সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: মাছের ঘেরের আইল এক নতুন সম্ভাবনা
মাছের ঘেরের পাড় বা আইলÑযা একসময় ফেলে রাখা হতো পরিত্যক্ত জায়গা হিসেবেÑআজ তা ধারণ করেছে এক নতুন সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির রূপ। সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় শত শত কৃষকের হাত ধরে সমন্বিত এই চাষ পদ্ধতি কেবল কৃষি অর্থনীতিতেই নতুন মাত্রা যোগ করেনি, বরং প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে এক টেকসই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একই জমিতে নিচের পানিতে মাছ এবং উপরের মাচায় বিষমুক্ত সবজি চাষের এই সমন্বিত মডেল এখন সারা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি ভাবনায় নতুন পথের দিশারি হতে পারে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতার দরুন কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। তবে তালা উপজেলার নগরঘাটা, সরুলিয়া ও খলিষখালীর কৃষকেরা সেই চ্যালেঞ্জকে নতুন সুযোগে রূপান্তর করেছেন। ঘেরের আইলে মাচা পদ্ধতিতে লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, খিরাই, তরমুজ ও শাকসবজি চাষ করে একদিকে যেমন তারা বাজারজাতকরণে বাড়তি লাভ পাচ্ছেন, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। অল্প খরচে মাচা তৈরি করে কয়েক গুণ বেশি লাভের এই হিসাব প্রমাণ করে যে সঠিক প্রয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটালে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর সম্ভব।
এই সমন্বিত ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। অনাবাদি জায়গাগুলো সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি চাষের খরচও কমে আসছে বহুগুণে। তদুপরি, পানির সময়সীমা শেষে একই জমিতে ধানের চাষ করার যে ধারাবাহিকতা কৃষকেরা বজায় রাখছেন, তা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে এ সাফল্যকে কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় যেভাবে মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরামর্শ প্রদান করছে, এই প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা দরকার। সমন্বিত এই চাষাবাদ পদ্ধতিকে টেকসই রূপ দিতে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। যেমনÑ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য প্রারম্ভিক মূলধন (যেমন—মাচা তৈরির উপকরণ, উন্নত জাতের বীজ ও নেট) সরবরাহে ব্যাংক ও স্থানীয় কৃষি ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ দিতে হবে। পচনশীল সবজি দ্রুত এবং সঠিক দামে বিক্রির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন ব্যবস্থা ও আধুনিক সংসংরক্ষণাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে। বিষমুক্ত সবজির যে সুখ্যাতি তালার কৃষকেরা তৈরি করেছেন, তা ধরে রাখতে জৈব বালাইনাশক ও আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করতে হবে।
সাতক্ষীরার তালার কৃষকেরা প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে পতিত জমি থেকেও সোনা ফলানো সম্ভব। তাঁদের এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঘেরের আইলে সবজি চাষের এই ‘তালা মডেল’ আগামীতে দেশের প্রান্তিক কৃষির ভাগ্যবদলের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।









