রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?
গত প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় রুপির বিপরীতে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশি টাকা। একসময় ১০০ ভারতীয় রুপি কিনতে যেখানে প্রায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১২৭ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে। ২১ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১ ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ছিল প্রায় ১ টাকা ২৭ পয়সা।
অর্থাৎ, একই পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা নিয়ে এখন আগের তুলনায় বেশি ভারতীয় রুপি পাওয়া যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাচ্ছেন ভারতগামী বাংলাদেশিরা; বিশেষ করে রোগী, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা।
তবে এর পেছনে শুধু বাংলাদেশের টাকার শক্তিশালী হওয়া কাজ করছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় রুপির দুর্বলতাও বড় একটি কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জানুয়ারি ২০২৬-এর শেষ দিকে ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে আগের অর্থবছরের জুনের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ দুর্বল হয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের টাকা ডলারের বিপরীতে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ফলে দুই দেশের মুদ্রার পারস্পরিক বিনিময় হারে বাংলাদেশের টাকা সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে।
এক বছরে বড় পরিবর্তন
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১ ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ছিল প্রায় ১ টাকা ৩৭ থেকে ১ টাকা ৪০ পয়সার মধ্যে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে আসে প্রায় ১ টাকা ৩৪–৩৬ পয়সায়। আর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তা আরও নেমে এসেছে প্রায় ১ টাকা ২৭ পয়সায়।
অর্থাৎ, ভারতীয় মুদ্রায় খরচ করা বাংলাদেশিদের জন্য বিনিময় হার এখন আগের তুলনায় বেশ অনুকূল।
একটি সহজ হিসাব করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। কারও ভারতে গিয়ে ১ লাখ রুপি খরচ হলে, প্রতি রুপি ১ টাকা ৪০ পয়সা দরে তার প্রয়োজন হতো প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এখন ১ টাকা ২৭ পয়সা হিসাবে একই ১ লাখ রুপি কিনতে লাগবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ব্যবধান প্রায় ১৩ হাজার টাকা।
অবশ্য বাস্তবে ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ বা কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয় ব্যবধান, কমিশন ও অন্যান্য চার্জ থাকে। তাই বাজারের ঘোষিত হার আর একজন ভ্রমণকারীর প্রকৃত খরচ এক নাও হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি স্বস্তি চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের
ভারতে বাংলাদেশিদের যাতায়াতের বড় একটি কারণ চিকিৎসা। কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, ভেলোর, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে যান।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালের বিল নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, হোটেল, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াত; সবকিছুর জন্য ভারতীয় রুপি প্রয়োজন হয়। ফলে রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হলে পুরো ভ্রমণ ব্যয়ের ওপরই তার প্রভাব পড়ে।
ধরা যাক, কোনও রোগী ও তার পরিবার চিকিৎসা ও অন্যান্য কাজে ২ লাখ রুপি খরচ করবেন। ১ রুপি ১ টাকা ৪০ পয়সা হলে শুধু মুদ্রা বিনিময়েই খরচ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একই ২ লাখ রুপি এখন ১ টাকা ২৭ পয়সা হিসাবে কিনতে প্রয়োজন প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ, বিনিময় হারের পার্থক্যেই প্রায় ২৬ হাজার টাকা কম লাগতে পারে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই সাশ্রয় কম নয়।
পর্যটকদের জন্যও সুখবর
চিকিৎসার পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশিদের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। কলকাতা, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, দিল্লি, আগ্রা, কাশ্মীর, গোয়া কিংবা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।
রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় হোটেল, খাবার, পরিবহন ও কেনাকাটায় একই পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চার-পাঁচজনের একটি পরিবারের কয়েক দিনের ভ্রমণে বিপুল পরিমাণ রুপি প্রয়োজন হয়। বিনিময় হারে সামান্য পরিবর্তনও তখন মোট ব্যয়ে কয়েক হাজার টাকা পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ব্যয়ও কমতে পারে
ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের টিউশন ফি, বাসা বা হোস্টেল ভাড়া এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের একটি বড় অংশ রুপিতে পরিশোধ করতে হয়।
রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী থাকলে শিক্ষার্থীদের পরিবারকে একই পরিমাণ রুপি কিনতে তুলনামূলক কম টাকা ব্যয় করতে হবে। ফলে বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহনকারী পরিবারগুলোর ওপর কিছুটা চাপ কমতে পারে।
সুবিধা পেতে পারেন আমদানিকারকরাও
বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার ভারত। দেশটি থেকে শিল্পের কাঁচামাল, তুলা, সুতা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য আমদানি হয়।
ভারতীয় রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হলে রুপিতে মূল্য নির্ধারিত পণ্যের আমদানি ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী সরাসরি রুপিতে লেনদেন করেন, তারা এর তাৎক্ষণিক সুবিধা পেতে পারেন।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সব আমদানি সরাসরি রুপিতে নিষ্পত্তি হয় না। অনেক লেনদেন ডলারভিত্তিক। ফলে রুপির বিপরীতে টাকার শক্তিশালী হওয়ার সুফল সব আমদানিতে একইভাবে পড়বে না।
বেনাপোল, ভোমরা, হিলি ও আখাউড়াসহ সীমান্তকেন্দ্রিক বাণিজ্যেও মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতীয় বাজার থেকে পণ্য কেনা বা স্থানীয় পর্যায়ে রুপির লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা অনুকূল বিনিময় হারে সুবিধা পেতে পারেন।
তবে এই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, শুল্ক, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের ওপর। অর্থাৎ, রুপির দাম কমেছে বলেই ভারত থেকে আসা সব পণ্যের দাম কমে যাবে; এমন নিশ্চয়তা নেই।
কেন এমন হলো?
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে গত এক বছরে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, রিজার্ভও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগস্টের প্রথম ২৯ দিনেই এসেছে ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আগস্ট ২০২৬ শেষে মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। ফলে দুই দেশের মুদ্রার আপেক্ষিক শক্তির পার্থক্য বাংলাদেশের টাকাকে রুপির বিপরীতে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখেও ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯৫ দশমিক ৮২ রুপিতে লেনদেন শেষ করেছে।
এটাকে কি শুধু ‘টাকার শক্তি’ বলা যাবে?
রুপির বিপরীতে টাকার দাম বাড়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সব দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে গেছে। এটি মূলত দুই মুদ্রার পারস্পরিক বিনিময় হার। একটি মুদ্রা স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি অন্যটি দুর্বল হলেও আপেক্ষিকভাবে প্রথম মুদ্রা শক্তিশালী দেখাতে পারে।
তাই রুপির বিপরীতে টাকার বর্তমান অবস্থানকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার সঙ্গে দেখা গেলেও এটিকে অর্থনীতির সামগ্রিক শক্তির একক সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
রফতানিতে বিপরীত প্রভাবের ঝুঁকি
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সহজভাবে বললে, বাংলাদেশি টাকার মান শক্তিশালী হলে এক টাকায় আগের তুলনায় বেশি ভারতীয় রুপি পাওয়া যায়। ফলে ভারতে ১০০ রুপি দামের কোনও পণ্য কিনতে আগে যে পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা প্রয়োজন হতো, এখন তার চেয়ে কম টাকা লাগবে। এতে ভারত থেকে পণ্য আমদানির প্রাথমিক খরচ কমার সুযোগ তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, তবে আমদানি ব্যয় কমলেই বাজারে পণ্যের দাম একই হারে কমবে; এমন নয়। কারণ পণ্যের দামের সঙ্গে শুল্ক, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ এবং ব্যবসায়ীর মুনাফা যুক্ত থাকে। ফলে বিনিময় হারের সুবিধার পুরোটা ভোক্তা পর্যায়ে নাও পৌঁছাতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ভারতীয় রুপির বিপরীতে টাকার মান শক্তিশালী হলে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভ্রমণের ব্যয়ও তুলনামূলক কমে আসে। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। বাংলাদেশি টাকা শক্তিশালী হলে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে। এতে কিছু পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে গেলে সেসব পণ্যের আমদানি বাড়তে পারে। এতে একদিকে ভোক্তারা কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগ পেলেও অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারেন। তাই বিনিময় হার নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি আমদানি-রফতানির ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভারতগামী বাংলাদেশিদের জন্য বর্তমান বিনিময় হার স্বস্তির। চিকিৎসা, পর্যটন, শিক্ষা ও কিছু ধরনের ব্যবসায় এর সরাসরি আর্থিক সুবিধা রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা কতদিন থাকবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের মুদ্রার ভবিষ্যৎ গতিপথ, ডলারের আন্তর্জাতিক মূল্য, তেলের দাম, রেমিট্যান্স, রফতানি আয় এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতার ওপর।









