সম্পাদকীয়/গ্রামীণ শিক্ষা ও আলো ছড়ানোর অনন্য বাতিঘর
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে ১৯৮৮ সালে গড়ে ওঠা ‘খান নাজমুল পাবলিক লাইব্রেরি’ কেবল একটি বইয়ের ঘর নয়; এটি এক অবিনাশী আলোর বাতিঘর। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যখন মানুষ ক্রমশ পর্দানির্বাহক ডিজিটাল নির্ভরতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে কাঠের আলমারিতে বন্দি বইয়ের গন্ধ আর পাতার শব্দে এই লাইব্রেরিটি ধরে রেখেছে ঐতিহ্যবাহী পাঠাভ্যাস। এটি আজ আর কেবলই একটি নীরব পাঠকেন্দ্র নয়, বরং এলাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
একটি স্থানীয় উদ্যোগ কীভাবে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এই লাইব্রেরি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি, যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল প্রদান এবং শিক্ষার সরঞ্জাম বিতরণ করে প্রতিষ্ঠানটি যে মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একটি গ্রামীণ সমাজে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় ধরে রাখতে এমন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের গুণীজনদের ভূয়সী প্রশংসা প্রমাণ করে এর সমাজ বিনির্মাণের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী।
আজকের এই ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে যখন তরুণেরা মোবাইল স্ক্রিনে নিমগ্ন এবং পাঠাগারভিত্তিক জ্ঞানচর্চা সংকটের মুখে, তখন এমন একটি গ্রামীণ লাইব্রেরির টিকে থাকা ও সক্রিয় ভূমিকা রাখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে কোনো মহান উদ্যোগকে স্থায়ী ও আরো বেগবান করতে কেবল ব্যক্তি বা স্থানীয় প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এই জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রটিকে যুগোপযোগী অবকাঠামো, পর্যাপ্ত নতুন বইয়ের সংস্থান এবং ডিজিটাল ক্যাটালগ ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অতি জরুরি।
কপোতাক্ষের তীরের এই লাইব্রেরিটি প্রমাণ করেছে, আলোর ঠিকানা তৈরি করতে বিশাল অট্টালিকার প্রয়োজন হয় না; সদিচ্ছা ও ভালোবাসাই যথেষ্ট। স্থানীয় এই উদ্যোগটি টিকে থাকুক, এর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক নদীঘেরা বাংলার প্রতিটি প্রান্তে।









