বুধবার, ৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সাতক্ষীরা হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ক্লাইমেট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ক্লাইমেট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন

মো. মামুন হাসান

বিশ্বের পর্যটন মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় মানুষ ভ্রমণে যেত শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে, ইতিহাস জানতে কিংবা অবসর কাটাতে। এখন নতুন এক প্রবণতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে, যার নাম ক্লাইমেট ট্যুরিজম। মানুষ জানতে চায় জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে। তারা দেখতে চায় অভিযোজনের গল্প, টিকে থাকার গল্প, সংগ্রামের গল্প।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতে পারে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্লাইমেট ট্যুরিজমের কেন্দ্র কোথায় হতে পারে? উত্তরটি হতে পারে সাতক্ষীরা। কারণ সাতক্ষীরা কেবল একটি জেলা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের একটি উন্মুক্ত পাঠশালা। শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ কিংবা উপকূলীয় জনপদগুলোতে গেলে দেখা যায়, মানুষ প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন সমঝোতা করছে। কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি। আবার একই সঙ্গে দেখা যায় নতুন কৃষি পদ্ধতি, বিকল্প জীবিকা, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্ভাবনী উদ্যোগ। গবেষণাগুলো বলছে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এখানকার মানুষ অভিযোজনের নানা কৌশল তৈরি করেছে। পর্যটনের ভাষায় এটি একটি বিরল সম্পদ।

বিশ্বের অনেক দেশ আজ জলবায়ু শিক্ষা পর্যটনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং উন্নয়নকর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ করছেন। সাতক্ষীরা চাইলে এই বাজারের নেতৃত্ব দিতে পারে। ভাবুন, একজন বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন দেখতে এলেন। তিনি শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গল্প শুনলেন না, বরং স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানলেন কীভাবে একটি পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের পর জীবন পুনর্গঠন করেছে। কীভাবে নারীরা ম্যানগ্রোভ রোপণ করে উপকূল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। কীভাবে একটি গ্রাম লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার উপকূলে নারীদের নেতৃত্বে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা কোনো বিনোদন পার্ক দিতে পারে না। আর এখানেই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় শক্তি।আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জলবায়ু দুর্যোগের জেলা হিসেবে উপস্থাপন করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের দৃষ্টিতে সংকটও একটি শিক্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। বিশ্বের অসংখ্য গবেষক আজ সুন্দরবনকে জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের পর্যটন পরিকল্পনায় “দেখার জায়গা” থেকে “শেখার জায়গা” ধারণায় যেতে হবে। সাতক্ষীরায় ক্লাইমেট ট্রেইল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটকরা উপকূলীয় জীবন, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু শিক্ষা ভ্রমণ চালু করতে পারে। স্থানীয় তরুণদের ক্লাইমেট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নারীনেতৃত্বাধীন পর্যটন উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পর্যটন মডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে স্থানীয় মানুষ। সুন্দরবনের পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং পর্যটন অবকাঠামো ও তথ্যসেবার উন্নয়ন পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে।

আজ পৃথিবী এমন গন্তব্য খুঁজছে, যেখানে শুধু প্রকৃতি নয়, ভবিষ্যতের গল্পও দেখা যায়।সাতক্ষীরা সেই গল্পের নাম হতে পারে। যে জেলা একসময় জলবায়ু ঝুঁকির প্রতীক ছিল, সেই জেলাই আগামী দিনে জলবায়ু সহনশীল পর্যটনের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের সাহসী উদ্যোগ। সম্ভবত সময় এসেছে সাতক্ষীরাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার।দুর্যোগের জেলা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একটি জীবন্ত শ্রেণিকক্ষ হিসেবে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

সম্পাদকীয়/ বাঁশদাহার কয়ারবিল ব্রিজ কি সংস্কার হবে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ বাঁশদাহার কয়ারবিল ব্রিজ কি সংস্কার হবে

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁশদাহা ইউনিয়নের কয়ারবিল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজটির বর্তমান বেহাল দশা কেবল স্থানীয় সড়ক যোগাযোগের অব্যবস্থাপনাই ফুটিয়ে তোলে না, বরং তা জননিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিজটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অথচ অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া চরম উদ্বেগজনক।

কয়ারবিলের এই সড়কটি মূলত কলারোয়া উপজেলার সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে শত শত মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। বর্তমানে ব্রিজের ভেঙে যাওয়া অংশে বাঁশ, কাঠ, ইটের রাবিশ আর মাটির বস্তা দিয়ে কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে যাতায়াত সচল রাখা হয়েছে। একটি ব্যস্ততম গ্রামীণ সড়কের প্রধান ব্রিজে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও আদিম উপায়ে চলাচল সচল রাখা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তা স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতারও বহিঃপ্রকাশ। এই নড়বড়ে সেতুটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানি কিংবা মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এই অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ। কয়ারবিল অঞ্চল থেকে ধান, সবজি ও মাছের মতো পচনশীল পণ্য জেলা শহরের বাজারে নেওয়ার একমাত্র পথ এটি। ব্রিজের এই জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে কৃষকদের বাধ্য হয়ে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তাঁদের পরিবহন খরচ ও সময় দুই-ই বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী রোগীদের দুর্ভোগের তো কোনো সীমাই নেই।

সামনে বর্ষা মৌসুম। ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে পানির তোড়ে এবং অতিরিক্ত চাপে জরাজীর্ণ এই ব্রিজের বাকি অংশটুকুও ধসে পড়ার আশঙ্কা শতভাগ। তেমনটি ঘটলে আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে।

আমরা মনে করি, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সচলতা বজায় রাখা যেকোনো স্থানীয় সরকারের প্রথম কাজ। কয়ারবিল ব্রিজের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার পর টনক নড়ার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বর্ষা পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই অতি দ্রুত এই স্থানে একটি নতুন ও স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জরুরি ও সর্বোচ্চ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

 

 

তালায় স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ণ
তালায় স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত

তালা প্রতিনিধি: তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের হরিহরনগর (মুড়াগাছা) গ্রামে এক স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাত খানের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হরিহরনগর গ্রামের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে একই গ্রামের সবুজ গাজীর (২৪) বিয়ের আয়োজন চলছেÑএমন খবর পায় ‘রিইব’-এর তালা উপজেলা সিএসও কমিটির এক সদস্য। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা প্রথমে কনের বাড়িতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

পরে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাত খানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় স্থানীয় খেশরা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম লাল্টু, ইউপি সদস্য, খেশরা ক্যাম্প পুলিশ এবং গ্রামের লোকজনের উপস্থিতিতে বাল্যবিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মেয়ের বাবার কাছ থেকে একটি মুচলেকা নেওয়া হয়।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও জেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক নাজমুন নাহার অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে একটি স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের আগেই গতকাল সকালে সাতক্ষীরার এক নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ওই স্কুলছাত্রীর সঙ্গে সবুজ গাজীর কাগজের কলমে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল।

 

কাদার নিচে সোনা-রুপা খোঁজা একজন নাজিমের গল্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ণ
কাদার নিচে সোনা-রুপা খোঁজা একজন নাজিমের গল্প

রনজিত বর্মন, সুন্দরবনাঞ্চল (শ্যামনগর): সকাল হলেই কাঁধে চেপে বসে এক টুকরো অনিশ্চয়তা আর আশা। মেঠো পথ, আধা পাকা রাস্তা কিংবা পিচ ঢালা পথ ধরে হেঁটে চলেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অলিতে-গলিতে ঘুরে চড়া গলায় জানান দেন নিজের উপস্থিতির কথাÑপুকুর বা জলাশয়ে হারিয়ে যাওয়া সোনা-রুপার গহনা খুঁজে দেওয়াই তাঁর কাজ।

এই মানুষের নাম নাজিম মাহমুদ (৪০)। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার গোয়ালিমান্দ্রা গ্রামের মর্তুজা আলীর ছেলে তিনি। তবে এখন তাঁর ঠিকানা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার সংযোগস্থল মৌতলা এলাকায়। সেখানে একটি ছোট ঘর তৈরি করে বাস করছেন। পরিচয় দেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে।

বাপদাদার চৌদ্দ পুরুষের এই আদি পেশাকেই নিজের জীবিকা বানিয়েছেন নাজিম। অথচ ইচ্ছে ছিল অন্য রকম। পড়াশোনা শিখে কোনো ভদ্রস্থ চাকরি করবেন। সেই লক্ষ্যে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে অর্থাভাবে পড়ালেখা আর এগোয়নি। অগত্যা ২০০৬ সাল থেকে বাবার হাত ধরে নেমে পড়েন এই হারানো গহনা খোঁজার পেশায়।

নাজিম জানান, কাজ শুরু করার আগে রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম গুরু ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি মো. রাহিন। এরপর থেকে একা একাই দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, মোংলা, বরগুনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে কাজ করেছেন। আয়ের সুবিধার জন্য বেদে সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণত এলাকা ভাগ করে নেন।

কাজের ধরনটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। একটি শক্ত লাঠির মাথায় চিরুনির মতো লোহার আঁচড়া আর একটি টিনের হুঁচাÑএই হলো নাজিমের অস্ত্র। পুকুর বা জলাশয়ে কোনো গহনা হারিয়ে গেলে, ভুক্তভোগী মানুষের দেওয়া বর্ণনামতে পানিতে নেমে পড়েন তিনি। লোহার আঁচড়া দিয়ে নরম কাদা-মাটি আর আবর্জনা টেনে তোলেন টিনের হুঁচায়। তারপর তা ধুয়ে-মুছে নিখুঁতভাবে খুঁজতে থাকেন। এভাবেই কাদার নিচ থেকে বেরিয়ে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই সোনা বা রুপার গহনা।

পারিশ্রমিক কেমন মেলে? নাজিম জানান, উদ্ধার হওয়া গহনার ওজনের ওপর ভিত্তি করে মজুরি ঠিক করা হয়। সাধারণত হারানো জিনিসের মূল্যের একটি নির্দিষ্ট শতকরা অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। একটি সোনার কানের দুল খুঁজে পেলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার কম মজুরি হয় না। অনেকে খুশি হয়ে বেশি টাকাও বকশিশ দেন। এভাবে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। বিভিন্ন দেওয়ালে বা দর্শনীয় স্থানে নিজের মোবাইল নম্বরটিও লিখে রাখেন তিনি, যাতে দরকারে মানুষ সহজে খুঁজে পায়। এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষের হারিয়ে যাওয়া গহনা উদ্ধার করেছেন তিনি।

তবে এই কাজে ঝুঁকিও কম নয়। পানিতে জোঁকের কামড় তো আছেই, পুরানো ভাঙা ঘাটের নিচে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা কেটে যায় প্রায়ই। গভীর পানিতে বারবার ডুব দেওয়ার কারণে চোখ ও কানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দিনভর হেঁটে চলার ক্লান্তি তো বোনাস।

নাজিম আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন। দিন দিন পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বাথরুমের চল বাড়ায় এখন মানুষ আর পুকুরে গোসল করতে গিয়ে গহনা হারায় না। সোনার দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষের এর ব্যবহারও কমেছে। ফলে আয় কমে যাওয়ায় পরিবার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ও বেদে সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।