সাতক্ষীরা হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ক্লাইমেট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন
মো. মামুন হাসান
বিশ্বের পর্যটন মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় মানুষ ভ্রমণে যেত শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে, ইতিহাস জানতে কিংবা অবসর কাটাতে। এখন নতুন এক প্রবণতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে, যার নাম ক্লাইমেট ট্যুরিজম। মানুষ জানতে চায় জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে। তারা দেখতে চায় অভিযোজনের গল্প, টিকে থাকার গল্প, সংগ্রামের গল্প।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতে পারে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্লাইমেট ট্যুরিজমের কেন্দ্র কোথায় হতে পারে? উত্তরটি হতে পারে সাতক্ষীরা। কারণ সাতক্ষীরা কেবল একটি জেলা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের একটি উন্মুক্ত পাঠশালা। শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ কিংবা উপকূলীয় জনপদগুলোতে গেলে দেখা যায়, মানুষ প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন সমঝোতা করছে। কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি। আবার একই সঙ্গে দেখা যায় নতুন কৃষি পদ্ধতি, বিকল্প জীবিকা, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্ভাবনী উদ্যোগ। গবেষণাগুলো বলছে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এখানকার মানুষ অভিযোজনের নানা কৌশল তৈরি করেছে। পর্যটনের ভাষায় এটি একটি বিরল সম্পদ।
বিশ্বের অনেক দেশ আজ জলবায়ু শিক্ষা পর্যটনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং উন্নয়নকর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ করছেন। সাতক্ষীরা চাইলে এই বাজারের নেতৃত্ব দিতে পারে। ভাবুন, একজন বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন দেখতে এলেন। তিনি শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গল্প শুনলেন না, বরং স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানলেন কীভাবে একটি পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের পর জীবন পুনর্গঠন করেছে। কীভাবে নারীরা ম্যানগ্রোভ রোপণ করে উপকূল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। কীভাবে একটি গ্রাম লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার উপকূলে নারীদের নেতৃত্বে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা কোনো বিনোদন পার্ক দিতে পারে না। আর এখানেই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় শক্তি।আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জলবায়ু দুর্যোগের জেলা হিসেবে উপস্থাপন করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের দৃষ্টিতে সংকটও একটি শিক্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। বিশ্বের অসংখ্য গবেষক আজ সুন্দরবনকে জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের পর্যটন পরিকল্পনায় “দেখার জায়গা” থেকে “শেখার জায়গা” ধারণায় যেতে হবে। সাতক্ষীরায় ক্লাইমেট ট্রেইল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটকরা উপকূলীয় জীবন, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু শিক্ষা ভ্রমণ চালু করতে পারে। স্থানীয় তরুণদের ক্লাইমেট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নারীনেতৃত্বাধীন পর্যটন উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পর্যটন মডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে স্থানীয় মানুষ। সুন্দরবনের পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং পর্যটন অবকাঠামো ও তথ্যসেবার উন্নয়ন পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে।
আজ পৃথিবী এমন গন্তব্য খুঁজছে, যেখানে শুধু প্রকৃতি নয়, ভবিষ্যতের গল্পও দেখা যায়।সাতক্ষীরা সেই গল্পের নাম হতে পারে। যে জেলা একসময় জলবায়ু ঝুঁকির প্রতীক ছিল, সেই জেলাই আগামী দিনে জলবায়ু সহনশীল পর্যটনের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের সাহসী উদ্যোগ। সম্ভবত সময় এসেছে সাতক্ষীরাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার।দুর্যোগের জেলা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একটি জীবন্ত শ্রেণিকক্ষ হিসেবে।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












