মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

বৃষ্টির নিচে ডুবে যাচ্ছে জনপদ: জলবায়ু সংকটে সাতক্ষীরার দীর্ঘশ্বাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ণ
বৃষ্টির নিচে ডুবে যাচ্ছে জনপদ: জলবায়ু সংকটে সাতক্ষীরার দীর্ঘশ্বাস

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

গতকাল সন্ধ্যা থেকেই দেশের প্রায় সর্বত্র একযোগে বৃষ্টি শুরু হয়। রাত যত গভীর হয়েছে, ততই বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। রাত দুইটার দিকে মুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গে মেঘের গর্জন যেন প্রকৃতির এক ভয়াল সতর্কবার্তা হয়ে ধরা দেয়। চারদিকে বৃষ্টির ধোঁয়াশা, বাতাসের গর্জন আর অবিরাম জলধারায় মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে মানুষের সহনশীলতাকে পরীক্ষা করছে।
বিগত কয়েকদিন ধরে সৃষ্ট নি¤œচাপের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আষাঢ়ের বৃষ্টি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে ভূমিধসে বহু মানুষের হতাহত ও অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে।

 

দেশের বিভিন্ন নি¤œাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। কিন্তু এই দুর্যোগের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং নীরব শিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। সাতক্ষীরার মানুষের কাছে বর্ষাকাল এখন আর শুধু ঋতুর নাম নয়; এটি এক দীর্ঘ আতঙ্কের প্রতীক। কারণ প্রতিটি ভারী বর্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ভয়, জলাবদ্ধতার আশঙ্কা, লবণাক্ত পানির আগ্রাসন, পানীয় জলের সংকট এবং জীবিকা হারানোর শঙ্কা।

বাঁধের ভাঙাগড়া এবং অন্তহীন অবহেলা: শ্যামনগর, আশাশুনি, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব বহন করছে। বিশেষ করে শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও আশাশুনির প্রতাপনগর এবং আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে সামান্য জলোচ্ছ্বাস কিংবা অতিবৃষ্টিতেই বেড়িবাঁধের দুর্বল অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই বাঁধ ব্যবস্থাপনার চরম সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উন্নয়ন সংগঠন ‘সুশীলন’-এর সহকারি পরিচালক জি এম মনিরুজ্জামান।

 

তিনি বলেন: ‘সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের মূল রক্ষাকবচ হলো বেড়িবাঁধ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে কেবল জোড়াতালির সাময়িক মেরামত চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন ঝড়ের তীব্রতা এবং জোয়ারের উচ্চতা অনেক বেড়ে গেছে। এই সনাতন ও দুর্বল মাটির বাঁধ দিয়ে বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলা করা অসম্ভব। আমাদের প্রয়োজন ব্লক ও সিসি ক্যামেরা সম্বলিত আধুনিক, উঁচু ও টেকসই ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট’ (জলবায়ু-সহনশীল) বেড়িবাঁধ।’

জলমগ্ন জনপদ ও অবরুদ্ধ অর্থনীতি: জলাবদ্ধতা সাতক্ষীরার আরেকটি স্থায়ী দুর্ভোগ। অল্প বৃষ্টিতেই শহর ও গ্রামের বহু সড়ক ডুবে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, নদী-খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে দিনের পর দিন বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং কৃষিজমি পানির নিচে থাকে।

 

বিশেষ করে শহর ও শহরতলীর কাটিয়া, ইটাগাছা, মধুমাল্লারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনী, সুদুরডাঙ্গী, মাছখোলা এলাকার পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরার পানি ও নদী নিয়ে আন্দোলন করছেন পানি কমিটির প্রভাবশালী নেতা মফিজুর রহমান। সাতক্ষীরার বর্তমান জলাবদ্ধতা সংকটকে তিনি একটি ‘মানব সৃষ্ট দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন: ‘সাতক্ষীরার প্রাণ ছিল কপোতাক্ষ, মরিচ্চাপ ও বেতনা নদী।

 

আজ এই নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এর ওপর অপরিকল্পিত স্লুইস গেট এবং প্রভাবশালী মহলের নদী-খাল দখল করে অবৈধ নেট-পাটা ও ঘের তৈরি করার কারণে পানি নিষ্কাশনের সমস্ত পথ অবরুদ্ধ। নদী খনন এবং জলাশয়গুলো দখলমুক্ত না করলে এই জলাবদ্ধতা থেকে সাতক্ষীরার মানুষের মুক্তি নেই।’ এই জলাবদ্ধতার সবচেয়ে নির্মম শিকার হন প্রান্তিক ও ভূমিহীন মানুষ, যাদের মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁইটুকুও থাকে না। ভূমিহীন নেতা আব্দুস সামাদ অত্যন্ত বেদনার সাথে মাঠের চিত্র তুলে ধরে বলেন: ‘যখন ভারী বৃষ্টিতে বা বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষগুলো।

 

তারা বছরের পর বছর ধরে ওয়াপদার রাস্তার (বাঁধের) ওপর বা খাস জমিতে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে। পানি উঠলে তাদের চুলো জ্বলে না, থাকার জায়গা থাকে না, গবাদিপশু নিয়ে তারা রাস্তায় ভাসমান জীবনযাপন করে। জলবায়ু রিফিউজি বা উদ্বাস্তু এই মানুষগুলোর পুনর্বাসনের কোনো স্থায়ী উদ্যোগ আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র নেয়নি।”

লবণাক্ততার বিষাক্ত ছোবল এবং সুপেয় জলের হাহাকার: এক সময় সাতক্ষীরার পরিচয় ছিল কৃষি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা হিসেবে। আজ সেই জেলার বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে লবণাক্ততা। নদী, খাল, পুকুর, এমনকি অনেক নলকূপের পানিও এখন লবণাক্ত। উপকূলের এই রূপান্তর এবং এর পেছনে সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কথা বলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত। তিনি বলেন: ‘আইলা, আম্পান, সিডর বা রেমালের মতো দুর্যোগের পর ফসলি জমিতে লবণ পানি ঢুকে যাওয়ায় সাতক্ষীরার সনাতন কৃষি ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে।

 

বাধ্য হয়ে কৃষকরা ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ঘেরের দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, সাধারণ খেতমজুররা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন এবং তীব্র খাদ্য ও পুষ্টি সংকট তৈরি হচ্ছে। কৃষি বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে লবণাক্ততা-সহনশীল ধান ও ফসলের চাষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’ লবণাক্ততার আরেকটি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো সুপেয় পানির তীব্র সংকট। নারীদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।

 

এই মানবিক সংকট নিয়ে কাজ করছেন উন্নয়ন সংস্থা ‘ক্রিসেন্ট’-এর পরিচালক আবু জাফর। তিনি জানান: ‘সাতক্ষীরার নারীদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। খাবার পানির এক কলস জোগাড় করতে তাদের প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার কিছু ব্যবস্থা করা হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনাবৃষ্টির সময় সেই পানি ফুরিয়ে যায়। পুকুর বা পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) গুলোও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে। সুপেয় পানির এই তীব্র সংকট উপকূলীয় নারীদের জরায়ুর রোগসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।’

হুমকির মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য: সাতক্ষীরার সীমান্ত ঘেঁষেই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস এবং জলবায়ুর অভিঘাত সুন্দরবনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে, তা স্পষ্ট করেন ‘সুন্দরবন ফাউন্ডেশন’-এর পরিচালক আফজাল হোসেন। তিনি বলেন: ‘সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবন বুক পেতে আমাদের বাঁচায়। কিন্তু জলবায়ু সংকটের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনের ভেতরের মিষ্টি পানির উৎস বা পুকুরগুলো লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে।

 

অতিবৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বনের ভেতরের বাস্তুসংস্থান (ঊপড়ংুংঃবস) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হরিণ, বাঘসহ বনের বন্যপ্রাণীরা সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। সুন্দরবন বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে, আর সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে জলবায়ু ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ সাতক্ষীরার ‘প্রকৃতি ও জীবন’ ক্লাবের সভাপতি অ্যাড. মুনীরউদ্দীন জানান- ‘আমরা এ বর্ষা মৌসুমে বারো হাজার বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, উপকুলের এ জনপদকে রক্ষা করতে গাছ লাগাবার বিকল্প নেই’।

সংকটের বহুমাত্রিক রূপ ও ভবিষ্যৎ করণীয়: বর্ষা শুরু হলেই সাতক্ষীরায় নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বর, সাপের কামড়সহ নানা সমস্যা বাড়ে। অনেক এলাকায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পেরে কৃষকের লোকসান হয়।

বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় অংশীজনদের মতে, শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতার বৈজ্ঞানিক সমাধান (যেমন টিআরএম বা জোয়ারভাটা নির্ভর পলি ব্যবস্থাপনা), স্থানীয় জনগণকে পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করা এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা (উবষঃধ চষধহ) গ্রহণ। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সাতক্ষীরা শুধু একটি জেলার নাম নয়; এটি আজ বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

 

এখানকার মানুষের প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রাম আমাদের পুরো দেশের ভবিষ্যতের গল্প বলে। যদি এখনই সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং টেকসই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং প্লাবনের এই সংকট আগামীতে আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ভারী বৃষ্টি অব্যাহত: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। বান্দরবানে পরিস্থিতি আরও খারাপ টানা চার দিনের বৃষ্টিতে বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসন শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে।

 

পাহাড়ধসে প্রাণহানি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণের কারণে কয়েক দফা পাহাড়ধসে শিশু ও নারীসহ একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি বন্যার সতর্কতা বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (ঋঋডঈ) দেশের অন্তত ১৪-১৭ টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

উপকুলীয় জনপদ সাতক্ষীরার জন্য সুপারিশ: ১.টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ২.নদী ও খাল পুনঃখনন, ৩.স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম (ঞরফধষ জরাবৎ গধহধমবসবহঃ) কার্যকর বাস্তবায়ন, ৪.নিরাপদ সুপেয় পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা, ৫.উপকূলীয় জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বিশেষ বাজেট ও পরিকল্পনা।

‘এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। বান্দরবানে নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে, হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে । বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র দেশের একাধিক জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার সতর্কতা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয় এটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা।’ সুত্র : ডেইলী স্টার, এপি নিউজ ও ঢাকা ট্রিবিউন।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার, সমাজকর্মী, গবেষক

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।