বিশ্ব ডাক দিবস: চিঠির সীমানা ভূবনজুড়ে
সাকিবুর রহমান বাবলা
৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডের বার্নে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নÑআন্তর্জাতিক ডাক যোগাযোগকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার ঐতিহাসিক উদ্যোগ। ১৯৬৯ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউপিইউ কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে প্রথমে ইউপিইউ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; ১৯৮৪ সালে এর নাম পরিবর্তন করে বিশ্ব ডাক দিবস করা হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডাকব্যবস্থার অবদানকে তুলে ধরা।
ডাকব্যবস্থার ইতিহাস মূলত মানুষের দূরত্ব জয় করার ইতিহাস। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির আবির্ভাবের বহু আগে সংবাদ, ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রশাসনিক নির্দেশ, ব্যবসায়িক নথি ও রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। বাংলার ডাকব্যবস্থার ঐতিহ্যেও রয়েছে ‘রানার’ বা ডাকহরকরার স্মৃতিÑদুর্গম পথ পেরিয়ে মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার সেই শ্রমনির্ভর সংস্কৃতি আজও আমাদের সাহিত্য ও লোকস্মৃতিতে জীবন্ত। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় সেই রানারের জায়গা নিয়েছে মোটরযান, আধুনিক পরিবহন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ই-কমার্স লজিস্টিকস; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের মৌলিক দায়িত্বটি বদলায়নি।
বিশ্বপরিসরে ইউপিইউ ডাক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব ডাক দিবস তাই শুধু পুরোনো চিঠি বা ডাকটিকিটের স্মৃতিচারণ নয়; এটি যোগাযোগের সার্বজনীন অধিকার, সেবা-প্রাপ্তির সুযোগ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির কথাও মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ উপলক্ষে নতুন ডাকটিকিট ও পণ্য প্রকাশ, ডাকটিকিট প্রদর্শনী, উন্মুক্ত দিবস, কর্মীদের সম্মাননা এবং তরুণদের চিঠি লেখার মতো আয়োজন করা হয়। ইউপিইউ-এর আন্তর্জাতিক চিঠি লেখার প্রতিযোগিতাও শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও লেখার দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও ডাকব্যবস্থা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতীয় পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে আটটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে প্রতীকী ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ডাকব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরবর্তীকালে ডাকটিকিটে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতি ধারণ করা হয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডাকটিকিট এখন শুধু ডাকমাশুলের প্রতীক নয়; ফিলাটেলির মাধ্যমে এগুলো ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্যেরও দলিল হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বাংলাদেশে ডাকব্যবস্থার পরিধি চিঠির গ-ি ছাড়িয়ে বহুমুখী সেবায় বিস্তৃত। চিঠি ও নথিপত্রের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পার্সেল, এক্সপ্রেস মেইল, ইএমএস, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড, সঞ্চয় ও বীমাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা এর আওতায় রয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের অনলাইন ব্যবস্থায় পোস্টকোড অনুসন্ধান, ইএমএস ট্র্যাকিং এবং অন্যান্য ই-সেবাও রয়েছে।
বিশ্ব ডাক ইতিহাসে দীর্ঘ বিলম্বে চিঠি পৌঁছানোর ঘটনাও বিস্ময়কর। ফ্রান্সে ১৮৭৭ সালে পাঠানো একটি চিঠি ২০১৫ সালে গন্তব্যে পৌঁছেÑপ্রায় ১৩৮ বছর পর; এটি দীর্ঘতম বিলম্বের উল্লেখযোগ্য অনানুষ্ঠানিক ঘটনা। অন্যদিকে, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্যের ডরসেট থেকে পাঠানো একটি চিঠি ৮৯ বছর পর, ২০০৮ সালে পৌঁছে অফিসিয়াল রেকর্ড গড়ে। এছাড়া ১৯১৬ সালে লন্ডন থেকে পাঠানো একটি চিঠি প্রায় ১০৫ বছর পর এবং ১৯৬৬ সালে মন্ট ব্লাঙ্কে বিমান দুর্ঘটনার পর হারিয়ে যাওয়া কূটনৈতিক ডাকের একটি ব্যাগ ৪৬ বছর পর, ২০১২ সালে হিমবাহ থেকে উদ্ধার হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে। এসব ঘটনা ডাকব্যবস্থার ইতিহাসে সময়, প্রযুক্তি ও মানুষের স্মৃতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।
ডিজিটাল যুগে প্রশ্ন উঠতে পারেÑই-মেইল, মেসেজিং অ্যাপ ও তাৎক্ষণিক অনলাইন যোগাযোগের সময়ে ডাকব্যবস্থার প্রয়োজন কতটা? বাস্তবতা হলো, ডাকব্যবস্থা বিলীন হয়নি; বরং তার ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। ই-কমার্সের পণ্য সরবরাহ, সরকারি ও বাণিজ্যিক নথি, পার্সেল, আর্থিক সেবা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগে এর প্রয়োজনীয়তা এখনো প্রবল। ডিজিটাল বিভাজনের কারণে যাঁরা অনলাইন অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা পান না, তাঁদের কাছেও ডাকঘর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা কেন্দ্র।
অতএব, বিশ্ব ডাক দিবসের তাৎপর্য অতীতের চিঠির আবেগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠানকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার আহ্বান। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ডাকঘরগুলোকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব করা; একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের মধ্যে সেবার বৈষম্য কমানো। রানারের ঐতিহ্য থেকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের যুগে পৌঁছানো ডাকব্যবস্থা প্রমাণ করেছেÑপ্রযুক্তি মাধ্যম বদলায়, কিন্তু মানুষের সংযোগের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।









