সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

মা: জীবনের চিরন্তন আশ্রয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ৭:০৫ অপরাহ্ণ
মা: জীবনের চিরন্তন আশ্রয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বিশ্ব মাতৃ দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি, শুভেচ্ছা আর আবেগঘন কথায় ভরে উঠছে চারপাশ। কেউ মায়ের সঙ্গে পুরোনো ছবি প্রকাশ করবেন, কেউ লিখবেন স্মৃতির কথা, কেউবা হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য অশ্রুসিক্ত হবেন নীরবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়Ñমাকে স্মরণ করার জন্য কি সত্যিই একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন আছে? যে মানুষটি আমাদের জন্মের আগেই আমাদের জন্য স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, যার নিঃস্বার্থ ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের পুরো জীবন, তাঁকে কি কেবল একটি দিনের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা যায়? ‘মা’ শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর শব্দগুলোর একটি।

 

এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ত্যাগ, ক্ষমা, মায়া, শাসন, প্রার্থনা আর আশ্রয়ের এক বিশাল পৃথিবী। মানুষের জীবনে প্রথম যে মুখটি দেখা হয়, প্রথম যে কণ্ঠস্বর শোনা হয়, প্রথম যে স্পর্শে নিরাপত্তা অনুভূত হয়Ñসেটি মায়ের। পৃথিবীর সব সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা বদলায় না। সন্তান ব্যর্থ হোক কিংবা সফল, সুন্দর হোক কিংবা অসুন্দর, ধনী হোক কিংবা দরিদ্রÑমায়ের চোখে সন্তানের পরিচয় একটাই, সে তাঁর সন্তান।সভ্যতার ইতিহাসে যত বড় মানুষ এসেছেন, তাঁদের জীবনের ভেতরেও মায়ের অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

 

পৃথিবীর বহু দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক তাঁদের সাফল্যের পেছনে মায়ের প্রেরণার কথা স্বীকার করেছেন। কারণ একজন মা কেবল সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একজন মানুষ গড়ে তোলেন। একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র কিংবা একটি সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ হয় মায়ের হাত ধরেই। আমাদের সমাজে মায়ের ভূমিকা নিয়ে কথা বলা হয় অনেক, কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন। মা যেন একই সঙ্গে পরিবার, সংসার, সন্তান, সমাজÑসবকিছুর ভার বহনকারী এক নীরব যোদ্ধা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণ করতে করতে নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ক্লান্তির কথা তিনি ভুলে যান। অথচ সেই মায়ের কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই ছুটি, নেই বেতন, নেই অবসরকালীন সুবিধা।

 

সংসারের প্রতিটি কাজকে আমরা ‘দায়িত্ব’ বলে ধরে নিই, কিন্তু সেটি যে কত বড় শ্রম, তা খুব কম মানুষই উপলব্ধি করেন। গ্রামের এক কৃষক পরিবারের মায়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু রান্নাঘরের মানুষ নন। কখনো মাঠে কাজ করছেন, কখনো গরু-ছাগল সামলাচ্ছেন, কখনো সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, আবার কখনো সংসারের হিসাব কষছেন। শহরের কর্মজীবী মায়েদের জীবনও কম কঠিন নয়। অফিসের দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফিরে আবার সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়।

 

তাঁদের জন্য আলাদা কোনো বিশ্রামের জায়গা সমাজ তৈরি করেনি।সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে মায়ের ত্যাগকে এতটাই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখা হয় যে সেটি আর আলাদা করে মূল্যায়িত হয় না। একজন বাবা সংসারের জন্য অর্থ উপার্জন করলে তাঁকে সম্মান জানানো হয়, কিন্তু একজন মা সারাজীবন সংসার ও সন্তান সামলালেও সেটিকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। কারণ পরিবার টিকিয়ে রাখার পেছনে মায়ের অবদান অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরেও বিশাল সামাজিক মূল্য বহন করে। মাতৃত্ব কখনোই কেবল জৈবিক সম্পর্ক নয়; এটি একটি গভীর মানবিক অনুভূতি।

 

পৃথিবীতে এমন বহু নারী আছেন, যাঁরা জন্ম না দিয়েও মায়ের মতো ভালোবাসা দিয়ে সন্তান মানুষ করেন। এতিমখানার শিশুর প্রতি একজন সেবিকার মমতা, পথশিশুর মাথায় হাত রাখা একজন নারীর স্নেহ, কিংবা একজন শিক্ষিকার ছাত্রদের প্রতি যতœÑএসবও মাতৃত্বের বিস্তৃত রূপ। তাই মাতৃত্ব আসলে মানবতার সবচেয়ে কোমল ও মহৎ প্রকাশ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও সমাজের কাঠামোও বদলাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে, ব্যস্ততা বাড়ছে, প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতর এক ধরনের মানসিক দূরত্বও তৈরি হচ্ছে। এখন অনেক সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে সময় দিতে পারেন না।

 

কেউ বিদেশে, কেউ কর্মব্যস্ততায়, কেউ নিজের জীবনের প্রতিযোগিতায় এতটাই ব্যস্ত যে মায়ের সঙ্গে বসে দুটো কথা বলার সময়টুকুও বের করতে পারেন না। বৃদ্ধাশ্রমের দিকে তাকালে এই বাস্তবতা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। সেখানে অনেক মা আছেন, যাঁরা একসময় সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, অথচ বার্ধক্যে এসে তাঁরা একাকিত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সন্তানকে বড় করতে গিয়ে যে মা নিজের খাবার, ঘুম, স্বপ্ন সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন, শেষ বয়সে সেই সন্তানদের কাছেই তিনি হয়ে উঠছেন ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’।

 

আধুনিক সভ্যতার এই নির্মমতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। অথচ একজন মায়ের চাহিদা খুব সামান্য। তিনি সন্তানের কাছে বড় কোনো সম্পদ চান না; চান একটু সময়, একটু খোঁজখবর, একটু সম্মান আর ভালোবাসা। মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো সন্তানের আন্তরিকতা। মাতৃ দিবস আমাদের শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি সত্যিই আমাদের মায়েদের যথাযথ সম্মান দিচ্ছি?

 

তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবছি? তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছি? নাকি শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করছি? আমাদের সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, অবহেলা কিংবা মানসিক চাপের বড় একটি অংশের শিকার হন মায়েরা। অনেক মা সংসারের শান্তির জন্য বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেন। কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কষ্ট চেপে রাখেন। আবার কেউ অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে নিজের অধিকার আদায় করতে পারেন না। ফলে মাতৃত্বকে সম্মান করার কথা বললেও বাস্তবে অনেক মা নিরাপত্তাহীন ও অবমূল্যায়িত জীবন কাটান।

মায়ের স্বাস্থ্য নিয়েও আমাদের উদাসীনতা স্পষ্ট। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো বহু মা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান না। গর্ভকালীন সেবা, পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব কিংবা প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যার অভাবে অসংখ্য নারী ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। দরিদ্র পরিবারের মায়েরা প্রায়ই নিজের চিকিৎসার আগে সন্তানের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেন। ফলে দীর্ঘদিন অবহেলায় তাঁদের শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

একজন মা দিনের পর দিন মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি কিংবা অবমূল্যায়নের শিকার হলেও তা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। সমাজ যেন ধরে নেয়Ñমা সব সহ্য করবেন। কিন্তু একজন মায়েরও ক্লান্তি আছে, স্বপ্ন আছে, ভেঙে পড়া আছে, কান্না আছে। তাঁকেও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আবেগ প্রকাশের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেক সময় সেখানে মায়ের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বাস্তব দায়িত্ববোধের জায়গাকে আড়াল করে দেয়।

 

ফেসবুকে মায়ের ছবি দিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়া সহজ, কিন্তু অসুস্থ মায়ের পাশে সময় নিয়ে বসা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভালোবাসা যেন অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার চেয়ে প্রদর্শনীতে বেশি সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও মায়ের প্রতি সম্মান ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাওয়া দরকার। একটি শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই পরিবারের শ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা পাবে, তখন সে বড় হয়ে আরও মানবিক নাগরিক হবে। কারণ মা শুধু একজন ব্যক্তির মা নন; তিনি একটি প্রজন্মের নির্মাতা।

 

আজকের পৃথিবীতে যখন যুদ্ধ, সহিংসতা, লোভ ও বিভাজন বাড়ছে, তখন মাতৃত্বের মানবিক শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন। একজন মা তাঁর সন্তানকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ক্ষমার শিক্ষা দেন। এই মূল্যবোধগুলোই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের ভিত্তি। বিশ্বের বহু দেশে কর্মজীবী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুসেবা সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

 

বিশেষ করে বেসরকারি খাত ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে কর্মরত মায়েদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া গৃহিণীদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়েও এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কারণ একজন গৃহিণী প্রতিদিন যে পরিমাণ কাজ করেন, তা অর্থনৈতিকভাবে হিসাব করলে বিশাল মূল্য দাঁড়ায়। অথচ সেই শ্রমকে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মাতৃ দিবস তাই শুধু আবেগের নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নও।

 

একজন মাকে সম্মান জানানো মানে কেবল ফুল দেওয়া নয়; তাঁর অধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনেও মায়ের প্রতি আচরণ নিয়ে ভাবা দরকার। শেষ কবে আমরা মায়ের সঙ্গে নির্ভার হয়ে গল্প করেছি? শেষ কবে তাঁর ক্লান্তির কথা জানতে চেয়েছি? শেষ কবে তাঁকে বলেছিÑ‘মা, তোমাকে ভালোবাসি’? অনেক সময় আমরা ধরে নিই, মা তো আছেনই। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই বুঝতে হয়, মা আর নেই। তখন হাজার অনুশোচনাও আর কোনো কাজে আসে না।মা হারানোর বেদনা পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি। যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে সারাজীবন পাশে ছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয়।

 

তাই মা বেঁচে থাকতে তাঁর মূল্য বোঝা জরুরি। একজন মা কখনো সন্তানের কাছে বড় কিছু প্রত্যাশা করেন না। সন্তানের সামান্য সাফল্যেই তিনি আনন্দিত হন, সামান্য কষ্টেই উদ্বিগ্ন হন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ প্রার্থনাগুলো সম্ভবত মায়েদের মুখ থেকেই আসে। আজ মাতৃ দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সেই মায়ের প্রতিও, যিনি গ্রামে সন্তানকে মানুষ করতে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি শহরে চাকরি ও সংসারের দ্বৈত চাপ সামলাচ্ছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে একা সংগ্রাম করছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন।

 

শ্রদ্ধা সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তান হারিয়েও বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে নিয়েছেন। শ্রদ্ধা সেই বৃদ্ধ মায়ের প্রতিও, যিনি এখনো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। শ্রদ্ধা সেই একক মায়ের প্রতিও, যিনি একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়ে সন্তান মানুষ করছেন। মাতৃত্বের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি ভালোবাসার সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মা শুধু পরিবারের দায়িত্ব বহনকারী মানুষ হবেন না; তিনি হবেন সম্মানিত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক।

 

যেখানে মায়ের ত্যাগকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হবে না; বরং তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। মাতৃ দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিইÑমাকে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব শুরু হয় পরিবারের ভেতর থেকে, আচরণ থেকে, সম্মান থেকে, সময় দেওয়া থেকে। প্রতিটি দিন হোক মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর দিন। কারণ পৃথিবীতে যতদিন ‘মা’ শব্দটি থাকবে, ততদিন মানবতা বেঁচে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক

 

Ads small one

লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ
লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় ডিডকৃত (চুক্তিভিত্তিক লিজ) ও পৈতৃক সম্পত্তির একটি মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ঘের ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী জানান, তিনি লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় পৈতৃক ও ডিডকৃত ২১০ বিঘা জমিতে ২০২১ সাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মৎস্য চাষ করে আসছেন। ২০২৬ সালে হিসাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু অংশ বাদ দিয়ে ১৭৬.৫৭ বিঘা জমি তার পাওনা হয়, যার মধ্যে ১৫৯ বিঘা জমি তিনি বুঝে পেয়ে গত ৬ মাস ধরে ভোগদখল করছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই হিসাব চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু গত ১৪ জুন অধ্যাপক সিরাজুল কবির ঘেরের জমি নিজের দাবি করে আকস্মিক দখলের চেষ্টা চালান এবং ১৫ জুন শ্রমিক নিয়ে ঘেরে নামেন।
এই বিষয়ে শ্রীউলা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অধ্যাপক সিরাজুল কবিরের জমি আগেই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইউসুফের ঘেরে তার নতুন কোনো জমি নেই। দখলের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা অন্যায় হয়েছে।
তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক সিরাজুল কবির জবরদখলের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এর আগে কোনো সালিস-মিমাংসা হয়নি বা কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি ইউসুফের ঘের দখল করতে যাননি।

কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

কপিলমুনি (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে মায়ের হত্যাকারী ও আপন চাচার করা ‘মিথ্যা’ মামলা ও জীবননাশের হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দুই এতিম ভাই-বোন। সোমবার সকালে কাশিমনগর বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন ইটভাটার শিশু শ্রমিক মো. রিফাত গাজী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিফাত গাজী বলেন, ২০২১ সালে তাদের বাবা এনামুল গাজী মারা যান। এরপর ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তার মা রাশিদা বেগমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় রিফাত বাদী হয়ে চাচা মহিদুল গাজীকে আসামি করে পাইকগাছা থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই মহিদুলকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গত ২১ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেয়েই মহিদুল মামলা তুলে নেওয়ার জন্য রিফাত ও তার ছোট বোন তাসমিরা খাতুনসহ (১৪) সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ১১ জুন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন রিফাত।
রিফাত আরও অভিযোগ করেন, মায়ের হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে চাচা মহিদুল গাজী উল্টো তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। সম্প্রতি তিনি পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিফাতসহ ৭ স্বজনের নাম উল্লেখ করে একটি ‘মিথ্যা’ মামলা (সিআর-৪০৪/২৬) দায়ের করেছেন। মামলায় দাবি করা হয়েছে—তার মা আত্মহত্যা করেছেন এবং রিফাত ও অন্যরা মিলে চাচার ঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালঙ্কার, পুকুরের মাছ ও কলাসহ প্রায় ৩২ লাখ টাকার মালামাল চুরি ও ক্ষতিসাধন করেছে। রিফাত এই দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে পুলিশ জানায়, রাশিদা বেগম আত্মহত্যা করেছেন। ফলে মামলাটি হত্যা (৩০২ ধারা) থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার (৩০৬ ধারা) অপরাধে রূপ নেয়।
রিফাত গাজীর দাবি, তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে চাচা মহিদুল তার মাকে নানাভাবে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিস হলেও মহিদুল উপস্থিত হননি। ঘটনার রাতে তার মাকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল এবং ঘরের বাইরে থেকে শিকল আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন সকালে লিচু গাছ থেকে মায়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও সুরতহাল রিপোর্টে শরীরের নানা অসঙ্গতি ছিল। তাই মায়ের মৃত্যুর সঠিক রহস্য উদঘাটনে পুনরায় ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এই এতিম তরুণ।

 

 

সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

oppo_0

একটি আধুনিক ও প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় নাগরিকরা নিয়মিত কর পরিশোধ করবেন, আর বিনিময়ে পাবেন ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাÑএটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সাতক্ষীরা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের মধ্যকাটিয়া এলাকার চিত্র দেখলে মনে হয়, সেখানকার বাসিন্দারা যেন কোনো পরিত্যক্ত জনপদে বসবাস করছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মধ্যকাটিয়ার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে কার্যত একটি উন্মুক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। কাদা, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ড্রেনের উপচে পড়া কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। একই চিত্র সাতক্ষীরা তুফান কোম্পানীর মোড় থেকে পিএন স্কুল মোড় পর্যন্ত সড়টির। এ সড়কটির কোথাও আস্ত নেই।
একটি সভ্য সমাজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সড়ক যদি এমন নরককু-ে পরিণত হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত পানি উপচে রাস্তায় জমে থাকছে। রাস্তার বড় বড় গর্তগুলো এই নোংরা পানির নিচে লুকিয়ে থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ ও নারীদের প্রতিদিন যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়; এই জমে থাকা নোংরা পানি ও আবর্জনার কারণে এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। এলাকার মানুষ ঘরের দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলতে পারছেন না দুর্গন্ধের কারণে। অথচ নাগরিকরা নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করে যাচ্ছেন। ট্যাক্স দিয়েও কেন মানুষকে এমন আদিম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে বাস করতে হবেÑএই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সমস্যার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে, এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি যে আরও কতটা ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।
পৌরসভার পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই “বিষয়টি অবগত আছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে” ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধু মুখের আশ্বাস বা আশ্বাসের চাদরে দুর্ভোগ ঢেকে রাখার সময় আর নেই। মধ্যকাটিয়াবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাধান।
আমরা সাতক্ষীরা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—অবিলম্বে মধ্যকাটিয়া এলাকার ড্রেনগুলো পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হোক। নাগরিকদের সুস্থ ও নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা পৌরসভার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত মাঠে নামবেন এবং মধ্যকাটিয়াবাসীকে এই দুঃসহ নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবেন।