বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

সামাজিক পর্যটন: ভ্রমণের অধিকার থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সামাজিক পর্যটন: ভ্রমণের অধিকার থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে

মো: মামুন হাসান

পর্যটনকে আমরা সাধারণত অবকাশ যাপন, বিনোদন কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে পর্যটনের ধারণা অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে। এটি এখন কেবল ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় সামাজিক পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মূল দর্শন হলো, ভ্রমণ কেবল বিত্তবানদের বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সমাজের সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি মানবিক অধিকার।

 

বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্প যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে এই উন্নয়নের সুফল কি সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, তা নয়। নিম্ন আয়ের পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পর্যটন এখনো অনেকাংশে অধরাই রয়ে গেছে। ফলে পর্যটনের যে আনন্দ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তি, তা সমাজের একটি বড় অংশ থেকে কার্যত বঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক পর্যটনের ধারণা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপে সামাজিক পর্যটনের বিকাশ মূলত কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তখন উপলব্ধি করা হয় যে, কর্মজীবী মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, পর্তুগালসহ বহু দেশে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী এবং প্রবীণদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত ভ্রমণ কর্মসূচি চালু করা হয়। এর সুফল ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, অন্যদিকে পর্যটন শিল্পও সারা বছর সচল থেকেছে। মৌসুমি পর্যটনের সীমাবদ্ধতা কমেছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন প্রাণ পেয়েছে।

 

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সামাজিক পর্যটনের গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগোলেও অবকাশ ও ভ্রমণের সুযোগ এখনো জনসংখ্যার একটি বড় অংশের নাগালের বাইরে। অনেক পরিবার আছে, যারা জীবনে কখনো সমুদ্র দেখেনি, পাহাড়ে যায়নি কিংবা দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পায়নি। এটি শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নয়; বরং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একটি বৈষম্যের প্রতিফলন।

 

অথচ বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সামাজিক পর্যটন বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, চরাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ জনপদকে কেন্দ্র করে স্বল্প ব্যয়ের সামাজিক পর্যটন কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক ভ্রমণ, শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ অবকাশ প্যাকেজ, প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবান্ধব পর্যটন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে পর্যটন হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

 

সামাজিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সামাজিক প্রভাব। একটি দেশের নাগরিক যখন নিজের দেশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়, তখন তার মধ্যে জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়। এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় সংহতি শক্তিশালী হয়। ভ্রমণ মানুষকে কেবল নতুন স্থান দেখায় না; এটি নতুন চিন্তা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। নগরজীবনের চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্রমণকে বিলাসিতা নয়, বরং মানবিক সুস্থতার একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামাজিক পর্যটন সেই সুযোগকে আরও বিস্তৃত ও গণমুখী করতে পারে।

 

তবে সামাজিক পর্যটন বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিগত স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার পর্যটন উন্নয়ন নীতিতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিবহন ও আবাসনে বিশেষ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সামাজিক পর্যটন তহবিল গঠনে অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে স্বল্প ব্যয়ের কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে।

 

বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে আলোচনায় সাধারণত অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু পর্যটনের একটি মানবিক ও সামাজিক মাত্রাও রয়েছে, যা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। সামাজিক পর্যটন সেই উপেক্ষিত মাত্রাটিকেই সামনে নিয়ে আসে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং সুযোগের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনও।

 

ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে, মনকে উদার করে এবং সমাজকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। তাই সামাজিক পর্যটনকে কেবল পর্যটন নীতির একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। যে সমাজ তার সকল নাগরিককে দেশকে জানার, দেখার এবং অনুভব করার সুযোগ দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী সমাজে পরিণত হতে পারে।

মো: মামুন হাসান, শিক্ষক ও কলাম লেখক।

Ads small one

সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

তারিক ইসলাম

‎‘সুন্দরবন’—নামটির সঙ্গে গভীর রক্তের টান যেন ‘সুন্দরী’ গাছের। যে বৃক্ষের সমৃদ্ধি আর বিশালতায় টিকে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মূল সৌন্দর্য ও পরিচয়, সেই সুন্দরী গাছই আজ আক্রান্ত এক মরণব্যাধিতে। বনজুড়ে চলছে গাছগুলোর নীরব বিদায়ের করুণ সুর। কেবল পাতা আর ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া নয়, মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে মূল কাণ্ড পর্যন্ত। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নতুন চারা গজানোর হারও। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র যে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সুন্দরী গাছের এই অসুস্থতা তারই এক মারাত্মক বার্তা।

‎সম্প্রতি সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০২৪–২৫ সালে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবীক্ষণ’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন ‘আগামরা’ বা ‘টপ-ডাইং’ (Top-Dying) রোগে আক্রান্ত। সব মিলিয়ে আক্রান্ত গাছের আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি গাছ গুরুতরভাবে মরে যাওয়ার মুখোমুখি।

‎পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ পরিচালনায় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারসহ বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণায় এই ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে।

‎সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রধান বৃক্ষ যখন একযোগে রোগাক্রান্ত হয়, তখন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমস্যা থাকে না; পুরো বনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের নোনা পানির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব মিলেই সুন্দরী গাছের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সুন্দরবনের মিষ্টি পানি ও মৃদু লবণাক্ত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকায় মাটির বায়ুসঞ্চালন কমছে, যা গাছগুলোর গোড়া ও কাণ্ডকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও পলি জমার কারণে বন নিজের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে।

‎

‎সুন্দরবন কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে বছরের পর বছর বুক দিয়ে বাংলাদেশকে আড়াল করে রেখেছে এই ম্যানগ্রোভ বন। আর সেই বনের মূল কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ সুন্দরী গাছ যদি একে একে উজাড় হয়ে যায়, তবে গোটা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ দুর্লভ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

‎

‎সুন্দরবনের এই নীরব আর্তনাদ আর উপেক্ষা করার সময় নেই। সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার:

‎

‎১. মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার: উজান থেকে সুন্দরবনমুখী নদ-নদীগুলোতে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আন্তঅঞ্চলীয় ও জাতীয় পানিসম্পদ নীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

‎

‎২.পলি নিরসন ও নদী-খাল খনন: বনের অভ্যন্তরীণ যে নদ-নদী ও খালগুলো পলি ভরাট হয়ে মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।

‎

‎৩.রোগ প্রতিরোধে জোরালো গবেষণা: আগামরা রোগের সঠিক জীবাণু বা অণুজীব শনাক্ত করে তা থেকে সুন্দরী গাছকে রক্ষায় বন অধিদপ্তর এবং বিজ্ঞানীদের সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

‎

‎৪.সুরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা ও নজরদারি: বনের যেসব এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নতুন চারা উৎপাদন ও বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

‎

‎সুন্দরবন ছাড়া আমাদের মানচিত্রের এক বিরাট অংশকে কল্পনা করা যায় না, আর সুন্দরী গাছ ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির বিপন্নতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে হয়তো মানচিত্রে ‘সুন্দরবন’ নামটি থেকে যাবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার আসল রূপকার—আমাদের ‘সুন্দরী’।

‎লেখক : তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট
পত্রদূত ডেস্ক: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় দেশের প্রথম বর্জ্য রিসাইকেল প্ল্যান্টের পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে সবঠিক থাকলে ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে চালু হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে একইসঙ্গে মিলবে সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এটি পরিচালনার জন্য দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি এলজিইডি এবং কেসিসির যৌথ সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফাস্ট ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, এটি চলমান থাকবে।
তিনি বলেন, এটি চালাবে প্রফেশনাল প্রাইভেট অপারেটর। ইতোমধ্যে কোম্পানি নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি থেকে সার, জ্বালানি তেল ও বায়োগ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ, প্লান্টের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে চালু করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টের কম্পোস্ট ও পাইরোলাইসিস প্লান্টের যন্ত্রকৌশল ম্যাটারিয়ালস এ্যান্ড ম্যাটালোজিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে কারিগরি সহায়তার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিজ্ঞ পাঁচ প্রকৌশলীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি টিম। টিমের সদস্যরা প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণে গত ১ অক্টোবর খুলনায় আসেন। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরীক্ষা শেষে তারা ঢাকায় ফিরে যান।
টিমের সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. ইনসানুল করিম, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী একেএম শামসুল হুদা, প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী, সানইয়ার্ড গ্রুপ বর্তমানে ন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানুফাকচারিং কোঃ লিঃ-এর ডিএমডি প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল জব্বার, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী মোঃ আশরাফ উদ্দিন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) প্রাক্তন চিফ সাইন্টিফিক অফিসার ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল গফুর। প্রতিনিধি দলের চারজন বুয়েট এবং বাকি একজন চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। যারা সবাই শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট মেশিনারি ডিজাইনার।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করে মতামত প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প ম্যানেজার প্রকৌশলী পিন্টু মন্ডল। তিনি বলেন, প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি দল এসেছিলেন। তারা ২/৩ দিন এখানে ছিলেন। তাদের ক্লান্তির কারণে ৩৬ ঘণ্টা পাইরোলাইসিস করা হয়নি।
পাইরোলাইসিসের প্রসেস অনুযায়ী ৬ ঘণ্টা পর তেল আসা শুরুর ২/৩ ঘণ্টা মেশিন চালানোর পর বন্ধ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে পলিথিন এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের মধ্য থেকে ১০ লিটার তেল পরীক্ষার জন্য স্যারেরা ঢাকায় নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা করে মিটিং করে মতামত প্রকল্পের পরিচালক স্যারকে জানাবেন। প্রকল্পের পরীক্ষামূলক ফলাফল সফল হয়েছে বলা যায়।
এর আগে গত ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এরপর মেশিনারিজ সম্পূর্ণ সেট আপের পর শনিবার সকালে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যায়।
বিগত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শলুয়া বাজার-সংলগ্ন ১৭ একর জমিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তা। দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (সিআরডিপি-২)’র আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এটিতে অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, তিন ধরনের বর্জ্য থেকে তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হবে। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হবে জৈব সার, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক রিসাইকেল করে উৎপাদন করা হবে জ্বালানি তেল এবং কাঁচাবাজার থেকে সংগৃহীত বর্জ্য থেকে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ। অত্যাধুনিক পাইরোলাইসিস প্রযুক্তি ব্যবহারে বায়ু দূষণের কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন ২০ টন জৈব সার, ৪ হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং উৎপাদিত বায়োগ্যাস থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। উৎপাদিত তেল ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হবে। প্রতি ব্যাচ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগবে এক সপ্তাহ।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় স্থাপিত বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট আগামী ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে। একইসঙ্গে বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গায় আরও একটি বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ডে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার প্লান্টও শিগগিরই চালু হচ্ছে। এই তিনটি রিসাইক্লিং প্লান্ট চালু হলে মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার কয়রা উপজেলায় ভাগবা গ্রামের ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। ১২ অক্টোবর বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন ভাগবা গ্রামের  মোঃ আব্বাস গাজীর পুত্র ,মোঃ জিয়ারুল ইসলাম (২২), মোঃ মাসুদ সরদারের পুত্র মোঃ জাহিদুল ইসলাম (২০), মোঃ কেনা গাজীর পুত্র, মোঃ আব্দুল আলিম গাজী (২১), মোঃ শহিদুল গাজীর পুত্র মোঃ আলী হোসেন (২১),মোঃ আয়ুব আলী মোড়লের  পুত্র, মোঃ সিফাত হোসাইন (২৪), মোঃ নজরুল শেখের পুত্র মোঃ জাকারিয়া শেখ।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ রাশেদুল আলম জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া খেলায়  ১২ অক্টোবর ভাগবা গ্রাম থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। অনলাইন জুয়া মামলায় আসামিদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।