভেট ও কোচিংয়ের চাপে শিক্ষার্থী: আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৩ অপরাহ্ণ
প্রাইভেট ও কোচিংয়ের চাপে শিক্ষার্থী: আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শিক্ষা মানুষের চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। শিক্ষা মানুষকে শুধু জীবিকা অর্জনের পথ দেখায় না, তাকে বিবেকবান, যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসেÑআমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তুলছি, নাকি কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করছি?প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর গুরুত্ব বেড়েছে।

 

কারণ বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি প্রাইভেট পড়া ও কোচিং এখন অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারের কাছে এটি যেন বাধ্যতামূলক। সন্তানকে ভালো ফল করতে হলে কোচিংয়ে পাঠাতেই হবেÑএমন একটি সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে একটি শিশুর দিন শুরু হচ্ছে পড়াশোনার চাপ দিয়ে, শেষও হচ্ছে পড়ার টেবিলে। একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো শৈশব ও কৈশোর।

 

এই সময় তার মধ্যে তৈরি হয় কৌতূহল, সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও সামাজিক মূল্যবোধ। কিন্তু যখন তার জীবনের বড় অংশ চলে যায় পরীক্ষা, কোচিং, নোট ও নম্বরের পেছনে, তখন তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।শিক্ষা যদি আনন্দের বদলে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি সংকট হলোÑশিক্ষার উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

একসময় শিক্ষা মানে ছিল জ্ঞান অর্জন, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং সমাজকে বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা। এখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া, ভালো জিপিএ অর্জন করা এবং একটি ভালো চাকরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা।একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেই কি সে সৃজনশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক হয়ে উঠছে? সে কি যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারছে? সে কি নতুন সমস্যার সমাধান করতে পারছে? সে কি সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখছে?

 

এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেয়, শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু পরীক্ষার খাতায় সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীকে বারবার বোঝানো হয়Ñতোমাকে প্রথম হতে হবে, তোমাকে বেশি নম্বর পেতে হবে, তোমাকে অন্যদের পেছনে ফেলতে হবে। এই প্রতিযোগিতার মানসিকতা অনেক শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে।প্রাইভেট পড়া বা কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।

 

একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে অতিরিক্ত সহায়তা তার জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বাড়তি অনুশীলন প্রয়োজন হতে পারে।কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোচিং শিক্ষার সহায়ক না হয়ে শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।আজ অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পর আবার কোচিংয়ে যায়। ছুটির দিনেও চলে পরীক্ষা ও প্রস্তুতি।

 

ফলে তাদের বিশ্রাম, খেলাধুলা কিংবা নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় থাকে না।একটি শিশুর কাছে যদি সব সময় মনে হয়Ñআমাকে পড়তেই হবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই হবে, অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবেÑতাহলে তার মানসিক চাপ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।আরেকটি বিষয় হলো, কোচিং সংস্কৃতি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে। যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা সন্তানকে একাধিক কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষক দিতে পারে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

 

ফলে শিক্ষা সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র না হয়ে অনেক সময় অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষার চাপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হওয়া দরকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। কারণ একটি শিশুর মানসিক বিকাশকে উপেক্ষা করে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ভয়, উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগে। বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়, বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা এবং নিজের প্রতি অতিরিক্ত চাপÑএসব তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে তাকে প্রশংসা করা হয়। কিন্তু যে শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল করতে পারে না, তার দিকে অনেক সময় ব্যর্থতার চোখে তাকানো হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। একজন শিশু হয়তো গণিতে খুব ভালো নয়, কিন্তু সে হয়তো অসাধারণ সৃজনশীল, ভালো লেখক, দক্ষ সংগঠক কিংবা মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ হতে পারে।

 

শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা, চাপ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা নয়। অভিভাবকের প্রত্যাশা: ভালোবাসা যখন চাপে পরিণত হয়সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যেক অভিভাবকেরই স্বপ্ন থাকে। বাবা-মা চান, সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, ভালো মানুষ হোক, সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক। এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক এবং ইতিবাচক। কিন্তু অনেক সময় সেই প্রত্যাশাই যখন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, তখন তা সন্তানের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বর্তমান সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলোÑভালো ফল মানেই ভালো ভবিষ্যৎ।

 

এই ধারণার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের পছন্দ, আগ্রহ ও সক্ষমতার চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেন। সন্তান কত ঘণ্টা পড়ছে, কয়টি কোচিং করছে, কত নম্বর পাচ্ছেÑএসব হিসাবই যেন হয়ে ওঠে সফলতার মাপকাঠি।কিন্তু একটি শিশুর মন কোনো যন্ত্র নয়। তাকে নির্দিষ্ট সময় ধরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাপ দিলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবেÑএমন ধারণা ভুল। প্রত্যেক শিশুর শেখার ধরন আলাদা, আগ্রহ আলাদা, প্রতিভা আলাদা। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে শেখে। কেউ বইয়ের মাধ্যমে ভালো শেখে, কেউ বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

 

অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের পাশে থাকা আর সন্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। ভালোবাসার অর্থ শুধু ভালো ফলের প্রত্যাশা নয়; তার ভয়, দুর্বলতা, আগ্রহ ও স্বপ্নকে বোঝাও ভালোবাসার অংশ। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের প্রসার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিদ্যালয়ের ভূমিকার কথাও বলতে হবে। কারণ বিদ্যালয়ই শিক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠান। শ্রেণিকক্ষেই একজন শিক্ষার্থীর শেখার ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা।কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষার্থী মনে করে বিদ্যালয়ের পড়া পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে কোচিং বা প্রাইভেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

 

এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়ায় না, বরং বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে।একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় শেষ করবেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার আগ্রহ তৈরি করবেন। একটি কঠিন বিষয়কে সহজ করে বোঝাবেন, প্রশ্ন করার সাহস দেবেন, চিন্তা করতে শেখাবেন।কিন্তু যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শুধু পাঠদান ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষার মানবিক দিকটি হারিয়ে যায়।শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না।

 

একজন শিক্ষক একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারেন, আবার অসচেতন আচরণে তার আত্মবিশ্বাস নষ্টও করতে পারেন।আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মুখস্থনির্ভরতা। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য অনেক শিক্ষার্থী উত্তর মুখস্থ করে, কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায় না।ফলে পরীক্ষার হলে ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই সমস্যায় পড়ে। প্রকৃত শিক্ষা হলোÑযেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে।

 

একটি বিষয় কেন ঘটছে, কীভাবে কাজ করছে, এর প্রভাব কীÑএসব বিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি ও পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা। কিন্তু অতিরিক্ত কোচিং ও পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি অনেক সময় শিক্ষার্থীদের এই সৃজনশীল ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তারা নতুন কিছু ভাবার পরিবর্তে পরীক্ষায় কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যায়, সেই কৌশলেই বেশি মনোযোগী হয়।

 

একটি শিশুর শৈশব শুধু পড়াশোনার জন্য নয়। তার প্রয়োজন মাঠে খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতিকে দেখা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশ নেওয়া এবং নিজের মতো করে বেড়ে ওঠা।কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক শিশুর জীবন যেন একটি নির্দিষ্ট রুটিনে বন্দীÑবিদ্যালয়, কোচিং, বাড়ির কাজ, পরীক্ষা এবং আবার প্রস্তুতি।এই ব্যস্ততার মধ্যে শিশুরা হয়তো অনেক তথ্য শিখছে, কিন্তু জীবন শেখার সুযোগ কতটা পাচ্ছেÑসেটিই বড় প্রশ্ন। খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক অভিজ্ঞতা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

এগুলো বাদ দিয়ে শুধু বইয়ের জ্ঞান দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের আরেকটি দিক হলো বাণিজ্যিকীকরণ। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু যখন শিক্ষাকে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বা অভিভাবকদের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে কোচিং ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করা হয় যে, নির্দিষ্ট কোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতি শিক্ষাকে প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে পরিণত করে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত সুযোগের সমতা তৈরির মাধ্যম।এই সংকটের সমাধান শুধু কোচিং বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।প্রথমত, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে।

 

শ্রেণিকক্ষকে এমন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সেখানে শেখার আগ্রহ পায়। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কতটা বুঝেছে, কতটা প্রয়োগ করতে পারছেÑসেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।তৃতীয়ত, অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী উৎসাহ দিতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকা-ের সুযোগ বাড়াতে হবে।

 

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। তাই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; বরং চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।প্রাইভেট ও কোচিং প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা যেন শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে। শিক্ষার মূল কেন্দ্র হতে হবে বিদ্যালয়, আর মূল লক্ষ্য হতে হবে জ্ঞান ও মানবিকতার বিকাশ।আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর হাতে শুধু বই নয়, একটি ভবিষ্যৎও তুলে দেওয়া হচ্ছে।

 

সেই ভবিষ্যৎকে যদি আমরা শুধু পরীক্ষার খাতা ও নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে আমরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাব। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়Ñআমরা কি সত্যিই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার যন্ত্র তৈরি করছি?উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাতা। তাদের কাঁধে শুধু বইয়ের বোঝা নয়, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আলোও তুলে দিতে হবে।

লেখক-সংবাদ কর্মী

 

 

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।