সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ফুল কোর্ট রেভারেন্সে অ্যাড. মোতাহারুজ্জামানকে শ্রদ্ধা নিবেদন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০৭ অপরাহ্ণ
ফুল কোর্ট রেভারেন্সে অ্যাড. মোতাহারুজ্জামানকে শ্রদ্ধা নিবেদন

 

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী মরহুম অ্যাড. খন্দকার মোহাম্মদ মোতাহারুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে এক ফুল কোর্ট রেভারেন্স সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (২৬ এপ্রিল) বেলা ১১টায় আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
সভায় জেলা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, “মরহুম খন্দকার মোতাহারুজ্জামান ছিলেন অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান ও পেশাদারিত্বে উজ্জ্বল একজন আইনজীবী। তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিচার অঙ্গন একজন অভিজ্ঞ ও মানবিক আইনজীবীকে হারালো, যা অপূরণীয় ক্ষতি।”
আইনজীবী সমিতির আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাড. নুরুল আমিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সমিতির আহবায়ক বি এম মিজানুর রহমান পিন্টু, সাবেক সভাপতি অ্যাড. আব্দুল মজিদ, পাবলিক প্রসিকিউটর শেখ আব্দুস সাত্তার, অ্যাড মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু, অ্যাড. শহিদুল ইসলাম পিন্টু, অ্যাড. শফিউল ইসলাম শফি এবং অ্যাড. শেখ মিজানুর রহমান।
সভায় মরহুমের জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করে শোনানো হয় এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
উল্লেখ্য, খন্দকার মোহাম্মদ মোতাহারুজ্জামান সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন সততা ও সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সজ্জন, বিনয়ী ও সমাজসেবামূলক কর্মকা-ে সক্রিয় একজন মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে আইন অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষ শোকাহত।
গত ২৫ এপ্রিল সকাল ৮ টা ৫০ মিনিটের সময় তিনি সাতক্ষীরা শহরের নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) । ঐদিন মরহুমের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরের চাঁদপুর গ্রামে দাফন সম্পন্ন করা হয়। মরহুমের মৃত্যুতে জেলা আইনজীবী সমিতিতেও এক শোক সভার আয়োজন করা হয়।

পালকির দোলায় অমলিন প্রেম: শিকড়ে ফেরার এক অনন্য উপাখ্যান
মো. সিরাজুল ইসলাম: আকাশের কোণে রোদের ঝিলিক আর বাতাসে বসন্তের শেষ বিকেলের মাতাল হওয়াÑসব মিলিয়েই দিনটি ছিল যেন কোনো ধ্রুপদী গল্পের ফ্রেম। সাতক্ষীরা শহরের পিচঢালা রাজপথ আজ সাক্ষী হলো এক বিস্মৃত ইতিহাসের প্রত্যাবর্তনের। আধুনিক যান্ত্রিকতার এই যুগে যখন দামী গাড়ির গর্জন আর আলোকসজ্জার চাকচিক্যই বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন এক তরুণ আইনজীবী বেছে নিলেন ইতিহাসের ধূলোবালি মাখা সেই ধ্রুপদী বাহনÑপালকি।
রোববার বিকেলে শহরের সুলতানপুর সদ্দারপাড়া এলাকায় সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। সুসজ্জিত পঙ্খীরাজ পালকিতে চড়ে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন অ্যাডভোকেট শিমুল ইসলাম। আটজন বেহারার কাঁধে তাল মিলিয়ে চলা পালকির সেই ছন্দময় দুলুনি যেন অনেক কাল আগের কোনো গ্রাম্য উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য।
দেবহাটা উপজেলার পূর্বকুলিয়া বাঁধের মুখ এলাকার লামিয়া আরেফিন শোভার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হতে যাওয়ার এই যাত্রায় ছিল না কোনো গাড়ির হর্ন, বরং ছিল শেকড়ের টান। বিয়ে শেষে একইভাবে পালকির ওড়না টেনে নববধূকে নিয়ে যখন শিমুল নিজের আঙিনায় ফেরেন, তখন চারপাশের বাতাসে যেন ফিরে এসেছিল হারিয়ে যাওয়া সেই ম ম গন্ধ।
রাস্তার দু’পাশে ভিড় জমিয়েছিলেন উৎসুক জনতা। ছোটদের চোখে কৌতূহল আর প্রবীণদের চোখে ছিল ফেলে আসা যৌবনের দীর্ঘশ্বাস। কেউ সেলফি তুলছিলেন, কেউ বা ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন বেহারাদের সেই মাপা কদম।
উল্লসিত এলাকাবাসী বলেনÑ“পালকি তো কেবল কাঠের একটা কাঠামো নয়; এ তো আমাদের সংস্কৃতির স্পন্দন। আজ এই দৃশ্য দেখে মনে হলো আমরা আবারও আমাদের সত্তাকে খুঁজে পেলাম।”
সময়ের বিবর্তনে পালকি আজ কেবল যাদুঘরের জড় বস্তু। কিন্তু অ্যাডভোকেট শিমুল ইসলামের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে এক নীরব বার্তা পৌঁছে দিয়েছেÑসভ্যতা এগিয়ে চললেও শিকড়কে ভুলে যাওয়া মানেই শূন্যতা। স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের শৌখিন ও ঐতিহ্যবাহী উদ্যোগ আমাদের হাজার বছরের কৃষ্টিকে নতুন করে জীবন দান করবে।
সাতক্ষীরার এই বিয়ে কেবল দুটি হৃদয়ের মিলন হয়ে থাকল না, এটি হয়ে উঠল হারিয়ে যাওয়া বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক পপ-আপ আর্ট, যা আগামী অনেক দিন এলাকাবাসীর মনে এক টুকরো অমলিন স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে।

 

 

 

 

 

 

Ads small one

বাবা, আমি বাসায় যাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ণ
বাবা, আমি বাসায় যাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

‘বাবা, আমি বাসায় যাব।’ সাত বছরের শিশু অনুশ্রী দাসের এই শেষ কথাটি এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ডেঙ্গু মোকাবিলা এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবার বাস্তবতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেয়। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা একটি শিশু যখন বাবাকে দেখে বাড়ি ফেরার কথা বলে, তখন সেই কথার মধ্যে থাকে শিশুর নিরাপত্তার আকাক্সক্ষা, পরিবারের প্রতি নির্ভরতা এবং অসুস্থতার গভীর অসহায়তা।

 

চট্টগ্রামের পহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী ছিল সুবল চন্দ্র দাস ও লিপি দম্পতির দুই সন্তানের ছোট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শুরুতে পরিস্থিতি খুব খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সে দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়। এরপর দ্রুত অবনতি। প্লাটিলেট নেমে আসে ২৩ হাজার ৫০০-তে। আক্রান্ত হয় লিভার ও কিডনি। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয় তাকে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার বিকেলে চলে যায় সাত বছরের শিশুটি।

 

অনুশ্রীর মৃত্যু আমাদের আবার মনে করিয়ে দিলÑডেঙ্গু শুধু একটি মৌসুমি জ্বর নয়। এটি এমন একটি রোগ, যা শিশুদের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। তাই জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি ‘সাধারণ জ্বর’ ভেবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশুর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পেটের সমস্যা, বমি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

অনুশ্রীর পরিবারের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল আইসিইউ বেড খোঁজা। মেয়ের অবস্থা খারাপ হওয়ার পর বাবা চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেছেন। একাধিক হাসপাতালে খোঁজ করেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শিশু আইসিইউ বেড পাননি বলে জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অনুশ্রীকে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। একটি শিশুর অবস্থা যখন দ্রুত অবনতির দিকে যায়, তখন চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় সময়ের। আর সেই সময় যদি পরিবারের সদস্যদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে আইসিইউ বেড খুঁজতে ছুটতে হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে।

 

চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু হাসপাতাল থাকা যথেষ্ট নয়; সংকটাপন্ন রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় বেড, প্রশিক্ষিত জনবল, শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হয়। অনুশ্রীর গল্পের আরেকটি দিক আমাদের ভাবায়। মেয়ের অসুস্থতার সময় বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার কাছে প্রার্থনা চেয়েছেন। মুসলিম বন্ধুদের মসজিদে গিয়ে দোয়া করার অনুরোধ করেছেন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে চেয়েছেন দোয়া ও আশীর্বাদ।

 

একটি শিশুকে বাঁচানোর আকুতিতে তখন ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো দেয়াল ছিল না। ছিল শুধু একজন বাবার অসহায় আবেদনÑআমার সন্তানকে বাঁচতে দিন।এই মানবিক দৃশ্যটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি শিক্ষা। রোগের সামনে মানুষ আগে মানুষ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুর কোনো ধর্মীয় পরিচয় চিকিৎসার প্রয়োজনকে আলাদা করে না। ডেঙ্গুর মশাও ধর্ম দেখে কামড়ায় না। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বও কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা সম্প্রদায়ের নয়; এটি সবার। অনুশ্রীর সপ্তম জন্মদিনও খুব বেশি দূরের ঘটনা নয়। গত ২ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন পালন করেছিল সে। বাবা তাকে বলেছিলেন নিজের ‘বেঁচে থাকার প্রেরণা’।

 

মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সন্তানকে নিজের হাতে শেষ বিদায়ের জন্য সাজাতে হয়েছে বাবাকে। জীবনের এই নির্মম পরিণতি কোনো পরিবারের জন্যই কাম্য নয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাই শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না। রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা বন্ধ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। জ্বর কমে গেলেই যে বিপদ কেটে গেছেÑএমন ধারণা ভুল হতে পারে।

 

ডেঙ্গুর রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দ্রুত নজরে রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করা এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। তবে সব দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি শিশুর বাবা যদি সংকটময় সময়ে একাধিক হাসপাতালে ফোন করে আইসিইউ বেড খুঁজতে বাধ্য হন, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার প্রাপ্যতা, হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি বেডের তথ্য দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকরÑএগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।

 

অনুশ্রীর মৃত্যু হয়তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তার বাবা-মায়ের শূন্যতা কোনো শব্দে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যু যদি আমাদের ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, তাহলে সেই শোক থেকে অন্তত ভবিষ্যতের জন্য কিছু শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñএই চারটি শব্দ যেন শুধু অনুশ্রীর শেষ কথা হয়ে না থাকে। এটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাসপাতালের বিছানায় প্রতিটি শিশু কারও সন্তান, কারও স্বপ্ন, কারও বেঁচে থাকার প্রেরণা।

 

একটি শিশুকে বাঁচাতে শুধু চিকিৎসকের হাত নয়, দরকার প্রস্তুত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত আইসিইউ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। অনুশ্রীর বাবা মেয়েকে বাঁচাতে পারেননিÑএ কথা একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, অনুশ্রীর মতো আর কোনো শিশুকে যেন একইভাবে হারাতে না হয়, সে জন্য আমরা কী করছি? শোকের পর সবচেয়ে জরুরি কাজ তাই কান্না থামানো নয়; ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করা। কারণ একটি শিশুর শেষ আকুতি যদি আমাদের বিবেককে নাড়া না দেয়, তাহলে আর কী আমাদের নাড়া দেবে? ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñঅনুশ্রীর এই কথাই হোক ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের নতুন করে ভাবার ডাক।

লেখক: সচ্চিদানন্দ দে সদয়

 

সুন্দরবন: ম্যানগ্রোভের আড়ালে ইতিহাস ও পুরাকীর্তির বিস্ময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪৬ অপরাহ্ণ
সুন্দরবন: ম্যানগ্রোভের আড়ালে ইতিহাস ও পুরাকীর্তির বিস্ময়

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে চিনি। কিন্তু সুন্দরবন শুধু গাছপালা, নদী-খাল আর বাঘ-হরিণের সমষ্টি নয়। এর মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মানুষের বসতির ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ, মৃৎপাত্র, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি। ফলে সুন্দরবনকে যতই জানা যায়, ততই মনে হয়-এটি একই সঙ্গে প্রকৃতির সৃষ্টি, মানুষের ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার এক বিশাল জীবন্ত আর্কাইভ।

সুন্দরবনের সৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের একটি ঘটনা নয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী বহন করে আনা বিপুল পলি যুগের পর যুগ বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জমা হয়েছে। নদীর স্্েরাত, জোয়ার-ভাটা, বন্যা, পলি সঞ্চয় ও ভূমিক্ষয়ের অবিরাম প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে বদ্বীপের নতুন নতুন চর ও দ্বীপ। পরে লবণাক্ত পরিবেশে অভিযোজিত উদ্ভিদ সেখানে বিস্তার লাভ করে এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ম্যানগ্রোভ বন। ইউনেসকো সুন্দরবনকে বদ্বীপ গঠন, জোয়ারের প্রভাব এবং নতুন সৃষ্ট ভূমিতে উদ্ভিদের বিস্তারের চলমান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩৮ বর্গকিলোমিটার বনভূমি এবং প্রায় ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার নদী, খাল ও অন্যান্য জলাভূমি। পুরোনো বন-তথ্যেও ৬০১৬.৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হিসাব পাওয়া যায়।
ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বৃহত্তর সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে এবং অবশিষ্ট অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য নথিতে বাংলাদেশের সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যসহ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতির বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথিতে সংখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও বন বিভাগের ইকোট্যুরিজম তথ্য অনুযায়ী এখানে ৪০৩ প্রজাতির পাখি, ১২০ প্রজাতির মাছ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর রয়েছে। অন্যদিকে ইউনেসকোর নথিতে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৪৩ প্রজাতির মলাস্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাখির প্রজাতির হিসাবও বিভিন্ন জরিপে ২৬০ থেকে ৩১৫-এর মধ্যে পাওয়া যায়। অর্থাৎ জরিপের সময়, এলাকা ও শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় কিছু তারতম্য স্বাভাবিক।

এই জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে প্রতীকী প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র বৃহৎ ম্যানগ্রোভ আবাসভূমি যেখানে বাঘের স্বাভাবিক জনসংখ্যা টিকে আছে। বাঘের পাশাপাশি চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, উদবিড়াল, লবণপানির কুমির, গোসাপ, অজগর, কিং কোবরা, গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিনসহ অসংখ্য স্থলজ ও জলজ প্রাণী এখানে বাস করে। ইউনেসকো সুন্দরবনের জলজ, স্থলজ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে এর অসামান্য বৈশ্বিক মূল্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে সুন্দরবনের প্রকৃত প্রাণ হলো তার নদী ও খাল। প্রায় ৪৫০টি বড়-ছোট নদী, খাল ও জলপ্রবাহ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এসব জলপথের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটারের হিসাব পাওয়া যায়। বন বিভাগের গবেষণা নথিতেও প্রায় ৪৫০টি নদী ও খালের কথা বলা হয়েছে।

সুন্দরবনের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, মালঞ্চ, কপোতাক্ষ, অরপাঙ্গাশিয়া, ভোলা, কুঙ্গা, ভদ্রা, সুতারখালী, শেলা, কালিন্দী, কোলপেটুয়া ও আড়পাঙ্গাশিয়া। পশ্চিমে রায়মঙ্গল-হাড়িয়াভাঙ্গা-কালিন্দী নদীপ্রণালী এবং পূর্বদিকে বলেশ্বর সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ সীমানা তৈরি করেছে; দক্ষিণে উন্মুক্ত বঙ্গোপসাগর।

এর মধ্যে পশুর নদী সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান জলপথ। নদীটি উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরের বহু খাল ও জলপ্রবাহকে সংযুক্ত করেছে। শিবসা ও বলেশ্বরও শুধু নদী নয়—সুন্দরবনের পরিবেশ, পলি পরিবহন, মাছের প্রজনন, নৌযাতায়াত এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত জলপথ।

সুন্দরবনের নদীগুলোকে অনেকটা মানুষের শরীরের ধমনির সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদীতে জোয়ার আসে, ভাটা যায়; মিঠা ও লোনা পানির মিশ্রু ঘটে; পলি আসে, আবার গ্রোতে কোথাও পলি সরে যায়। এই জলপ্রবাহই সুন্দরবনের চরিত্রকে প্রতিনিয়ত বদলে দেয়। কোথাও ভূমি তৈরি হয়, কোথাও নদী গিলে নেয় পুরোনো ভূখণ্ড। ফলে সুন্দরবন কোনো স্থির বন নয়—এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল একটি জীবন্ত ভূপ্রকৃতি।

আর এই পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের আরেক বিস্ময়।
একসময় মনে করা হতো সুন্দরবন বুঝি চিরকালই জনমানবহীন গভীর বন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সুন্দরবনের পাঁচটি স্থানে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের বসতির চিহ্ন পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মৃৎপাত্র, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং স্থাপনার চিহ্নও পাওয়া গেছে।

এই অনুসন্ধানের সঙ্গে গবেষক ইসমে আজমের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি প্রায় সাত বছর ধরে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় বাঘের গণনা ও সংরক্ষণ-সংক্রান্ত কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়ানোর সময় এসব ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পান। পরে মাটি ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে বনভূমির নিচে চাপা থাকা স্থাপনার অংশগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রতœতত্ত্ববিদদের অনুসন্ধানেও এসব স্থাপনার বয়স আনুমানিক এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ বছরের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। ইটের আকৃতি ও নির্মাণশৈলী দেখে এগুলো পাল আমলের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

এই আবিষ্কার সুন্দরবনের ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ প্রশ্ন উঠছে-যেখানে আজ বাঘের চলাচল, জোয়ার-ভাটা আর ঘন ম্যানগ্রোভ, সেখানে এক হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে বসবাস করত?

সম্ভবত তখন ভূপ্রকৃতি আজকের মতো ছিল না। নদীর গতিপথ ছিল ভিন্ন, কোথাও ভূমি ছিল উঁচু, কোথাও ছিল নদীবন্দর বা বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথ ধরে মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যের সুযোগ ছিল। মাটি ও পানির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো জনপদ পরিত্যক্ত হয়েছে, আবার প্রকৃতি ধীরে ধীরে সেই পরিত্যক্ত ভূমিকে গ্রাস করেছে।

সুন্দরবনের শেখেরটেক এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউনেসকোর নথিতে সুন্দরবনের গভীরে ১৮ শতকের একটি মন্দিরের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাটির নিচে স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ থাকার প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ আজকের সুন্দরবনের গাছের শিকড়ের নিচে কোথাও হয়তো রয়েছে মানুষের পায়ের চিহ্ন, কোথাও ইটের দেয়াল, কোথাও ভাঙা মৃৎপাত্র, কোথাও কোনো প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার স্মৃতি। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে মানুষের তৈরি জগতকে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু সময়ের কোনো এক মুহূর্তে নদীর ভাঙন কিংবা মাটির ক্ষয়ে সেই ইতিহাস আবার চোখের সামনে উঠে এসেছে।

সাতক্ষীরার ঈশ্বরীপুর-ধূমঘাট-বংশীপুর অঞ্চলও সুন্দরবনসংলগ্ন ইতিহাস ও পুরাকীর্তির দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানা, টেংগা শাহি মসজিদ, বংশীপুর গড় এবং বুরুজপোতার মতো প্রতœস্থানের সঙ্গে এ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় বসতির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ইউনেসকোর বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতœতাত্ত্বিক স্থানের তালিকায় বংশীপুর-ঈশ্বরীপুর-ধূমঘাটকে ১৫ থেকে ১৮ শতকের মধ্যযুগীয় বসতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথায় এসব স্থানের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের নামও জড়িয়ে আছে। তবে লোককথা আর প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, শিলালিপি, স্থাপত্যের ধরন, মুদ্রা, মৃৎপাত্র এবং অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণের সমন্বিত বিশ্লেষণ।

সুন্দরবনের ইতিহাসের সঙ্গে বাগেরহাটের সম্পর্কও গভীর। খান জাহান আলীর নেতৃত্বে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বন ও জলাভূমি পরিষ্কার করে জনবসতি, কৃষি ও নগরজীবনের বিস্তার ঘটেছিল। আজকের বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী সেই মধ্যযুগীয় সম্প্রসারণের এক অনন্য স্মারক। ১৯৮৫ সালে বাগেরহাট ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

সুন্দরবনের ইতিহাস আবার শুধু প্রতœতাত্ত্বিক ইট-পাথরের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বনবিবি, দক্ষিণ রায়, গাজী পীর, মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে ও বনজীবী মানুষের লোকবিশ্বাস। শত শত বছর ধরে যারা মধু সংগ্রহ করতে, মাছ ধরতে কিংবা গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ করতে বনে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের জীবনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি।

বাঘের ভয়, কুমিরের ভয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, অচেনা নদী ও গভীর বনের বিপদের মধ্যে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিশ্বাসে। বনবিবির কাহিনি থেকে শুরু করে নানা দোয়া, মন্ত্র ও লোকাচার—সবই সুন্দরবনের জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় লোকসংস্কৃতি বহু ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।

কিন্তু এই অসাধারণ বন আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অবৈধ শিকার, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এবং দূষণ সুন্দরবনের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। প্রায় ৪৫০টি নদী-খালের এই জটিল জলজালিকা শুধু সুন্দরবনের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি বনটির পরিবেশগত ভারসাম্যের অন্যতম ভিত্তি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বন বিভাগের সূত্রে নদী-খালগুলোর অনেকগুলোতে পলি জমে জলধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

সুন্দরবন রক্ষার অর্থ তাই শুধু বাঘ রক্ষা নয়। এর নদী রক্ষা করতে হবে, খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে, পলি ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক গতিশীলতা বুঝতে হবে, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে এবং একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রতœসম্পদও সংরক্ষণ করতে হবে।

কারণ সুন্দরবনের একটি নদী শুকিয়ে গেলে শুধু একটি জলপথ হারায় না; তার সঙ্গে বদলে যায় মাছের আবাস, কাঁকড়ার প্রজননক্ষেত্র, পাখির খাদ্যচক্র এবং বনজীবীদের জীবন। আবার একটি প্রাচীন প্রতœস্থল হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় আমাদের ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায়।

সুন্দরবনের মাটির নিচে তাই শুধু অতীত নেই-আছে আমাদের অজানা ইতিহাসের সম্ভাবনা। আজ যে ভূমিতে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতা জন্মেছে, সেই ভূমির কোনো কোনো অংশে একদিন মানুষের ঘর ছিল, বাজার ছিল, হয়তো বন্দর ছিল, ধর্মীয় স্থাপনা ছিল, ছিল নদীকেন্দ্রিক জীবন ও বাণিজ্য।

এই কারণেই সুন্দরবনকে কেবল একটি বন হিসেবে দেখা তার প্রতি অবিচার। এটি একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, অন্যদিকে নদী ও পলিতে গড়ে ওঠা এক পরিবর্তনশীল ভূগোল; আবার একই সঙ্গে এটি প্রাচীন জনপদ, লোকবিশ্বাস ও হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার এক বিশাল ভান্ডার।

সুন্দরবনের প্রতিটি নদী যেন ইতিহাসের একটি রেখা, প্রতিটি খাল যেন কোনো বিস্মৃত জনপদের পথ, প্রতিটি পুরোনো ইট যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষের একটি বাক্য। ম্যানগ্রোভের শিকড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই বাক্যগুলো আমাদের পড়তে হবে-বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে, প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ নিয়ে।

সুন্দরবনকে বাঁচানো মানে শুধু একটি বনকে বাঁচানো নয়; এর সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে হবে একটি বদ্বীপের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, অসংখ্য প্রাণীর আবাস, নদী-খালের জটিল জীবনব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার স্মৃতিও।

সুন্দরবন যত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, তার চেয়েও বড় কথা-সেই রহস্যের অনেকটাই এখনো আমরা জানিই না।

লেখক: কবি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী।

অত্যাধুনিক সুবিধাসহ মডেল পাইকগাছা গড়ে তুলব: মনিরুল হাসান বাপ্পী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:২১ অপরাহ্ণ
অত্যাধুনিক সুবিধাসহ মডেল পাইকগাছা গড়ে তুলব: মনিরুল হাসান বাপ্পী

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: বিএনপি মা, মাটি ও মানুষের দল। মানবতার সেবা ও মানুষের কল্যাণে এই দল কাজ করে যাচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই আমি আমার নির্বাচনি এলাকায় ছুটে এসেছি ও এই ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজনের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা সেবা জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সাতক্ষীরার গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ দিনব্যাপী প্রায় ২ হাজার রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ৫ শত রোগীকে ছানী অপারেশনের জন্য বাছাই করা হবে। বাকী রোগীদের ব্যবস্থাপত্র, প্রয়োজনীয় ঔষধ ও চশমা বিতরণ করা হবে।

 

চোখ মানব দেহের একটি গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলোর মধ্যে অন্যতম। অত্র এলাকার সুবিধা-বঞ্চিত প্রতিটি মানুষের চোখের সুচিকিৎসায় লক্ষ্যে এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি মানুষই যেন চোখের যথাযথ চিকিৎসা সেবা পায় সে লক্ষ্যে আমি শুধুই নয় দলের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাবো এটাই আমার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলেন,খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব, জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী।

তিনি আরও বলেন, মিথ্যা বুলি নয়, নির্বাচনের আগের সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে হাসপাতাল উন্নয়নে থোক বরাদ্দ এনেছি, কলেজ সরকারিকরন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কল্পে বিশেষ বরাদ্দ এনেছি। আত্মসামাজিক উন্নয়নে মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা সহ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলোর উন্নয়নে বরাদ্দ দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, জামায়াত সর্বক্ষেত্রে জনসাধারণের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে যাচ্ছে। ওরা ইসলামের কথা বলে বিধর্মীর মত আচরণ করছেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছিল, কিন্তু সেই অর্থ জামায়াত নিজের আত্মীয়-স্বজন শুধু নয় নিজের পিএস, এপিএস কেও দিয়েছে, আর বঞ্চিত করেছে আমার সাধারণ মানুষ গুলো কে। আমরা কথা দিয়ে যাচ্ছি জামায়াত কে এই অঞ্চলে ভন্ডামি করতে দেয়া হবে না। আপনাদের সাথে নিয়ে জামায়াতের সকল অপকর্ম রুখে দিবো।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ফ্রী চোখের ছানি অপারেশন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা ক্যাম্প পাইকগাছা সোলাদানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সোলাদানা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান এস এম এনামুল হকের সভাপতিত্বে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে বিশেষ অতিথি পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ডাক্তার মোঃ আব্দুল মজিদ, খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক, জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান কে এম আশরাফুল আলম নান্নু, পৌরসভা বিএনপির সভাপতি আসলাম পারভেজ, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব এস এম ইমদাদুল হক, পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামাল আহমেদ সেলিম নেওয়াজ, ৫নং সোলাদানা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পীযুষ কান্তি মন্ডল, পাইকগাছা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুস সত্তার। উপস্থিত ছিলেন, সেলিম রেজা লাকি, মোস্তফা মোড়ল, তুষার কান্তি রায়, আবুল হোসেন, মেছের আলী, আবুল মজিদ গোলদার, সুজিত মন্ডল, সন্তোষ কুমার সরকার, সাত্তার মোড়ল, মফিজুল ইসলাম টাকু, সন্তোষ দাস, আসাদুজ্জামান ময়না, মোল্লা আইয়ুব হোসেন, জিএম রাসেল ইসলাম, মমিনুর রহমান সাগর, ইয়ারুল ইসলাম রিপন, ইব্রাহিম গাজী, ইমরান সরদার, কাজী সাজ্জাদ আহমেদ, কলিংরাজ মন্ডল, কার্তিক চন্দ্র রায়, ফয়সাল সানি প্রমুখ। সাতক্ষীরার গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতাল ও মোঃ আরাফাত হোসেন সহায়তায় চক্ষু ক্যাম্পে আগত রোগীদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত রোগীদের বিদেশি লেন্স দিয়ে ছানি অপারেশন এবং ১ মাসের ঔষধ, চশমা, সম্পূর্ণ ফ্রি যাওয়া-আসা ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প পরবর্তী সোলাদানা ইউনিয়নের সকল প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের আলাদা আলাদা মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থেকে প্রতিষ্ঠানের সুবিধা-অসুবিধার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি পর্যায়ক্রমে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে অত্যাধুনিক সুবিধা সহ ভবন তৈরির আশ্বাস দেন। তিনি উল্লেখ করেন ইতিমধ্যে পাইকগাছার স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। অচিরেই আপনাদের সকল সকল দাবী-দাওয়া পূরণ করতে পারবো বলে আশা ব্যক্ত করেন।