বর্ষার পানিতে ভাসে দুর্ভোগ, মুক্তি মিলবে কবে ?
এম.এম হায়দার আলী
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদে একই চিত্র দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাস্তা-ঘাট, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
গত দুই দিনের প্রায় ১০ ঘণ্টা ভারী বর্ষন-ই তার বাস্তব প্রমাণ। ছয় ঋতুর এদেশে বর্ষা মৌসুমে বর্ষা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিতভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর, সড়ক-মহাসড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাল, জলাধার, নালা ও পানি চলাচলের পথ ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। আবার নতুন সড়ক নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ না করায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে না। বহু পুরোনো কালভার্ট ভেঙে গেলেও বছরের পর বছর সংস্কার হয় না।
ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক, সবজি চাষি ও মৎস্য চাষীরা। মাঠের সবজি কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেই নষ্ট হয়ে যায়। মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হয়ে মাছ ভেসে যায় অথবা মারা যায়। এতে কৃষক ও মৎস্য চাষীদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে হিমশিম খায়। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সবজি, মাছসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারদরে। সবজি ও মাছের দাম বেড়ে যায়, ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অর্থাৎ জলাবদ্ধতার ক্ষতি শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব পুরো বাজার ব্যবস্থা ও সাধারণ ভোক্তার জীবনেও পড়ে।
জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কর্মজীবীরা সময় মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। রাস্তা-ঘাট দ্রুত নষ্ট হয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা পানিতে মিশে যায়। যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং জলাবদ্ধ পানিতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। শুধু কি তাই, প্রত্যেক বছর বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পরিবার তাদের বসতভিটা ফেলে বিবাহ যোগ্য মেয়েকে নিয়ে থাকতে হয় বিভিন্ন সাইক্লোন সেন্টার, স্কুল কলেজে ও উচু কোন সড়ক মহাসড়কের উপর খোলা আকাশের নিচে। তবে সমাধানের পথ হিসেবে,জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প মেয়াদি নয়, দীর্ঘ মেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এজন্য, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও পানি প্রবাহের পথ দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করতে হবে।সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নষ্ট ও অকার্যকর কালভার্ট দ্রুত সংস্কার বা পুনর্র্নিমাণ করতে হবে। ড্রেন ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পানি চলাচলের পথ দখল ও অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
নতুন ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে পরিবেশ সম্মত ড্রেনেজ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষতি গ্রস্থদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে ঋণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ, কৃষকের লোকসান এবং বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সবই উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য তখনই সফল হবে, যখন সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং টেকসই করবে। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






