বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

সুন্দরবনকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যটনের নতুন স্বপ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যটনের নতুন স্বপ্ন

মো. মামুন হাসান
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি নৌযান। দুপাশে ঘন সবুজ গাছপালা, কেওড়া আর গরানের শ্বাসমূল পানির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে যেন প্রকৃতির নীরব প্রহরী হয়ে। দূরে কোথাও হরিণের ছুটে চলা, আকাশে সাদা বকের ঝাঁক, নদীর ঢেউয়ে লাল সূর্যের প্রতিফলন। এমন দৃশ্য পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। এই অপরূপ সৌন্দর্যের নাম সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি হতে পারে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতি নির্ভর পর্যটন কেন্দ্র। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখনই সময় আধুনিক, সৃজনশীল ও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণের।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটন আর শুধু ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ এখন অভিজ্ঞতা খোঁজে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনুভূতি খোঁজে, নতুন সংস্কৃতি জানতে চায়। সেই দিক থেকে সুন্দরবনের সম্ভাবনা অসীম। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু প্রচলিত পর্যটন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেভাবে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
মালদ্বীপ তাদের সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনকে ভার্চুয়াল ভ্রমণ ও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের দ্বীপ ও নদীভিত্তিক সৌন্দর্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরেছে যে পর্যটকেরা সেখানে যাওয়ার আগেই মুগ্ধ হয়ে যায়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও আধুনিক ভিডিও প্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক অনলাইন ভ্রমণ এবং ড্রোনচিত্র ব্যবহার করে এমন এক ডিজিটাল উপস্থাপনা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বিদেশি পর্যটক ঘরে বসেই বনের গভীর রহস্য অনুভব করতে পারবেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, নদীর আঁকাবাঁকা পথ, জেলেদের জীবন, মধু সংগ্রহ কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্য যদি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণায় সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়, তবে সুন্দরবনের প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সুন্দরবনের পর্যটনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা যেতে পারে নদীকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ভ্রমণের মাধ্যমে। নরওয়ে তাদের ফিয়র্ড অঞ্চল এবং ভিয়েতনাম তাদের হা লং উপসাগরকে আধুনিক নৌভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মংলা, শ্যামনগর কিংবা মুন্সিগঞ্জ থেকে আধুনিক পরিবেশবান্ধব নৌযান চালু করা যেতে পারে। সেই নৌযানে থাকবে আরামদায়ক কক্ষ, কাচঘেরা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবার, প্রশিক্ষিত গাইড এবং বনের ইতিহাস জানার সুযোগ। নদীর বুকের ওপর ভাসমান কটেজ কিংবা কাঠের নান্দনিক বিশ্রামকেন্দ্র তৈরি করা গেলে বিদেশি পর্যটকেরা প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা পাবেন।
একই সঙ্গে সুন্দরবনের মানুষের জীবনকেও পর্যটনের অংশ করতে হবে। ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সুন্দরবনেও মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটক গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটকেরা তখন শুধু বন দেখবেন না, তারা জানবেন এই বনের মানুষের জীবনসংগ্রাম, নদীর গল্প, মধু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা এবং লোকসংস্কৃতির কথা। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং পর্যটকরাও প্রকৃত সুন্দরবনকে অনুভব করতে পারবেন।
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে যেমন স্থানীয় বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি সাতক্ষীরা ও শ্যামনগর এলাকায় গ্রামীণ আবাসনভিত্তিক পর্যটনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কাঁকড়া, চিংড়ি, খেজুরের রস, গ্রামীণ খাবার, লোকগান কিংবা নদীপাড়ের সন্ধ্যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনকে গবেষণা ও শিক্ষাভিত্তিক পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রবালপ্রাচীর এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করতে যান। সুন্দরবনেও জলবায়ু পরিবর্তন, বাঘ সংরক্ষণ, নদী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে আরও উজ্জ্বল হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গলভিত্তিক পর্যটন এলাকাগুলোতে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা, বিশেষ নিরাপত্তা দল এবং আকাশপথে যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দ্রুত চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ নৌযান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহজ অনলাইন অনুমতির ব্যবস্থা চালু করা গেলে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরেছে। নিউজিল্যান্ডের পাহাড় ও বনভূমি যেমন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকর্ষণ করেছে, তেমনি সুন্দরবনের রহস্যময় সৌন্দর্যও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌ প্রতিযোগিতা, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র উৎসব কিংবা প্রকৃতি বিষয়ক সম্মেলনের আয়োজন করা গেলে সুন্দরবনের পরিচিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা। কোস্টারিকা ও আইসল্যান্ড পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনেও প্লাস্টিকমুক্ত ভ্রমণ, সৌরশক্তিচালিত নৌযান এবং সীমিত পর্যটক প্রবেশের মতো উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সুন্দরবনের প্রকৃতি রক্ষা করেই এর পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখা যায় না।
সুন্দরবন বাংলাদেশের শুধু একটি বন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সুন্দরবন একদিন এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা শুধু একটি বন দেখতে বাংলাদেশে আসবেন না, তারা আসবেন এক বিস্ময়কর জীবন্ত পৃথিবীকে অনুভব করতে। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার ১০টি জনগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মারাত্মক নদী ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের আবেদন জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। গত ১১ মে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এ সংক্রান্ত একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) প্রদান করেন তিনি।
ডিও লেটারে সাংসদ উল্লেখ করেন, আশাশুনি উপজেলা মারাত্মক নদী ভাঙনকবলিত এলাকা। টেকসই বাঁধের অভাবে অনেক জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আশাশুনি সদর, প্রতাপনগরের কুড়িকাউনিয়া ও হরিশখালি, আনুলিয়ার মনিপুর ও বিছট, বুধহাটা বাজার এলাকা এবং বড়দলের গোয়ালডাঙ্গাসহ ১০টি পয়েন্টে দ্রুত স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর আশা, এই আবেদন বাস্তবায়িত হলে তারা ভিটেমাটি হারানোর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন এবং দীর্ঘদিনের মানবেতর জীবনের অবসান ঘটবে।

একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

আসাদুজ্জামান সরদার: সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই, মেজ ছেলে শুভ দাসকে (২৫) লেবাননে পাঠিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চিতাভস্ম হওয়ার পথে। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন শুভ।
বুধবার সকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে সুরঞ্জনের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে ডুকরে কাঁদছেন মা শিখা দাস। একটি ভ্যানের উপর বসে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা সুরঞ্জন। তার পাশে বসে সান্ত¦না দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশি। প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়ে বাড়িটি শোকাতুর হয়ে উঠেছে। সবার চোখেমুখে একটাই আকুতিÑছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখা।
পেশায় ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস জানান, বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ভিটে হারিয়ে গত তিন বছর ধরে সপরিবারে এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় থাকছেন তিনি। প্রতি মাসে শুভ ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ আর ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা চলছিল।
বিলাপ করতে করতে মা শিখা রানী দাস বলেন, “সংসারের হাল ফেরাতে ছেলেটা বিয়েও করেনি। বলেছিল আরও কিছুদিন থেকে টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরে ঘর বাঁধবে। ভগবান কেন আমাদের কপাল পুড়িয়ে দিল? এখন ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর আমার মানিককেই বা কই পাব?”
শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। কান্নারত কণ্ঠে সে বলে, “রবিবার রাতে দাদার সাথে শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে পারেনি বলে দাদা খুব আফসোস করছিল। দাদাই আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাত। দাদাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এখন আমরা থাকব কোথায়? আমাদের পড়াশোনাই বা হবে কীভাবে?”
প্রতিবেশী সুমন দাস বলেন, শুভ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। এলাকার সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার এই অকাল মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
শুভসহ গত দুই দিনে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার মোট তিনজন প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় ইউপি মেম্বর শাহাদাত হোসেন বলেন, সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিনি এখন পরিবার নিয়ে থাকেন ধানের চাতালের ফেলে রাখা খুপড়ি ঘরে। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভ ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় মারা যাওয়ার খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শুভ’র মরদেহ যেন দেশে আনা হয়Ñআমরা সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি। একইসাথে এই অসহায় পরিবারটি যেন মাথা গোজার ঠাঁই পায় সে ব্যাপারেও সরকার যেন সহায়তা করেন।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সব ধরণের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অভাবের তাড়নায় যে ছেলেকে ভিনদেশে পাঠিয়েছিলেন সুরঞ্জন দাস, এখন সেই ছেলের নিথর দেহটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় কাটছে তাঁর প্রতিটি প্রহর। ঋণের বোঝা আর শোকÑদুইয়ের ভারে ন্যুব্জ এই পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

 

 

জনকল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহবান জেলা প্রশাসকের

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
জনকল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহবান জেলা প্রশাসকের

 

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বিশিষ্ঠজনসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করেছেন সাতক্ষীরায় নবাগত জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ। বুধবার উক্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভায় জেলার সার্বিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। নবাগত জেলা প্রশাসক উপস্থিত অতিথিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং জেলার উন্নয়ন ও জনকল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল, জেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক এড. সৈয়দ ইফতেখার আলী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ এর অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল হাসেম, সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বাসুদেব বসু, সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল, সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাসান হাদী, সদস্য শেখ মাসুম বিল্লাহ শাহীন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক আরাফাত হোসেন, সাবেক ফিফা রেফারি তৈয়েব হাসান বাবুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
সভায় বক্তারা জেলার উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে সরকারের ৫ মহাপরিকল্পনা বিষয়ে অপর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বলা হয়, “সবার আগে বাংলাদেশ, করবো কাজ, গড়বো দেশ”Ñএই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে একগুচ্ছ যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে সরকার। ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ দর্শনের আলোকে এসব অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে জেলা তথ্য অফিস আয়োজিত এক প্রেসব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরার নবাগত জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিনুর চৌধুরি প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জেলা তথ্য অফিসার মো. জাহারুল ইসলাম।
এতে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে বলা হয়Ñ প্রান্তিক ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে ডিজিটাল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এই কার্ডের বিশেষত্ব হলো, এটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে প্রদান করা হচ্ছে। গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কড়াইল বস্তি এলাকায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১৪টি ইউনিয়নের ৩৭ হাজার ৫৬৭টি হতদরিদ্র পরিবার প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। লক্ষ্য রয়েছে ৫ বছরে ৫০ লাখ গ্রামীণ পরিবারকে এই ডিজিটাল সুরক্ষার আওতায় আনার।
নদী ও খাল খনন বিষয়ে বলা হয়Ñপরিবেশ রক্ষা ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরুজ্জীবিত করেছে সরকার। আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী ও হাজারো খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হবে। সাতক্ষীরা জেলায় ইতোমধ্যে ৩৩টি খালের মধ্যে ৪টির খনন কাজ শেষ হয়েছে এবং ২৫টির কাজ চলমান রয়েছে।
সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় মোট ৩৩টি খাল খনন প্রকল্পের মধ্যে আছেÑ কামু খাল, কাটা খাল, কোলকাতলা খাল, খেজুরডাঙ্গা খাল, পুটিমারী খাল, পুটিমারী শাখা খালে, মজুমদার ও মজুমদার শাখা খাল, লেবুখালি খাল, নারায়নবাড়ি খাল, হেতালবুনিয়া খাল, কুড়িকাহুনিয়া, গেটের খাল, আই খাল, আইতলা খাল, চিত্রা খাল, হিমখালির খাল, ফারি খাল, খোসালখালি খাল, ধানখালি খাল, খলশিমুখো খাল, সোয়লিয়া খাল, হেতেলখালি খাল, গাবলাখালি খাল, খাশখামার খাল, দশ ফুটের খাল, কুমড়া খাল, কাটাখালি খাল, শ্যাম খাল, পাতাকাটা খাল, টুংগিরপুর খাল-০১, টুংগিরপুর খাল-০২, বসুখালি খাল ও বোয়ালমারি খাল।
এসব খালগুলো মধ্যে কামু খাল, কাটা খাল, পুটিমারী শাখা খালে, মজুমদার ও মজুমদার শাখা খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খালগুলোর মধ্যে কুড়িকাহুনিয়া, আইতলা খাল, গাবলাখালি খাল ও হিমখালির খাল খননের জন্য প্রস্তাবিত আকারে রয়েছে। বাকি খালগুলো খননের কাজ চলমান রয়েছে।
কর্মসূচিভুক্ত খালগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ কিলোমিটার। ইতোমধ্যে ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান জেলা তথ্য অফিসার। সভায় আরও জানানো হয়, ’সবুজ হোক দেশ, নির্মল হোক পরিবেশ’Ñস্লোগানে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৩ দশমিক ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’-এর মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার আধুনিক ব্যবস্থা চালু করছে সরকার।
জেলা তথ্য অফিসার বলেন, যাতায়াতে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বকীয়তা নিশ্চিত করতে বিআরটিসির মাধ্যমে বিশেষ বাস সার্ভিস চালু হচ্ছে। রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস এবং বিশেষায়িত নিরাপদ বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গণপরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বাসের চালক ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বেও থাকবেন নারীরা।
তিনি আরও বলেন, ”কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ”Ñএই চেতনায় দেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’-এর আওতায় আনার কাজ চলছে। গত ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলে এই সেবার উদ্বোধন করা হয়। কার্ডধারী কৃষকরা বছরে ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তাসহ সার, বীজ, সহজ শর্তে ঋণ ও শস্য বীমার মতো ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন।
সাতক্ষীরা জেলা তথ্য অফিস জানায়, সরকারের এসব উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে তৃণমূলের মানুষকে সচেতন করতে জেলাজুড়ে উঠান বৈঠক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মাইকিং ও ডিজিটাল প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তথ্য অফিস আয়োজিত উক্ত প্রেসব্রিফিংয়ে উপস্থিত হয়েও বসার জায়গা না পেয়ে প্রেস ব্রিফিং বর্জন করে কমপক্ষে ৬০ জন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিক।
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়নের আওতায় প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নিতে বুধবার সাড়ে এগারটার দিকে কমপক্ষে ৬০ জন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে যান। এসময় তাঁরা প্রায় সব হলুদ ও ভূইফোড় সাংবাদিকদের চেয়ার দখল করে বসে থাকতে দেখেন। এমতাবস্থায় নবাগত জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করেন। মুলধারার সাংবাদিকদের দাঁড়িয়ে রেখে তিনি ব্রিফিং শুরু করলে ‘বসার জায়গা না পেয়ে অগত্য সাংবাদিকরা সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন।’
এবিষয়ে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাসেম বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিস্তারিত জানতে খুবই আগ্রহ নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে গিয়েছিলাম। কিন্তু বসার জায়গা না পাওয়া ও জেলা প্রশাসকের অসৌজন্যমুলক আচরণে আমাদের চলে আসা ছাড়া পথ ছিলনা। ’
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমরা মূলধারার সাংবাদিকরা সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মকা-ের সকল খবর প্রচার করে আসছি।’
তিনি আরও বলেন, গত ১লা এপ্রিল বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের শ্যামনগর সফরের নিউজ মুলধারার সাংবাদিকরা সর্বোচ্চ কাভারেজ করেন। অথচ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখা যায়নি।