শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

রথযাত্রা: বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্ত যাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ণ
রথযাত্রা: বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্ত যাত্রা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

আজ বৃহস্পতিবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালিত হবে। প্রতি বছরের আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হওয়া এই রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; হাজার বছরের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক দর্শন, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। রথের চাকা যেমন অবিরাম ঘুরে চলে, তেমনি ঘুরে চলে মানুষের বিশ্বাস, সভ্যতার ইতিহাস এবং আত্মশুদ্ধির পথ।

 

বর্তমান বিশ্বে মানুষ অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে একাকীত্ব, মানসিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সামাজিক বিভাজন এবং নৈতিক অবক্ষয়। এমন বাস্তবতায় রথযাত্রার মতো ধর্মীয় উৎসব কেবল ভক্তির নয়, মানবিক জাগরণেরও উপলক্ষ হয়ে ওঠে।স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত আছে, উৎকলের রাজা ইন্দ্রদ্যু¤œ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে একটি মহামন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

 

পরবর্তীতে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়ে বিশ্বকর্মার মাধ্যমে দেববিগ্রহ নির্মাণের আয়োজন করা হয়। শর্ত ছিল, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ দরজা খুলবেন না। কিন্তু রানীর কৌতূহলে সেই শর্ত ভঙ্গ হয়। ফলে অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই মূর্তি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। সেই অসম্পূর্ণ রূপেই প্রতিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।এই অসম্পূর্ণতাই রথযাত্রার অন্যতম গভীর দর্শন। সমাজে আমরা মানুষকে বিচার করি বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় দিয়ে। অথচ জগন্নাথদেবের মূর্তি যেন ঘোষণা করেÑপূর্ণতা বাহ্যিক নয়, অন্তরের। ঈশ্বর মানুষের বাহ্যিক রূপ নয়, হৃদয়ের ভক্তি দেখেন।

 

আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজে এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রথযাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার স্মৃতিও। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, গোপীদের মুখে কৃষ্ণের প্রেম ও লীলাকথা শুনে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা এমন এক ভাবাবেশে আপ্লুত হন যে তাঁদের চোখ বিস্ফারিত হয়, হাত গুটিয়ে যায় এবং শরীর এক বিশেষ ভঙ্গিমা ধারণ করে। সেই রূপই আজকের জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার প্রতীকী মূর্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণÑঈশ্বরের প্রেম মানুষের চেতনাকে বদলে দিতে পারে।রথযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সমতা। রথ টানার সময় সেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চবর্ণ-নি¤œবর্ণ কিংবা নারী-পুরুষের আলাদা কোনো পরিচয় থাকে না। সবাই একই দড়িতে হাত রাখে। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং সামাজিক সমতার এক জীবন্ত প্রতীক।আজ যখন বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বাড়ছে, তখন রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñসমাজের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সবাই একই লক্ষ্যে একসঙ্গে এগিয়ে যায়।

 

রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা পরিবারÑকোনো ক্ষেত্রেই বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি ও বহু ঐতিহ্যের দেশ। এখানে দুর্গাপূজা, রথযাত্রা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন, ঈদÑসবই জাতীয় জীবনের অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই রথযাত্রা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রতীক।

 

রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষেরও সতর্ক থাকা জরুরি।রথের আরেকটি তাৎপর্য হলোÑঈশ্বর মানুষের কাছে আসেন। সাধারণত মানুষ মন্দিরে যায় ঈশ্বরের দর্শনে। কিন্তু রথযাত্রায় জগন্নাথদেব নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে মানুষের দ্বারে আসেন। এই প্রতীকী ঘটনা আমাদের শেখায়, ধর্ম মানুষের জন্য; মানুষ ধর্মের জন্য নয়। প্রকৃত ধর্ম মানুষের কষ্ট লাঘব করে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, মানুষকে বিভক্ত নয়Ñঐক্যবদ্ধ করে।বিশ্বায়নের যুগে অনেকেই মনে করেন ধর্মের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।

 

বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই মানসিক শান্তির সন্ধান করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের ভোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। রথযাত্রার মতো উৎসব মানুষকে সামষ্টিক আনন্দ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আত্মিক প্রশান্তির অনুভূতি দেয়।জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার এই সময়ে মানুষ নতুন করে আশা খুঁজছে। রথযাত্রা সেই আশারই প্রতীক। রথের চাকা যেমন থেমে থাকে না, তেমনি মানুষের সংগ্রামও থেমে থাকে না। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই মানুষ এগিয়ে যায়।

 

আজ আমাদের সমাজে নৈতিক সংকট স্পষ্ট। দুর্নীতি, প্রতারণা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন, পরিবেশ ধ্বংসÑএসব সমস্যা কেবল আইন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, আত্মসংযম ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। ধর্মীয় উৎসবগুলো যদি মানুষকে আরও মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করে, তবেই সেগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।রথযাত্রার দড়িতে হাজারো মানুষের সম্মিলিত টান আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়Ñসমষ্টিগত প্রচেষ্টাই বড় পরিবর্তনের শক্তি। একটি রথ একা কেউ টানতে পারে না। ঠিক তেমনি একটি দেশও একক কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগোতে পারে না।

 

প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি।রথযাত্রা সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গান, কীর্তন, শঙ্খধ্বনি, ঢাক, উৎসবমুখর পরিবেশÑসব মিলিয়ে এটি একটি লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। নগরায়ণ ও আধুনিকতার চাপে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রথযাত্রা এখনো মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সব ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদার সঙ্গে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা।

 

পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদেরও উচিত সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। ধর্মকে যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিভাজন বা বিদ্বেষের হাতিয়ার হতে না দেওয়া হয়।রথের চাকা ঘোরে। সেই চাকার ঘূর্ণনে লুকিয়ে আছে সময়ের দর্শন। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, উত্থান-পতনÑসবই জীবনের অংশ। তাই অহংকার নয়, বিনয়; বিভাজন নয়, ঐক্য; ঘৃণা নয়, ভালোবাসাÑএই মূল্যবোধই আমাদের ধারণ করতে হবে। রথযাত্রা আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা। যে সমাজে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সম্মান করে, অন্যের অধিকারকে নিজের দায়িত্ব মনে করেÑসেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য।

 

বৃহস্পতিবারের এই পবিত্র রথযাত্রা তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মশুদ্ধির আহ্বান, সামাজিক সংহতির বার্তা এবং মানবিকতার উৎসব। রথের চাকা যেমন অনন্ত গতির প্রতীক, তেমনি মানুষের বিবেকও যেন চিরজাগ্রত থাকে। বিশ্বাসের এই যাত্রা আমাদের নিয়ে যাক এমন এক সমাজের দিকে, যেখানে ধর্ম হবে সম্প্রীতির, মানুষ হবে মানুষের, আর বাংলাদেশ হবে বৈচিত্র্েযর মধ্যেও ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রথের দড়িতে হাত রাখা কেবল একটি আচার নয়; এটি প্রতীকীভাবে সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারই হোক এবারের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী