বাংলাদেশ ২০২৬: উন্নয়নের পথে এক নবযাত্রার সম্ভাবনা-তিন
পরিবর্তন-পর্ব ৩৮
আশরাফ রহিম
পরিবর্তন-পর্ব ৩৭ (জানুয়ারী ৩, ২০২৬)-এ লিখেছিলাম “পরিবর্তন শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই-চিন্তা, চেতনা ও আচরণে।” আর এর জন্য চাই আলোকিত মানুষ।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর বই “বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি”-তে লিখেছেন-
“মানুষ অপরিসীম ক্ষমতাশালী। যাত্রা শুরুর সামান্য পাথেয় পেলে সে বিশ্ব জয় করতে পারে।”
বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১-এ তার প্রমাণ রেখেছে। তবুও আমরা কীভাবে যেন বারবার পথ হারিয়েছি। আমাদের সঠিক পথে ফিরে আসতেই হবে-এর কোনো বিকল্প নেই।
এখন সময় নিজেকে প্রশ্ন করার-
⦁ আর কতবার রক্ত দিলে আমরা সঠিক পথে চলতে শুরু করবো?
⦁ আর কতবার অসৎ রাজনীতি বা বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের অর্থনীতিকে সংকটে ফেলবে-আর আমরা হাহাকার করবো?
⦁ অসহায় হয়ে অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় হাত বাড়িয়ে থাকবো?
এই সঠিক পথে এগোতে আমাদের প্রয়োজন অগণিত “আলোকিত মানুষ”-যাদের সততা, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও ত্যাগ অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের দরকার আত্মবিশ্বাসী, উদ্যমী মানুষ-যারা বিশ্বাস করে, আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমরাই তৈরি করবো।
বিশ্বের সমসাময়িক দুর্যোগ আমাদের দেশের অর্থনীতির উপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তার উত্তরণের পথ খোঁজার আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে চাই। যা আমাদের সবার সফলতায় (একই ভাবে ব্যর্থতায়) ভূমিকা রাখে বলে আমার একান্ত বিশ্বাস।
Reactive বনাম Responsive
চিন্তা-ভাবনা ছাড়া তাৎক্ষণিক আবেগ বা পরিস্থিতির চাপে প্রতিক্রিয়া দেওয়া-Reactive।
আর পরিস্থিতি বুঝে, ভেবে, নিজের লক্ষ্য ও মূল্যবোধ অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেওয়া-Responsive।
এই একটি পার্থক্যই সাফল্যের বড় নির্ধারক।
বাস্তবে দেখা যায়-প্রকৃত সফল মানুষ, বিশেষ করে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে-তারা Responsive। Stephen Covey তাঁর “The 7 Habits of Highly Effective People” বইয়ে Habit-1-এ বলেন: Proactive (Responsive) মানুষ “Circle of Influence”-এ ফোকাস করে। অর্থাৎ-
⦁ যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় → সেখানে কাজ করা
⦁ যা যায় না → সেখানে আবেগ নষ্ট না করা
“Responsibility” শব্দটির অর্থই হলো-response-ability; অর্থাৎ প্রতিক্রিয়া বেছে নেওয়ার সক্ষমতা।
Responsive মানসিকতার প্রভাব
সংক্ষেপে: Proactive (বা Responsive) মানুষ পরিস্থিতির দাস নয়-তারা চিন্তা, মূল্যবোধ ও লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করে। এই একটি পার্থক্যই ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা এবং রাজনীতিতে তাদের এগিয়ে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনে: তারা আবেগের তাড়নায় তর্কে জড়ায় না; বরং শুনে, বোঝে, তারপর উত্তর দেয়। ফলে সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকে, আস্থা বাড়ে, এবং সংকটও শান্তভাবে সামলানো যায়-যা দীর্ঘমেয়াদে সুখী ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে।
ব্যবসায়: তারা সমস্যায় আটকে না থেকে সমাধানে ফোকাস করে, feedback নেয়, দ্রুত শিখে এবং কৌশল ঠিক করে। ক্লায়েন্ট, টিম ও পার্টনারদের সাথে তাদের আচরণ বিশ্বাসযোগ্য হয়-ফলে সুযোগ বাড়ে, সিদ্ধান্তের মান উন্নত হয়, এবং ধারাবাহিকভাবে গ্রোথ আসে।
রাজনীতিতে: Proactive নেতা আবেগে উস্কানি না দিয়ে বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয় এবং সংকটে স্থির থাকে। এতে জনগণের আস্থা তৈরি হয়, নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা আসে, এবং নেতৃত্ব টেকসই হয়।
মূল কথা: Reactive মানুষ পরিস্থিতি দ্বারা চালিত হয়; Proactive মানুষ পরিস্থিতিকে নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালনা করে—আর সাফল্য সাধারণত দ্বিতীয়দের দিকেই যায়।
বৈশ্বিক সংকট ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্র/ইসরায়েল-ইরান কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের জন্য অশনি সংকেত।
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং আমদানির খরচ বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে এর প্রভাব পড়বে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে। অর্থাৎ-চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।
সম্ভাব্য প্রভাব
⦁ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
⦁ পরিবহন খরচ বৃদ্ধি
⦁ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি
⦁ মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি
রেমিট্যান্স ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। এর ফলে-
⦁ কর্মসংস্থান হ্রাস
⦁ শ্রমিক প্রত্যাবর্তন
⦁ রেমিট্যান্স কমে যাওয়া
এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জেই সুযোগ: নতুন শ্রমবাজার
মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরতা কমিয়ে শ্রমবাজার বৈচিত্র্য আনা সত্যিই একটি কৌশলগত প্রয়োজন-বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো শ্রম-রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে কয়েকটি উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশে নতুন ও স্থিতিশীল শ্রমবাজার দ্রুত সম্প্রসারিত করা সম্ভব।
নিচে সম্ভাবনাময় কিছু দেশ ও তাদের সুযোগের ধরন দেওয়া হলো:
জাপান: কেয়ারগিভার, নির্মাণ, শিল্পখাত
দক্ষিণ কোরিয়া: EPS* প্রোগ্রামের মাধ্যমে উৎপাদন, কৃষি, মৎস্য
জার্মানি: স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, কারিগরি দক্ষতা
কানাডা: হেলথকেয়ার, আইটি, নির্মাণ
অস্ট্রেলিয়া: কৃষি, নির্মাণ, সেবা
সিঙ্গাপুর: আইটি, নির্মাণ, সার্ভিস
মালয়েশিয়া: প্লান্টেশন, ম্যানুফ্যাকচারিং
যুক্তরাজ্য: নার্সিং, কেয়ার, আইটি (NHS* খাত)
⦁ *Employment Permit System (EPS) হলো এমন একটি সিস্টেম, যেখানে কোরিয়ার নিয়োগকর্তারা বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ করতে পারেন যখন স্থানীয়ভাবে শ্রমিক পাওয়া যায় না। বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫-১৬টি দেশ এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে।
⦁ *NHS বলতে সাধারণত বোঝানো হয় National Health Service (NHS)-এটি যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা
কৌশলগত করণীয়
⦁ আন্তর্জাতিক মানের ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ
⦁ ভাষা দক্ষতা (ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা)
⦁ সার্টিফিকেশনভিত্তিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট
⦁ সরকারি-বেসরকারি যৌথ নিয়োগ উদ্যোগ
উপসংহার
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অমিত সম্ভাবনা। এই দুইয়ের মাঝে আমাদের পথ নির্ধারণ করবে আমাদের মানসিকতা-আমরা কি Reactive হয়ে পরিস্থিতির শিকার হবো, নাকি Responsive হয়ে পরিস্থিতিকে নিজের লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করবো?
ইতিহাস বলে-এই দেশের মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে জানে। ১৯৭১ তার প্রমাণ। এখন প্রয়োজন সেই আত্মবিশ্বাস, সেই ঐক্য, সেই আলোকিত নেতৃত্ব-যা আমাদের আবারও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।
রাষ্ট্র, নেতৃত্ব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সাধারণ মানুষ-সবাইকে একসাথে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আমরা আর অপেক্ষা করবো না; আমরা প্রস্তুত হবো, আমরা কাজ করবো, আমরা এগিয়ে যাবো।
কারণ ভবিষ্যৎ কোনো দূরের বিষয় নয়-
এটি তৈরি হয় আজকের চিন্তা, আজকের সিদ্ধান্ত এবং আজকের কাজ দিয়ে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই কারও দয়ার উপর নির্ভরশীল নয়-
এটি নির্ভর করছে আমরা আজ কতটা সচেতন, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা Responsive হতে পারছি তার উপর। চলবে
আশরাফ রহিম: আমেরিকা প্রবাসি






