জনসংখ্যাকে নতুন চোখে দেখার সময় এসেছে
আখলাকুর রহমান
সাতক্ষীরার একটি শিশু জন্মায় ঠিক ততটাই সম্ভাবনা নিয়ে, যতটা নিয়ে জন্মায় ঢাকা কিংবা টোকিওর কোনো শিশু। তফাৎ শুধু সুযোগে।
আজ ১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রতি বছর এই দিনে আমরা একটি সংখ্যার দিকে তাকাই, পৃথিবীতে মানুষ কত বাড়ল, বাংলাদেশে কত বাড়ল, সাতক্ষীরায় কত বাড়ল। খবরের কাগজে ছাপা হয় গ্রাফ আর পরিসংখ্যান, সেমিনারে পঠিত হয় প্রবন্ধ, তারপর দিনটি চলে যায় আরেকটি সাধারণ দিনের মতো। কিন্তু সত্যি বলতে, জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো আমরা সেই জনসংখ্যাকে কতটা সম্পদে রূপান্তর করতে পারছি, তার হিসাব না রাখা।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি ভয় গেঁথে আছে যে মানুষ বাড়লেই নাকি সংকট বাড়ে। খাদ্য কমে যাবে, জমি কমে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে শ্বাস নেওয়াই দায় হয়ে যাবে। এই ধারণা এসেছে এক শতাব্দী আগের চিন্তা থেকে, যখন প্রযুক্তি বা উৎপাদনশীলতার আজকের অগ্রগতি কারো কল্পনাতেও ছিল না। অথচ বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর যে দেশগুলো আজ সবচেয়ে সমৃদ্ধ, তাদের অনেকেই একসময় ঘন জনবসতিপূর্ণ ছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ প্রমাণ করেছে, ঘনবসতি কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেটাই হয়ে ওঠে অগ্রগতির চালিকাশক্তি। তাই বলা যায়, জনসংখ্যা সমস্যা নয়, বরং অব্যবস্থাপনা আর সুযোগের অভাবই আসল সংকট।
সাতক্ষীরার দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। উপকূলীয় এই জেলা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর একটি। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ের পুনরাবৃত্তি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার নিত্যসঙ্গী। এমন এক পরিবেশে প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ তরুণী কর্মক্ষম বয়সে পা রাখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের জন্য দক্ষতা তৈরির সুযোগ, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি? নাকি শুধু সংখ্যা গোনায় ব্যস্ত থেকে প্রকৃত সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলছি? একজন তরুণ যদি সঠিক প্রশিক্ষণ না পায়, তাহলে সেই একই তরুণ যে দেশের সম্পদ হতে পারত, সে হয়ে ওঠে বেকারত্বের পরিসংখ্যানের আরেকটি সংখ্যা মাত্র।
জনসংখ্যা দিবসের প্রকৃত বার্তা আসলে দুটি জায়গায়। একটি হলো নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, অন্যটি পরিবার পরিকল্পনায় সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। এটি কোনো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না; বরং প্রতিটি মানুষকে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে। সাতক্ষীরার মতো জেলায়, যেখানে বাল্যবিবাহের হার এখনো উদ্বেগজনক, সেখানে এই বার্তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেয়ে যখন আঠারো বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়, তখন তার শিক্ষা থমকে যায়, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একই দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়। একজন কিশোরী মেয়ে যখন শিক্ষা শেষ করে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়, তখনই প্রকৃত অর্থে জনসংখ্যা ‘নিয়ন্ত্রণ’ হয়, জোর করে নয়, সচেতনতা দিয়ে।
আমাদের চিন্তার ধরন বদলাতে হবে। জনসংখ্যাকে বোঝা না ভেবে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। একটি তরুণ জনগোষ্ঠী সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে। সাতক্ষীরার মৎস্য চাষ, কৃষি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় যদি আধুনিক প্রযুক্তি আর দক্ষতা যুক্ত করা যায়, তাহলে এই জনসংখ্যাই হয়ে উঠতে পারে জেলার সবচেয়ে বড় শক্তি। চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত হাজারো পরিবার, ছোট ছোট কুটির শিল্প, হস্তশিল্প কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স কাজ, সবকিছুতেই দরকার একটু সঠিক দিকনির্দেশনা আর বিনিয়োগ। তরুণদের হাতে দক্ষতা থাকলে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো পরিবার আর সমাজের ভাগ্যও বদলে দিতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই দিনটিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, আর বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা, এসবই এখন সময়ের দাবি। শুধু সরকারি উদ্যোগেই এই কাজ সম্ভব নয়, স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সচেতনতা তৈরি হয় প্রতিদিনের কথোপকথনে, একটি বক্তৃতায় নয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাতক্ষীরার মতো জেলার স্থানীয় পত্রিকাগুলো যদি প্রতিনিয়ত এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখালেখি করে, গল্প বলে, বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে, তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে ধীরে হলেও স্থায়ীভাবে। একটি সফল উদ্যোক্তার গল্প, একটি মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার গল্প, এসব গল্পই পারে মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এখানেই দাঁড়ায়, আমরা কি জনসংখ্যাকে ভয় পাব, নাকি তাকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের পথ খুঁজব? সাতক্ষীরার প্রতিটি নবজাতক একটি নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে, একটি নতুন গল্পের শুরু নিয়ে আসে। আমাদের দায়িত্ব সেই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, সংখ্যা কমানো নয়, সক্ষমতা বাড়ানো। এই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আসুন, আমরা ভয়ের চশমা খুলে সম্ভাবনার চশমা পরি, আর প্রতিজ্ঞা করি, প্রতিটি মানুষকে শুধু সংখ্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখব।
লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা






