মো. মামুন হাসান
সুন্দরবনকে আমরা কতভাবে দেখি। কেউ দেখেন প্রকৃতির বিস্ময় হিসেবে, কেউ দেখেন জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার হিসেবে, কেউ দেখেন জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জীবিকার জায়গা হিসেবে। আবার পর্যটকের চোখে সুন্দরবন হলো নদী, বন, বন্যপ্রাণী আর অপার সৌন্দর্যের এক অসাধারণ পৃথিবী। কিন্তু সুন্দরবনকে আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা দরকার।
সেটি হলো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ। বিশেষ করে সাতক্ষীরার জন্য সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়, এটি হতে পারে হাজারো তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।
সাতক্ষীরার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন বহু বছর ধরে প্রকৃতি ও জীবিকার নানা সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানকার মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। কৃষি ও প্রচলিত জীবিকার ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা কোথায় কাজ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের সম্পদের দিকে তাকাতে হবে। আর সেখানে সুন্দরবন একটি বড় সম্ভাবনার নাম।
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষের আয় কতটা বাড়ছে। একজন পর্যটক যখন একটি এলাকায় আসেন, তখন শুধু একটি নৌযান বা একটি হোটেল আয় করে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, খাবার, গাইড, নৌকার মাঝি, হোটেল কর্মী, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় দোকানদার, হস্তশিল্পী, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অর্থাৎ পর্যটকের ব্যয় যদি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একজন পর্যটক বহু মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারেন। এখানেই সাতক্ষীরার জন্য বড় সুযোগ।
সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চাকরি পাওয়া নয়, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, ওয়াইল্ডলাইফ গাইড, বার্ড ওয়াচিং গাইড, নৌপর্যটন কর্মী, হোটেল ম্যানেজার, ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, রেস্টুরেন্ট কর্মী, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল কনসালট্যান্ট, ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, ডিজিটাল মার্কেটার, দোভাষী, পর্যটন নিরাপত্তাকর্মী এবং পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীর চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর বাইরেও রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার অসংখ্য সুযোগ। কেউ সুন্দরবনভিত্তিক ট্যুর প্যাকেজ তৈরি করতে পারেন। কেউ হোমস্টে চালু করতে পারেন। কেউ স্থানীয় খাবারের ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেন। কেউ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারেন। কেউ পর্যটকদের জন্য ছবি ও ভিডিও তৈরির সেবা দিতে পারেন। অর্থাৎ পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।
সাতক্ষীরার বাস্তবতায় পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব মানুষের প্রচলিত জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তাদের জন্য বিকল্প জীবিকা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।একজন জেলে পর্যটন নৌযানের দক্ষ কর্মী হতে পারেন। একজন স্থানীয় যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে গাইড হতে পারেন। একজন নারী পর্যটকদের জন্য স্থানীয় খাবার তৈরি করে আয় করতে পারেন। একটি পরিবার বাড়ির একটি অংশকে হোমস্টেতে রূপান্তর করতে পারে। এভাবে পর্যটন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে পারে। এটি শুধু দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগ নয়। এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে।
দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো মানুষের হাতে স্থায়ী আয়ের সুযোগ তুলে দেওয়া।সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ পর্যটনের অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে যদি স্থানীয় খাবার খান, স্থানীয় গাইড নেন, স্থানীয় নৌযানে ভ্রমণ করেন, স্থানীয় হোমস্টেতে থাকেন এবং স্থানীয় পণ্য কেনেন, তাহলে তার ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মানুষের কাছে থেকে যায়। এখানে তৈরি হয় একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র। পর্যটক আসবেন, স্থানীয় সেবা নেবেন, স্থানীয় মানুষ আয় করবেন, সেই আয় আবার স্থানীয় বাজারে ব্যয় হবে। এই চক্র যত বড় হবে, স্থানীয় অর্থনীতিও তত শক্তিশালী হবে।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ জনবল। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এখানেই নতুন সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করতে পারে। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা শিক্ষা একজন তরুণকে পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে। হোটেল পরিচালনা, ফ্রন্ট অফিস, খাদ্য ও পানীয় সেবা, অতিথি আপ্যায়ন, ট্যুর অপারেশন, পর্যটন বিপণনসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে কলমে দক্ষতা অর্জন করে একজন শিক্ষার্থী দেশ ও বিদেশের পর্যটন খাতে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। কিন্তু সাতক্ষীরার ক্ষেত্রে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ শিক্ষার্থীরা এমন একটি অঞ্চলে বাস করে, যেখানে তাদের চারপাশেই রয়েছে সুন্দরবন, নদী, গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং অসংখ্য পর্যটন সম্ভাবনা। অর্থাৎ তাদের জন্য পর্যটন শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। এটি তাদের নিজেদের এলাকার বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
একজন পর্যটক কোথাও যাওয়ার আগে অনলাইনে ছবি দেখেন, ভিডিও দেখেন, রিভিউ পড়েন, থাকার জায়গা খোঁজেন এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা করেন। এই পরিবর্তন সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য বিশাল সুযোগ। সুন্দরবনের গল্প, স্থানীয় খাবার, নৌযাত্রা, পাখি, বন্যপ্রাণী, গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে তরুণরা তথ্যভিত্তিক ভিডিও তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরদের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং করতে পারেন। এমনকি সুন্দরবনকেন্দ্রিক অনলাইন বুকিং ও তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। একজন তরুণের হাতে একটি স্মার্টফোন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলেই এখান থেকে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলে যেতে পারে।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সুফল শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। স্থানীয় নারীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পরিবারের আয় বাড়বে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও হবে। নারীরা স্থানীয় খাবার, পিঠা, হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, শুঁটকি, মধু ও অন্যান্য পণ্য পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে পারেন। হোমস্টে, ক্যাটারিং, স্থানীয় খাবারের ব্র্যান্ড, হস্তশিল্প এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় নারীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ফলে পর্যটন একটি পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামোও বদলে দিতে পারে।
আগামী দিনের পর্যটন হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে তাই শুধু প্রচলিত চাকরি নয়, গ্রিন জবের বাজারও তৈরি করতে হবে। পর্যটন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব নৌযান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পর্যটকদের পরিবেশ সচেতন করার কাজে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এখানে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন দক্ষতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পণ্য ও সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মধু, গোলপাতার তৈরি পণ্য, শুঁটকি, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্পসহ নানা পণ্যকে সুন্দরবন ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। একজন পর্যটক সুন্দরবন দেখতে এসে যদি সুন্দরবনের গল্প সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন একটি পণ্যের মাধ্যমে, তাহলে পর্যটন ও স্থানীয় উৎপাদনের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি হবে।
সাতক্ষীরায় তরুণদের জন্য সুন্দরবনভিত্তিক একটি ট্যুরিজম ইনকিউবেটর গড়ে তোলা যেতে পারে। এখানে তরুণরা পর্যটন ব্যবসার ধারণা নিয়ে আসবে, প্রশিক্ষণ নেবে, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে এখান থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন প্রজন্মের পর্যটন উদ্যোক্তা।
তবে উন্নয়নের নামে সুন্দরবনের ক্ষতি করা যাবে না। সুন্দরবনকে ব্যবহার করে পর্যটন নয়, সুন্দরবনকে রক্ষা করেই পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুন্দরবন নষ্ট হলে পর্যটনের সম্ভাবনাও নষ্ট হবে। আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত।
কখনো কখনো ভবিষ্যৎ আমাদের নিজের মাটিতেই অপেক্ষা করে। সুন্দরবনের সবুজের ভেতরে সেই ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে। আজ যে তরুণ চাকরির জন্য শহরের পথে পা বাড়াচ্ছেন, আগামীকাল তিনিই হতে পারেন সুন্দরবনের দক্ষ ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা, হোটেল ম্যানেজার, নৌপর্যটন ব্যবসায়ী, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা কিংবা পরিবেশবান্ধব পর্যটন উদ্যোগের সফল উদ্যোক্তা। তাই সুন্দরবনকে শুধু রক্ষা করার কথা বললেই হবে না। সুন্দরবনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে হবে।কারণ বন বাঁচবে তখনই, যখন বনসংলগ্ন মানুষের জীবনও নিরাপদ হবে। সাতক্ষীরার যুবকদের দক্ষ করে তুলতে পারলে সুন্দরবন হতে পারে তাদের কর্মসংস্থানের নতুন ঠিকানা। সুন্দরবন হতে পারে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক ঢাল। সুন্দরবন হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন পথ।
সুন্দরবন হতে পারে স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির বিশাল ক্ষেত্র।আর সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ হতে পারে সেই পরিবর্তনের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখনই সময় সুন্দরবনের সম্ভাবনাকে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা শক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার। কারণ সুন্দরবন শুধু সাতক্ষীরার প্রকৃতির অহংকার নয়, সুন্দরবন হতে পারে সাতক্ষীরার তরুণদের ভবিষ্যতের ঠিকানা।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।