যে রক্তের দাগ মোছে না/ আখলাকুর রহমান
আখলাকুর রহমান
দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের এই সাতক্ষীরা জনপদে যখন সকালের মিহি আলো ফোটে তখন বাতাসে ধান আর মেঠো মাটির গন্ধ থাকার কথা ছিল। থাকার কথা ছিল সুন্দরবনের কোলঘেঁষে বেড়ে ওঠা খেটে খাওয়া মানুষের ঘামের সোঁদা ঘ্রাণ। কিন্তু আজ এই শহরের আনাচে কানাচে বাতাসের সঙ্গে মিশে গেছে এক তীব্র তামার গন্ধ। সে আর কিছু নয় তা কাঁচা রক্তের গন্ধ। সম্প্রতি সাতক্ষীরার প্রাণিসম্পদ অফিসের সামনের সড়কে এক চায়ের দোকানদারকে বাঁচাতে গিয়ে কলেজছাত্র জাকারিয়া খানের নিথর দেহ ঢলে পড়েছে ধূলিমায়ায়। বুক চিরে অকাতরে রক্ত ঝরেছে আর সেই রক্তের প্রতিটি ফোঁটা বড় নির্মমভাবে প্রশ্ন তুলে গেছে আমাদের সমাজ আমাদের বিবেক আর আমাদের কথিত রাজনীতির দিকে। জাকারিয়া কোনো মারামারির পক্ষ ছিল না, সে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছিল হাত, আর সেই হাত কেটে ফেলা হলো ধারালো অস্ত্রের কোপে।
আহমেদ ছফা কোনো এক প্রসঙ্গে লিখেছিলেন একটি জাতির সমাজব্যবস্থায় যখন পচন ধরে তখন তার প্রথম আঘাতটি এসে পড়ে তরুণের গায়ে। সাতক্ষীরায় কিশোর জাকারিয়ার বুকে যে ছুরিটি বসানো হয়েছে তা কেবল একজন তরুণের রক্তমাংসের শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করেনি, তা আমাদের পুরো সামাজিক কাঠামোর ভঙ্গুর পাঁজরে এক নিষ্ঠুর পেরেক পুঁতে দিয়েছে। অপরাধী চক্রের মূল হোতা নাহিদ আর তার সহযোগীরা হয়তো পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ভারতে পালানোর পথে। আইনি খাতা অনুযায়ী হয়তো তাদের বিচার হবে চালান হবে জেলখানায়। কিন্তু এই আইনি প্রক্রিয়ার ভেতরে মূল সত্যটি ঢাকা পড়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায় যে কিশোরটি জাকারিয়ার বুকে কুপিয়ে রক্ত বের করল সেই কিশোরের হাতের ধারালো অস্ত্রটি কে তুলে দিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে সাতক্ষীরার মাটিতে এই ছোট ছোট কিশোরদের হাতে ফুল আর বইয়ের বদলে কে তুলে দিল মৃত্যুর বার্তা।
কিশোর অপরাধ বা কিশোর গ্যাং কোনো আসমান থেকে খসে পড়া কুয়াশা নয়। কোনো এক সকালে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে একদল কিশোর সিদ্ধান্ত নেয় না যে তারা আজ কাউকে খুন করবে কিংবা পাড়ার মোড়ে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেবে। সাতক্ষীরায় এই কিশোরদের বিচ্যুতি আর তাদের হিংস্্রতার উত্থান কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে লালন করা একটি বিষবৃক্ষের ফল। একসময় পাড়া মহল্লায় এই বয়সের কিশোরদের চেনার উপায় ছিল ফুটবল খেলার মাঠ কিংবা কোনো পাঠাগারের বইয়ের পাতা। কিন্তু আজ শহরের গলিতে গলিতে চেনা যায় তরুণের দলবদ্ধ গর্জন মোটরসাইকেলের বিকট শব্দের আস্ফালন আর কোমরে গুঁজে রাখা ছোট ধারালো অস্ত্রের উপস্থিতি। তারা কারা। এরা আমাদেরই সন্তান আমাদেরই ভাই কিংবা প্রতিবেশী। কিন্তু এদের মগজে ঢুকে গেছে এক অদ্ভুত ক্ষমতার বিষাক্ত মোহ।
সমাজ যখন তার নৈতিকতার কঙ্কালটা হারিয়ে ফেলে তখন সেই শূন্য জায়গায় এসে বাসা বাঁধে নিশাচর শকুন। সাতক্ষীরার এই কিশোর গ্যাংগুলো আজ সেই শকুনের জাত ভাই হয়ে উঠেছে। অতি তুচ্ছ তর্ক কথা কাটাকাটি কিংবা এক চিলতে অহংকারের বশে তারা আজ সমবয়সীর বুকে ছেনি বসাতে দ্বিধা করে না। কারণ তারা মনে মনে বিশ্বাস করে তাদের পেছনে কেউ একজন আছে। এমন কেউ একজন যার ছায়া অনেক লম্বা যার ক্ষমতার হাত অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
সাতক্ষীরায় যুগের পর যুগ ধরে এই যে কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে তার আসল চালিকাশক্তি কী। তা কি কেবলই বয়সের ভুল কিংবা হরমোনের তাড়না। নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনীতি নামক এক মহীরুহের বিষাক্ত আশ্রয়। অপ্রিয় সত্য হলেও আমাদের তা সপাটে স্বীকার করতেই হবে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ছোটখাটো রাজনৈতিক নেতা কিংবা নামধারী মুরুব্বিদের প্রশ্রয়ই এই কিশোরদের দুঃসাহসের প্রধান জ্বালানি। এই উদীয়মান তরুণরা হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞান বোঝে না, তারা বোঝে রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের দাপট। মিছিলে লোক বাড়ানোর সস্তা রসদ হিসেবে এদের ব্যবহার করা হয়। নেতাদের ক্ষমতার শো ডাউনে এদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পোস্টার আর মনের ভেতর গেঁথে দেওয়া হয় এক ভুয়া ক্ষমতার অহংকার। তুই অপরাধ কর তোর কিছু হলে পেছনে আমি আছি, এই একটি মাত্র আশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় হাজারো জাকারিয়ার খুনি।
এই রাজনৈতিক আর সামাজিক প্রশ্রয়ের খেলাটি সাতক্ষীরায় নতুন নয়। যুগে যুগে এই আশ্রয়দাতারা বদলায়, তাদের দল কিংবা ক্ষমতার রঙ বদলায় কিন্তু বদলায় না কেবল বলি হওয়া তরুণের পরিচয়। একদলের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয় এই কিশোরদের আর অন্যদলের আক্রোশের শিকার হয়ে লাশ হতে হয় আরেক জাকারিয়াকে। রাজপথ যখন রক্তে লাল হয় তখন ক্ষমতার বড় ভাইয়েরা সুশীতল ঘরে বসে নিজেদের আখের গোছায় আর কাটিয়া মহল্লার কোনো এক হতভাগা মায়ের কোলে নেমে আসে চিরন্তন অন্ধকার।
আমরা যখন সংবাদপত্রের পাতায় সংবাদের শিরোনাম পড়ি যে সাতক্ষীরায় জাকারিয়া হত্যার প্রধান আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে তখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা হয়তো একটু স্বস্তি পাই। আমরা ভাবি আইনের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সামাজিক ব্যবস্থার খাতা যেখানে শেষ হয় কোনো এক মায়ের অনন্ত নীরবতা ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। জাকারিয়ার মা আজ কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি কি সংবাদপত্রের খবর পড়েন। তিনি কি স্থানীয় রাজনীতির এই নোংরা অংকগুলো বোঝেন। একটি সন্তানকে দশ মাস দশ দিন জঠরে ধারণ করে তিল তিল করে বড় করে তোলা আর একদিন সকালে তার রক্তভেজা জামাটি জড়িয়ে ধরে চিৎকার করা এই যন্ত্রণার পরিমাপ করার ক্ষমতা মানুষের কোনো ভাষার নেই।
জাকারিয়ার মায়ের মতো এমন শত মায়ের বুক আজ সাতক্ষীরার মাটিতে খালি হয়ে যাচ্ছে। যে কোলের উষ্ণতায় জাকারিয়া বড় হয়েছিল সেই কোল আজ এক বিশাল মরুভূমি। আমাদের সমাজ কি পারে জাকারিয়ার মায়ের সেই শূন্য কোল ফিরিয়ে দিতে। কোনো বিচার ব্যবস্থা কোনো ফাঁসির দড়ি কিংবা কোনো প্রশাসনিক আশ্বাস কি সেই মায়ের চোখের এক ফোঁটা জলের দাম শোধ করতে পারবে। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্রে সামাজিক সুস্থতার দাবি করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। যখন সাতক্ষীরার রাস্তায় জাকারিয়ারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে না, চায়ের দোকানে সামান্য ঝগড়া মেটাতে গিয়ে লাশ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের জনপদের অভিভাবকরা তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, জাকারিয়া হত্যার বিচার কি কেবল ওই হাতে গোনা কয়েকটা আসামির সাজাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ওই কিশোরদের জেলে পাঠালেই কি সাতক্ষীরা থেকে এই অস্ত্রের মহড়া বন্ধ হয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবেই না। যদি সাতক্ষীরাকে এই অন্ধকার থেকে বের করে আনতে হয় তবে আঘাত করতে হবে বিষবৃক্ষের শেকড়ে। যে সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা এই কিশোরদের হাতকে খুনি বানিয়ে তোলে সেই আশ্রয়দাতাদেরও জাকারিয়া হত্যার সমান অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া নিজে অপরাধ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
পরিবারগুলোকে আজ চোখ মেলতে হবে। জানতে হবে তাদের সন্তানরা কার সাথে সময় কাটাচ্ছে রাত বিরাতে কোথায় যাচ্ছে। কেবল জিপিএ পাঁচ আর অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় না নামিয়ে সন্তানদের বুকের ভেতরে একটু মানবিকতার চর্চা করাতে হবে। একই সাথে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠগুলো আবার সচল করতে হবে সংস্কৃতি চর্চার পথ সুগম করতে হবে। যে হাতে বই কিংবা ফুটবল থাকার কথা সেই হাতে যাতে কোনো বড় ভাই ধারালো অস্ত্র তুলে দিতে না পারে তার সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর হতে হবে। কোনো বড় ভাইয়ের টেলিফোন যেন অপরাধীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চাবিকাঠি না হতে পারে।
জাকারিয়ার বুকের রক্ত এখনো আমাদের রাস্তার ধূলিকণায় শুকিয়ে যায়নি। হয়তো কিছুদিন পর নতুন কোনো খবরের চাপে আমরা এই শোক আর ক্ষোভ ভুলে যাব। আবার হয়তো কোনো এক গলির মোড়ে আরেকদল তরুণ নতুন অস্ত্রের ধার পরীক্ষা করবে বড় ভাইয়ের ইশারায়। কিন্তু আমরা যদি আজ সচেতন না হই যদি সাতক্ষীরার সুশীল সমাজ এই প্রশ্রয়দাতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আওয়াজ না তোলে তবে মনে রাখা ভালো যে আজ যা জাকারিয়ার মায়ের সাথে ঘটেছে কাল তা আপনার কিংবা আমার সন্তানের সাথেও ঘটতে পারে। জাকারিয়ার এই মর্মান্তিক বিদায় যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। আমরা এমন এক সাতক্ষীরা চাই যেখানে কোনো মা তার সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে বুক ধড়ফড় করে অপেক্ষা করবেন না। আমরা এমন পরিবেশ চাই যেখানে রাজনীতি মানে হবে মানুষের সুরক্ষা কোনো কিশোরকে খুনি বানানোর কারখানা নয়। জাকারিয়া আর কোনোদিন ফিরে আসবে না কিন্তু তার রক্তের দোহাই দিয়ে সাতক্ষীরার আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া বন্ধ করতেই হবে।
আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা, আসিফা









