শুক্রবারের চিকিৎসা, ওষুধের অনিশ্চয়তা: সাতক্ষীরার স্বাস্থ্যব্যবস্থার অদৃশ্য সংকট
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সকাল আটটা। সাতক্ষীরা শহরের প্রধান সড়কগুলো তখনই ব্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, তালা, কলারোয়া-জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন। কারও হাতে পরীক্ষার রিপোর্ট, কারও চোখে উদ্বেগ, কারও সঙ্গে অসুস্থ বাবা-মা বা শিশু সন্তান। কারণ একটাই-আজ শুক্রবার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর দিন। কিন্তু এই আশার দিনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরেকটি বাস্তবতা-চিকিৎসা পাওয়ার পরও চিকিৎসা সম্পূর্ণ না হওয়ার এক নীরব সংকট। প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়েও অনেক রোগী ফিরছেন অনিশ্চয়তা নিয়ে, কারণ প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না, বা পেতে হচ্ছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা।
এই দৃশ্য কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি এখন একটি নিয়মিত চিত্র, যা সাতক্ষীরার স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে। স্বাভাবিক অর্থনীতির ভাষায়, কোনো পণ্য বা সেবার চাহিদা বাড়লে সরবরাহও বাড়ার কথা। কিন্তু সাতক্ষীরার বাস্তবতা যেন সেই সূত্রের উল্টো। শুক্রবার-যেদিন রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি-সেই দিনেই শহরের অর্ধেক অংশের ফার্মেসি বন্ধ থাকে। ওষুধ ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পালাক্রমে দোকান বন্ধ রাখা হয়। ফলে কার্যত অর্ধেকের বেশি দোকান সেবা থেকে বাইরে থাকে।
এতে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়-খোলা থাকা দোকানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ, রোগীদের জন্য সময় ও সেবার সংকট ফলে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হওয়ার কথা নয়। এই সংকটকে বুঝতে হলে মাঠের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগী ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। তিন-চার ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে শহরে পৌঁছেছেন। চিকিৎসকের চেম্বারে অপেক্ষা করেছেন আরও কয়েক ঘণ্টা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে যখন প্রেসক্রিপশন হাতে পেয়েছেন, তখন শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত।
এই অবস্থায় যদি তাঁকে আরও দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়-এটি একটি মানবিক ব্যর্থতা। বিশেষ করে-বয়স্ক রোগী, গর্ভবতী নারী, শিশুরা এই দীর্ঘ অপেক্ষার কষ্ট আরও তীব্রভাবে অনুভব করেন। সংকটের ভেতর আরও একটি উদ্বেগজনক দিক উঠে এসেছে-সব রোগী সমান সেবা পাচ্ছেন না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ফার্মেসি বড় অংকের প্রেসক্রিপশনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ছোট অংকের ওষুধ নিতে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়, কখনো বা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়-এটি নৈতিক সংকট। স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য মানে-দরিদ্র মানুষ আরও বঞ্চিত হওয়া, জরুরি রোগী ঝুঁকিতে পড়া, সামাজিক অসাম্য আরও গভীর হওয়া। ওষুধ ব্যবসায়ীদের বক্তব্যও একেবারে অযৌক্তিক নয়। তারা বলছেন-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট শিফট নেই, দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, বিশ্রামের সুযোগ প্রয়োজন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো-সমাধান কি এই? স্বাস্থ্যসেবা খাতে সমাধান হতে হবে এমন, যাতে-কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত হয়, রোগীদের সেবাও ব্যাহত না হয়, কিন্তু বর্তমান পদ্ধতিতে দেখা যাচ্ছে, ভারসাম্য তৈরি হয়নি।
স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ পণ্য নয়। এটি একটি “রহবষধংঃরপ ফবসধহফ বা অনমনীয় চাহিদার ক্ষেত্র। অর্থাৎ-রোগী তার চাহিদা স্থগিত করতে পারে না, বিকল্প খুঁজে নেওয়ার সুযোগ সীমিতসময়ই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে স্বাস্থ্যসেবাকে পুরোপুরি বাজারের নিয়মে পরিচালনা করা যায় না। ফার্মেসিগুলো যদি শুধুই ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়, তাহলে এই ধরনের সংকট তৈরি হবেই। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-প্রশাসন কী করছে? বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা একটি জরুরি সেবা।
এই সেবার অংশ হিসেবে ওষুধ সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে-সাপ্তাহিক ছুটিতে ফার্মেসি বন্ধ রাখার নীতিমালা কী? কোনো তদারকি আছে কি? অভিযোগের তদন্ত হয় কি? এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। শুক্রবারের এই ভিড় আসলে একটি বড় সমস্যার লক্ষণ। কারণ-উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসা ব্যবস্থার কেন্দ্রীভবন ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে আসে। এটি একটি “পবহঃৎধষরুবফ যবধষঃযপধৎব সড়ফবষ-এর ফলাফল।
সাতক্ষীরার এই চিত্র পুরো দেশের একটি প্রতিফলন। সমস্যাগুলো হলো-শহর বনাম গ্রামের বৈষম্য, সরকারি ও বেসরকারি সেবার অসমতা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এই কারণে ছোট একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও বড় সংকটে পরিণত হয়। সমস্যার সমাধান আছে, তবে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত। সব দোকান খোলা রেখে কর্মীদের পালাক্রমে ছুটি দেওয়া। প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ফার্মেসি খোলা রাখা বাধ্যতামূলক করা। লাইফ-সেভিং ওষুধ সবসময় নিশ্চিত রাখা। টোকেন বা সিরিয়াল সিস্টেম চালু করা।
সেবায় বৈষম্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব-অনলাইন প্রেসক্রিপশন, ওষুধের স্টক তথ্য, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বুকিং এসব উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভিড় কমানো সম্ভব। সবশেষে বিষয়টি মানবিক। একজন রোগী যখন-দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন, অসুস্থ শরীরে অপেক্ষা করেন, ওষুধ না পেয়ে ফিরে যান তখন সেটি কেবল একটি সিস্টেমের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সমাজের ব্যর্থতা। এই সংকটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
কারণ-এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, এটি প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষাসাতক্ষীরার শুক্রবার আমাদের সামনে একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে-চিকিৎসা কি শুধু প্রেসক্রিপশন, নাকি পূর্ণাঙ্গ সেবা? যদি উত্তর হয় পূর্ণাঙ্গ সেবা, তাহলে ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতেই হবে। সমস্যাটি দৃশ্যমান, সমাধানও সম্ভব। প্রয়োজন-সমন্বয়, সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি-শুক্রবারের শহর যেন আর কষ্টের প্রতীক না হয়ে ওঠে-এই প্রত্যাশাই থাকল।
লেখক: সংবাদকর্মী






