আশাশুনিতে বিলীন মাঝির নৌকা:নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা কপোতাক্ষ-খোলপেটুয়া নদীতে পালতোলার সেই দৃশ্য
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি নামটি উচ্চারণ করলেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত নদী, খাল-বিল আর নৌকার ব্যস্ততা। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া বেতনা, মরিচ্চাপসহ অসংখ্য নদী-খালের সঙ্গে মানুষের জীবন ছিল নিবিড়ভাবে জড়িত। একসময় এ জনপদের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান বাহন ছিল মাঝির নৌকা। গ্রামের ঘাট থেকে বাজার, হাট থেকে বাড়ি কিংবা রোগী নিয়ে হাসপাতালÑসব পথেরই যেন শেষ ঠিকানা ছিল কোনো না কোনো নৌঘাট। ভোরের আলো ফুটতেই নদীর ঘাটে শুরু হতো নৌকার ব্যস্ততা। মাঝির বৈঠার ছন্দে নদীর পানি কেটে নৌকা এগিয়ে যেত গন্তব্যের দিকে। কখনো অনুকূল বাতাস পেলে নৌকায় পাল উঠত। বাতাসে ফুলে ওঠা সাদা পাল আর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে নৌকার দুলুনি ছিল এক অপরূপ দৃশ্য। সন্ধ্যার নরম আলোয় নদীর বুক দিয়ে পালতোলা নৌকা চলে যাওয়ার সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই স্মৃতি।আশাশুনির বুধহাটা, কুল্যা, শোভনালী, বড়দল, প্রতাপনগর, আনুলিয়া, খাজরা, শ্রীউলা, আশাশুনি সদরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনে একসময় নৌকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বর্ষাকালে অনেক গ্রাম হয়ে উঠত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। তখন নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান ভরসা। কৃষকের ধান, ব্যবসায়ীর পণ্য, জেলেদের মাছ কিংবা বাজারের প্রয়োজনীয় সামগ্রীÑসবই নৌকায় পরিবহন করা হতো।শুধু যাতায়াত নয়, জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও মাঝির নৌকা ছিল মানুষের শেষ আশ্রয়। রাত-বিরাতে অসুস্থ রোগীকে নৌকায় তুলে নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে নিতে হতো। প্রসূতি নারী থেকে শুরু করে মুমূর্ষু রোগীÑঅনেকের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই নৌকার গল্প। কখনো সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছে বেঁচেছে প্রাণ, আবার কখনো দীর্ঘ নৌযাত্রার কারণে পথেই ঘটেছে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু।প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভাসে সেই দিনের কথা। ঘাটে দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকছেন মাঝিÑ‘নৌকা ছাড়ব, আর কেউ যাবেন?’ কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে ছুটছেন, কেউবা রোগী নিয়ে ঘাটে এসে মাঝির সাহায্য চাইছেন। মাঝিরাও ছিলেন মানুষের আপনজনের মতো। নদীর স্রোত, জোয়ার-ভাটা, আবহাওয়া ও নৌপথ সম্পর্কে তাঁদের ছিল গভীর অভিজ্ঞতা।কিন্তু সময় বদলেছে। গ্রাম থেকে শহর, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা সদরে সড়ক যোগাযোগ বেড়েছে। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে। মানুষের হাতে এসেছে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান, অটোরিকশাসহ নানা ধরনের যানবাহন। ফলে নৌকার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমেছে। একই সঙ্গে অনেক খাল-নদী নাব্যতা হারিয়েছে। কোথাও পলি জমেছে, কোথাও দখল-দূষণে সংকুচিত হয়েছে জলপথ। ফলে মাঝির নৌকাও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। একসময় যে ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকত, সেখানে এখন অনেক জায়গায় নেই সেই চেনা দৃশ্য। বৈঠার ছন্দের বদলে শোনা যায় মোটরযানের শব্দ। নদীর বুক দিয়ে পালতোলা নৌকা যাওয়ার দৃশ্য নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এখন গল্পের মতো।প্রবীণ এক মাঝির ভাষায়, ‘আগে নৌকা চালিয়েই সংসার চলত। মানুষ আমাদের ডাকত, ঘাটে অপেক্ষা করত। এখন মানুষের হাতে গাড়ি হয়েছে, নৌকার দরকার পড়ে না। নদী আছে, কিন্তু আগের মতো নৌকা নেই।’ তবে মাঝির নৌকা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি বাহনের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পেশা, একটি জীবনধারা এবং একটি নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। মাঝিদের গান, বৈঠার শব্দ, ঘাটের আড্ডা, যাত্রী ওঠানামার ব্যস্ততাÑসবকিছুই এখন অতীতের অংশ।আশাশুনির নদী ও খালগুলোকে পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন করে নৌযান চলাচলের উপযোগী করা গেলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী নৌকা সংরক্ষণ করে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পালতোলা নৌকা, নৌকাবাইচ কিংবা ঐতিহ্যবাহী নৌভ্রমণ পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।নদী এখনো আছে, জোয়ার-ভাটাও আছে। শুধু আগের মতো নেই মাঝির বৈঠার ছন্দ। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়Ñআশাশুনির নদীর বুকে কি আবার কখনো দেখা যাবে পালতোলা নৌকার সারি? নাকি মাঝির নৌকা চিরতরেই থেকে যাবে প্রবীণদের স্মৃতি আর গল্পের পাতায়?






