বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩

সাতক্ষীরা হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ক্লাইমেট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ক্লাইমেট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন

মো. মামুন হাসান

বিশ্বের পর্যটন মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় মানুষ ভ্রমণে যেত শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে, ইতিহাস জানতে কিংবা অবসর কাটাতে। এখন নতুন এক প্রবণতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে, যার নাম ক্লাইমেট ট্যুরিজম। মানুষ জানতে চায় জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে। তারা দেখতে চায় অভিযোজনের গল্প, টিকে থাকার গল্প, সংগ্রামের গল্প।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতে পারে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্লাইমেট ট্যুরিজমের কেন্দ্র কোথায় হতে পারে? উত্তরটি হতে পারে সাতক্ষীরা। কারণ সাতক্ষীরা কেবল একটি জেলা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের একটি উন্মুক্ত পাঠশালা। শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ কিংবা উপকূলীয় জনপদগুলোতে গেলে দেখা যায়, মানুষ প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন সমঝোতা করছে। কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি। আবার একই সঙ্গে দেখা যায় নতুন কৃষি পদ্ধতি, বিকল্প জীবিকা, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্ভাবনী উদ্যোগ। গবেষণাগুলো বলছে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এখানকার মানুষ অভিযোজনের নানা কৌশল তৈরি করেছে। পর্যটনের ভাষায় এটি একটি বিরল সম্পদ।

বিশ্বের অনেক দেশ আজ জলবায়ু শিক্ষা পর্যটনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং উন্নয়নকর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ করছেন। সাতক্ষীরা চাইলে এই বাজারের নেতৃত্ব দিতে পারে। ভাবুন, একজন বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন দেখতে এলেন। তিনি শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গল্প শুনলেন না, বরং স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানলেন কীভাবে একটি পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের পর জীবন পুনর্গঠন করেছে। কীভাবে নারীরা ম্যানগ্রোভ রোপণ করে উপকূল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। কীভাবে একটি গ্রাম লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার উপকূলে নারীদের নেতৃত্বে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা কোনো বিনোদন পার্ক দিতে পারে না। আর এখানেই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় শক্তি।আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জলবায়ু দুর্যোগের জেলা হিসেবে উপস্থাপন করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের দৃষ্টিতে সংকটও একটি শিক্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। বিশ্বের অসংখ্য গবেষক আজ সুন্দরবনকে জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের পর্যটন পরিকল্পনায় “দেখার জায়গা” থেকে “শেখার জায়গা” ধারণায় যেতে হবে। সাতক্ষীরায় ক্লাইমেট ট্রেইল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটকরা উপকূলীয় জীবন, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু শিক্ষা ভ্রমণ চালু করতে পারে। স্থানীয় তরুণদের ক্লাইমেট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নারীনেতৃত্বাধীন পর্যটন উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পর্যটন মডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে স্থানীয় মানুষ। সুন্দরবনের পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং পর্যটন অবকাঠামো ও তথ্যসেবার উন্নয়ন পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে।

আজ পৃথিবী এমন গন্তব্য খুঁজছে, যেখানে শুধু প্রকৃতি নয়, ভবিষ্যতের গল্পও দেখা যায়।সাতক্ষীরা সেই গল্পের নাম হতে পারে। যে জেলা একসময় জলবায়ু ঝুঁকির প্রতীক ছিল, সেই জেলাই আগামী দিনে জলবায়ু সহনশীল পর্যটনের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের সাহসী উদ্যোগ। সম্ভবত সময় এসেছে সাতক্ষীরাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার।দুর্যোগের জেলা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একটি জীবন্ত শ্রেণিকক্ষ হিসেবে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

তালায় বীমার নামে ২৫ লক্ষ টাকার আত্মসাতের প্রতিবাদে মানববন্ধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
তালায় বীমার নামে ২৫ লক্ষ টাকার আত্মসাতের প্রতিবাদে মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিনিধি: তালা সদর ইউনিয়নের সংরক্ষিত ৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য সাহিদা বেগমের বিরুদ্ধে বীমার নামে ১শত ৮ জনের ২৫লক্ষ টাকার আত্মসাতের অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ভুক্তোভোগী পরিবার। এসময় ভুক্তোভোগীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানা পুলিশ, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেল ৪টায় উপজেলার ডাঙ্গা নলতা মাঝারপাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ডাঙ্গানলতা, জাতপুর, আটরাই, খানপুর, জেয়ালা ও আশপাশের এলাকার শতাধিক ভুক্তভোগী অংশগ্রহণ করেন। পপুলার হেলথ এন্ড এডুকেশন সঞ্চয় ও ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বক্তরা হলেন, কতুব উদ্দীন মাহমুদ, নুর আলি শেখ, পীর আলি শেখ, কালাম মাহামুদ, আরিজুল মালি, জহিরুল ইসলাম, জিহাদ মালি, নীলিমা বেগম, সুফিয়া বেগম, পারভীন, সুফিয়া রশিদা, রিজিয়া,সোরাইয়া, মুক্তা প্রমুখ।
সমাবেশ ও মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন তালা সদর ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য, জামায়াতে ইসলামীর মহিলা রোকন, পরলোভী, অর্থ আত্মসাতকারী সাহিদা বেগম পপুলার হেলথ এন্ড এডুকেশন সঞ্চয় ও ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন ও অধিক মুনাফার আশ্বাস দিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে সদস্য করেন। পরে প্রায় ১০৮ জন সদস্যের কাছ থেকে সঞ্চয় ও বীমার নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিষ্ঠানটির বীমা প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। কিন্তু বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ৮ থেকে ৯ বছর অতিবাহিত হলেও তারা তাদের জমাকৃত টাকা ও প্রাপ্য মুনাফা ফেরত পাননি। বারবার টাকা ফেরতের জন্য যোগাযোগ করা হলেও নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও জানান, দিনমজুরির আয়, ভ্যান চালানোর উপার্জন, ডিম বিক্রির টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসার লাভ এবং প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো অর্থসহ কষ্টার্জিত সঞ্চয় ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও অর্থ ফেরত না পেয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
বক্তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে সাহিদা বেগম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করে স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাংক চেক প্রদান করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি অর্থ পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তরা আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সাতক্ষীরা জেলা আমীর, উজেলা আমীর, ইউনিয়ন আমীরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার এবং ভুক্তভোগীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তারা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য শাহিদা বেগমের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন আমি খুলনা থেকে বাড়িতে আসছি। গাড়িতে থাকায় কিছু শোনা যাচ্ছেনা বলে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ।

বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী

প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ আমাদের সবার দায়িত্ব। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক হোন, এই আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক নৈতিকতার দাবি।
আদিকাল থেকে নিপীড়ন থকে বাঁচতে অনেকে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। শরণার্থীর বেঁচে থাকার এবং নিরাপদে আশ্রয় খোঁজার মৌলিক মানবাধিকার রয়েছে। তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ না করে সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করা আমাদের নৈতিক ও বৈশ্বিক দায়িত্ব। বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ এবং সহিংসতার কারণে নিজের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথম বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বরের আগে দিবসটি আফ্রিকা শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো। ১৯৫১ সালে শরণার্থীদের স্বীকৃতির বিষয়ে জাতিসংঘের সনদ গৃহীত হয়।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে আসা এই মানুষগুলোর জন্য খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজ নিজ অবস্থান থেকে শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে অন্যদের উৎসাহিত করা। বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে এমন বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোকে সহায়তা বা অনুদান প্রদান করতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে শরণার্থীদের সংখ্যা। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ আন্তর্জাতিক শরণার্থী। ক্রমবর্ধমান এই বাস্তুচ্যুতির বিপরীতে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর-এর তহবিল ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শরণার্থী তীব্র খাদ্য সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখই শিশু। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়ে ৬ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ সংঘাতের কারণে নিজ দেশের ভেতরেই গৃহহীন হয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কেবল লেবাননেই ১০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও, ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও মারাত্মক করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের প্রায় ৭৩ ভাগ নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করায় তারা খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার চরম সংকটে ভুগছেন। এর ওপর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিল কাটছাঁট হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ শরণার্থীই ৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে, যা শরণার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এই সংকট উত্তরণে জাতিসংঘ ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মূল চাবিকাঠি হলো শরণার্থীদের স্থানীয় কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
পৃথিবীর প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন বর্তমানে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বিপন্ন শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুতির সামগ্রিক সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বিশ্বব্যাপী চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ সাত দেশের অধিবাসী। সে গুলো হলো- সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ফিলিস্তিন, সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া। যাদের প্রায় সবাই মুসলিম।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে শিশু ৪০ শতাংশ (৪ কোটি ৪৯ লাখ) এবং শরণার্থীর সংখ্যা ৩ কোটি ৬৮ লাখ। আর বিশ্বে শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে থাকা মানুষের ৬৯ শতাংশের উৎস ৫ দেশ। এই ৫ দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে ৬২ লাখ, সিরিয়া থেকে ৬০ লাখ, আফগানিস্তান থেকে ৫৮ লাখ, ইউক্রেন থেকে ৫১ লাখ ও দক্ষিণ সুদান থেকে ২৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৭ শতাংশ শরণার্থী অবস্থান করছে ৫টি দেশে। এর মধ্যে ইরানে রয়েছে ৩৫ লাখ, তুর্কিতে রয়েছে ৩৩ লাখ, কলম্বিয়াতে রয়েছে ২৮ লাখ, জার্মানিতে ২৭ লাখ ও উগান্ডায় রয়েছে ১৮ লাখ। প্রতি বছর শরণার্থী হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ২৩ লাখ শিশু। মোট শরণার্থীর ৭৩ শতাংশের আশ্রয়দাতা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত দেশ এবং ৬৭ শতাংশ শরণার্থীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ।
শরণার্থী প্রসঙ্গে দুটি বিষয় কাজ করে। একটি অতিত বা পুরোনো, আরেকটি এখনও চলমান। ১৯৭১ সালে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু হয়। আরাকানে সৃষ্ট রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের দলগত আগমন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের প্রচেষ্টা অব্যাহত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
শরণার্থী সংকট সমাধানে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ হলো নারী ও শিশু, যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদকীয়/অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও নিয়মিত দুর্ভোগ: সমাধান কোথায়?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও নিয়মিত দুর্ভোগ: সমাধান কোথায়?

গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহ আর আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরমে সাতক্ষীরা জেলার জনজীবন বর্তমানে এক চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার কয়েক লাখ গ্রাহকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয়। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের এই বিশাল ঘাটতি কেবল যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলছে তা নয়, বরং স্থবির করে দিচ্ছে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিকে।
বিদ্যুৎ সংকটের এই ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রচ- গরমে একদিকে যেমন রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে মোমবাতি কিংবা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতে হয়, তখন তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কেবল গৃহস্থালি ভোগান্তিই নয়, এই বিদ্যুৎ বিপর্যয় সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের আঘাত হানছে। জেলার অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ভোমরা স্থলবন্দর ও কাস্টমস হাউস। বর্তমানের শতভাগ অনলাইননির্ভর দাপ্তরিক যুগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট ও কম্পিউটার বন্ধ থাকছে। ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ফাইল তদারকি ও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ঘন ঘন ভোল্টেজ ওঠানামা করায় সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ির ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনই কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকার কারণেই তারা এলাকাভিত্তিক ‘ফিডার’ ধরে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা বুঝি, জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু এই তীব্র গরমে দিনের পর দিন এভাবে একটি উৎপাদনশীল জেলাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
আমরা মনে করি, সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই জেলায় বিদ্যুতের বরাদ্দ অবিলম্বে বাড়ানো প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতীয় গ্রিড থেকে সাতক্ষীরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে, লোডশেডিং যদি দিতেই হয়, তবে তা যেন সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত সূচি মেনে দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা মানসিকভাবে এবং কর্মক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেন। আমরা আশা করি, বিদ্যুৎ বিভাগ স্রেফ ‘চেষ্টা চলছে’ আশ্বাসের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দ্রুততম সময়ে সাতক্ষীরাবাসীকে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেবে।