লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত আশাশুনি: পরীক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবীদের চরম দুর্ভোগ
আশাশুনি সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়া ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরবরাহ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গরমের তীব্রতার মধ্যে বিদ্যুতের এই সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
উপজেলার কুল্যা, খাজরা, বুধহাটা, আনুলিয়া, প্রতাপনগর, দরগাপুর ও শোভনালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দিনে-রাতে মিলিয়ে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও একটানা ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে নেমে আসে চরম অস্বস্তি। আবার বিদ্যুৎ এলেও ভোল্টেজ এত কম থাকে যে ফ্যান ঘোরে ধীরগতিতে, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো চলে না।
বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা চলমান থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বেড়েছে বহুগুণ। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে চোখের সমস্যা ও মানসিক চাপ বাড়ছে। খাজরা এলাকার এক শিক্ষার্থী জানায়, “রাতে যখন পড়তে বসি, তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। আবার কখন আসবে তারও নিশ্চয়তা নেই। এতে করে পড়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।”
অভিভাবকরাও বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাঁদের মতে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আশাশুনি একটি কৃষিনির্ভর এলাকা হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে কৃষিতে। বর্তমানে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য সেচের প্রয়োজনীয় সময়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, যা খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের পরিমাণ কমে আসছে।
বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কারিগরি পেশাজীবীরাও। ওয়েল্ডিং, রাইস মিল, আইসক্রিম কারখানা, ফ্রিজনির্ভর দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। অপর দিকে ইজি বাইক, ব্যাটারি চালিত ভ্যান শ্রমিকরা পড়েছে বিপাকে। তার ঠিকমত তাদের পরিবহন চার্জ করতে না পারায় আত্মমানবেতর ভিতর দিদয়ে জীবন যাপন করছে। শোভনালী বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানে কাস্টমারও কম আসে। ফ্রিজের জিনিস নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
এছাড়া সেলুন, মোবাইল সার্ভিসিং ও কম্পিউটার দোকানগুলোর কাজও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে করে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্করা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। অনেকেই ঘুমাতে পারছেন না, ফলে শারীরিক অসুস্থতা বাড়ছে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহেও বিঘœ ঘটছে, কারণ অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে পানি তোলা হয়। স্থানীয় এক গৃহিণী বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে পানি ওঠে না। রান্না-বান্না সবকিছুতেই সমস্যা হয়। ছোট বাচ্চারা গরমে কষ্ট পাচ্ছে।”
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ঘাটতি ও চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই লোডশেডিং হচ্ছে। আশাশুনি এলাকায় ১৬/১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎের চাহিদা থাকলেও ৭/৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একাধিক বাসিন্দা বলেন, “যদি নির্দিষ্ট সময় জানানো থাকত, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারতাম। এখন হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।”
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, অন্তত পরীক্ষার সময় এবং সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বা সহনীয় মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট লোডশেডিং সূচি প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ও কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। অন্যথায় শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হবে।









