লবণাক্ততার আগ্রাসন ও দুর্যোগ: উপকূলে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর
মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে একসময় মাটির তৈরি দেওয়াল আর খড়ের ছাউনির ঘরই ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান আশ্রয়। কৃষি-নির্ভর এই জনপদে যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে এই মাটির ঘরেই বাস করত। তবে ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র পর থেকে মাটির ঘর নির্মাণ এ অঞ্চলে নেই বললেই চলে। আইলার পর বুলবুল, আম্পান, ইয়াসের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলের মাটি ও মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়ে গেছে। জলোচ্ছ্বাসের লোনা পানি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় সংকুচিত হয়েছে কৃষিজমি, আর তাতেই হারিয়ে যেতে বসেছে উপকূলের চিরচেনা এই মাটির ঘর।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলের বেলে-দোঁয়াশ ও এঁটেল মাটি মিশিয়ে ম- তৈরি করা হতো। এরপর হাতের সুনিপুণ কারুকাজে মাটির ‘চাফ’ (দলা) কেটে ধাপে ধাপে তৈরি হতো ঘরের মজবুত দেওয়াল। কিন্তু ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির দেওয়াল ধসে আসবাবপত্র নষ্ট হওয়া এবং শিশুসহ মানুষ চাপা পড়ার ঘটনার পর থেকে এই ঘরের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমতে থাকে। এর ওপর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাটির সংকট। চিংড়ি ঘেরের কারণে লোনা পানি ঢুকে টপ-সয়েলের (মাটির উপরিভাগ) বুনট নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে ঘর তৈরির উপযোগী আঠালো মাটি এখন আর পাওয়াই যায় না।
উপকূলের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্বকালিনগর গ্রামে এখনো কোনোমতে টিকে আছে একটি মাটির ঘর। ঘরের কারিগর কৃষক শ্যামাপদ বৈদ্য বলেন, “এখন আর মাটির ঘর চোখেই পড়ে না। অথচ ২০-২৫ বছর আগে পৌষ থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত মাটির দেওয়াল তৈরির কাজে আমাকে দিন-রাত ব্যস্ত থাকতে হতো। এই ঘরগুলোতে খরচ কম, আরাম বেশি। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হলেও ভেতরে সহজে টের পাওয়া যেত না। এখনকার বেড়ার ঘরে সামান্য বাতাসেই বুক কাঁপে। আগেকার মাটির উঁচু ঘর চোর-ডাকাতদের থেকেও নিরাপদ ছিল।”
শ্যামাপদ বৈদ্যের স্ত্রী কৃষ্ণা রানী বৈদ্য বলেন, “আইলার আগে আমাদের তিনটি মাটির ঘর ছিল, সব ভেঙে গেছে। এবার খরচ ও পরিশ্রম কমাতে শুধু গোয়ালঘরটা আবার মাটি দিয়েই তৈরি করছি। বছরে একবার গোবর-মাটি দিয়ে লেপে দিলেই এক বছর চলে যায়।”
স্থানীয় শিক্ষক মনোজিৎ কর্মকার বলেন, “আগে গ্রামে প্রায় সব ঘরই ছিল মাটির। মানুষ তখন শান্তিতে থাকত, রোগবালাই কম ছিল। মাটির ঘর তৈরির জন্য গ্রামে কিছু লোকায়ত জ্ঞানসম্পন্ন প্রবীণ মানুষ ছিলেন। বছরের শুরুতে পৌষ-মাঘ মাসে কৃষিজমির বিশেষ মাটি তুলে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নেওয়া হতো। মাটি পেটানো, শুকানো আর ধাপে ধাপে দেওয়াল তুলতে তিন-চার মাস সময় লেগে যেত।” তিনি আফসোস করে বলেন, মাটির ঘরের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসের ব্যবহারও এখন বিলুপ্তির পথে।
বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার নীরব বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “উপকূলে মাটির ঘর ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ঐতিহ্য। একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে থাকার ঘর, গোয়াল ঘর, খড় রাখার ঘরÑসবই মাটির তৈরি হতো। এগুলো ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে থাকার প্রতীক। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভস্থ এবং উপরিভাগের পানি ও মাটি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে পড়েছে, যা মাটির স্বাভাবিক আঠালো বুনট নষ্ট করে দিয়েছে। মাটি ও পানির সংকটে এ অঞ্চলের কুমারদের পেশাও বদলে যাচ্ছে।”
শাহিন ইসলাম আরও বলেন, উপকূলে লবণ পানির এই আগ্রাসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রুখতে না পারলে শুধু মাটির ঘরই নয়, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকেও টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।









