বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

সুন্দরবনকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যটনের নতুন স্বপ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যটনের নতুন স্বপ্ন

মো. মামুন হাসান
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি নৌযান। দুপাশে ঘন সবুজ গাছপালা, কেওড়া আর গরানের শ্বাসমূল পানির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে যেন প্রকৃতির নীরব প্রহরী হয়ে। দূরে কোথাও হরিণের ছুটে চলা, আকাশে সাদা বকের ঝাঁক, নদীর ঢেউয়ে লাল সূর্যের প্রতিফলন। এমন দৃশ্য পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। এই অপরূপ সৌন্দর্যের নাম সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি হতে পারে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতি নির্ভর পর্যটন কেন্দ্র। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখনই সময় আধুনিক, সৃজনশীল ও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণের।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটন আর শুধু ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ এখন অভিজ্ঞতা খোঁজে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনুভূতি খোঁজে, নতুন সংস্কৃতি জানতে চায়। সেই দিক থেকে সুন্দরবনের সম্ভাবনা অসীম। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু প্রচলিত পর্যটন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেভাবে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
মালদ্বীপ তাদের সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনকে ভার্চুয়াল ভ্রমণ ও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের দ্বীপ ও নদীভিত্তিক সৌন্দর্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরেছে যে পর্যটকেরা সেখানে যাওয়ার আগেই মুগ্ধ হয়ে যায়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও আধুনিক ভিডিও প্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক অনলাইন ভ্রমণ এবং ড্রোনচিত্র ব্যবহার করে এমন এক ডিজিটাল উপস্থাপনা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বিদেশি পর্যটক ঘরে বসেই বনের গভীর রহস্য অনুভব করতে পারবেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, নদীর আঁকাবাঁকা পথ, জেলেদের জীবন, মধু সংগ্রহ কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্য যদি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণায় সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়, তবে সুন্দরবনের প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সুন্দরবনের পর্যটনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা যেতে পারে নদীকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ভ্রমণের মাধ্যমে। নরওয়ে তাদের ফিয়র্ড অঞ্চল এবং ভিয়েতনাম তাদের হা লং উপসাগরকে আধুনিক নৌভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মংলা, শ্যামনগর কিংবা মুন্সিগঞ্জ থেকে আধুনিক পরিবেশবান্ধব নৌযান চালু করা যেতে পারে। সেই নৌযানে থাকবে আরামদায়ক কক্ষ, কাচঘেরা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবার, প্রশিক্ষিত গাইড এবং বনের ইতিহাস জানার সুযোগ। নদীর বুকের ওপর ভাসমান কটেজ কিংবা কাঠের নান্দনিক বিশ্রামকেন্দ্র তৈরি করা গেলে বিদেশি পর্যটকেরা প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা পাবেন।
একই সঙ্গে সুন্দরবনের মানুষের জীবনকেও পর্যটনের অংশ করতে হবে। ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সুন্দরবনেও মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটক গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটকেরা তখন শুধু বন দেখবেন না, তারা জানবেন এই বনের মানুষের জীবনসংগ্রাম, নদীর গল্প, মধু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা এবং লোকসংস্কৃতির কথা। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং পর্যটকরাও প্রকৃত সুন্দরবনকে অনুভব করতে পারবেন।
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে যেমন স্থানীয় বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি সাতক্ষীরা ও শ্যামনগর এলাকায় গ্রামীণ আবাসনভিত্তিক পর্যটনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কাঁকড়া, চিংড়ি, খেজুরের রস, গ্রামীণ খাবার, লোকগান কিংবা নদীপাড়ের সন্ধ্যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনকে গবেষণা ও শিক্ষাভিত্তিক পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রবালপ্রাচীর এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করতে যান। সুন্দরবনেও জলবায়ু পরিবর্তন, বাঘ সংরক্ষণ, নদী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে আরও উজ্জ্বল হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গলভিত্তিক পর্যটন এলাকাগুলোতে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা, বিশেষ নিরাপত্তা দল এবং আকাশপথে যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দ্রুত চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ নৌযান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহজ অনলাইন অনুমতির ব্যবস্থা চালু করা গেলে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরেছে। নিউজিল্যান্ডের পাহাড় ও বনভূমি যেমন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকর্ষণ করেছে, তেমনি সুন্দরবনের রহস্যময় সৌন্দর্যও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌ প্রতিযোগিতা, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র উৎসব কিংবা প্রকৃতি বিষয়ক সম্মেলনের আয়োজন করা গেলে সুন্দরবনের পরিচিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা। কোস্টারিকা ও আইসল্যান্ড পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনেও প্লাস্টিকমুক্ত ভ্রমণ, সৌরশক্তিচালিত নৌযান এবং সীমিত পর্যটক প্রবেশের মতো উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সুন্দরবনের প্রকৃতি রক্ষা করেই এর পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখা যায় না।
সুন্দরবন বাংলাদেশের শুধু একটি বন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সুন্দরবন একদিন এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা শুধু একটি বন দেখতে বাংলাদেশে আসবেন না, তারা আসবেন এক বিস্ময়কর জীবন্ত পৃথিবীকে অনুভব করতে। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ত ও আমাদের দায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ত ও আমাদের দায়

একদিকে ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে সচ্ছলতার রঙিন স্বপ্নÑএই দুইয়ের দোলাচলে পড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ পাড়ি জমান প্রবাসে। সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম এবং শুভ কুমার দাসও সেই মিছিলেই শামিল হয়েছেন। কিন্তু লেবাননের নাবাতিয়েহ ও মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যে পরিবারগুলো শেষ সম্বল বসতভিটা বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাঁদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
এই মৃত্যুগুলো কেবল একেকটি সংখ্যা নয়; বরং আমাদের ভঙ্গুর প্রবাসী সুরক্ষা ব্যবস্থার এক একটি ক্ষত। নিহতদের পারিবারিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। শফিকুল ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন মাত্র তিন মাস আগে। নাহিদুল আড়াই মাস আগে জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন পরিবারের অভাব মুছতে। আর শুভ নিজের বসতভিটাটুকু বেচে দিয়েছিলেন এক টুকরো সুখের আশায়। এখন এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর মাথার ওপর কেবল ঋণের বোঝাই পাহাড় সমান নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও জীবনযাপনের পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে।
লেবাননের মতো সংঘাতময় এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার তোয়াক্কা না করে যেভাবে বেসামরিক আবাসস্থলে ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, তা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং চরম জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কেবল নিন্দা বা লাশ ফিরিয়ে আনা কি এই সর্বস্বান্ত পরিবারগুলোর জন্য যথেষ্ট?
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলোÑকোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সরকারি খরচে অতি দ্রুত এই তিনজনের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পরিবারগুলো যে বিপুল অংকের ঋণের জালে আটকে আছে, তা পরিশোধের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এনজিওর মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শফিকুলের দুই মেধাবী মেয়ের পড়াশোনা এবং শুভর ভূমিহীন বাবার আশ্রয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ তহবিল থেকে তাঁদের জন্য এককালীন বড় অংকের অনুদান ও দীর্ঘমেয়াদী ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। লেবাননে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বৈরুত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জোরালো করতে হবে।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, বিদেশের মাটিতে তাঁদের এই অসহায় মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। শফিকুল, নাহিদুল ও শুভর মতো তরুণদের রক্ত যেন কেবল শোকের দলিলে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্র যদি আজ এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে আমাদের সামগ্রিক মানবিক ব্যর্থতা। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুততম সময়ে এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের প্রতি তার প্রকৃত দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেবে।

 

১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার ১০টি জনগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মারাত্মক নদী ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের আবেদন জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। গত ১১ মে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এ সংক্রান্ত একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) প্রদান করেন তিনি।
ডিও লেটারে সাংসদ উল্লেখ করেন, আশাশুনি উপজেলা মারাত্মক নদী ভাঙনকবলিত এলাকা। টেকসই বাঁধের অভাবে অনেক জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আশাশুনি সদর, প্রতাপনগরের কুড়িকাউনিয়া ও হরিশখালি, আনুলিয়ার মনিপুর ও বিছট, বুধহাটা বাজার এলাকা এবং বড়দলের গোয়ালডাঙ্গাসহ ১০টি পয়েন্টে দ্রুত স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর আশা, এই আবেদন বাস্তবায়িত হলে তারা ভিটেমাটি হারানোর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন এবং দীর্ঘদিনের মানবেতর জীবনের অবসান ঘটবে।

একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

আসাদুজ্জামান সরদার: সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই, মেজ ছেলে শুভ দাসকে (২৫) লেবাননে পাঠিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চিতাভস্ম হওয়ার পথে। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন শুভ।
বুধবার সকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে সুরঞ্জনের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে ডুকরে কাঁদছেন মা শিখা দাস। একটি ভ্যানের উপর বসে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা সুরঞ্জন। তার পাশে বসে সান্ত¦না দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশি। প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়ে বাড়িটি শোকাতুর হয়ে উঠেছে। সবার চোখেমুখে একটাই আকুতিÑছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখা।
পেশায় ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস জানান, বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ভিটে হারিয়ে গত তিন বছর ধরে সপরিবারে এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় থাকছেন তিনি। প্রতি মাসে শুভ ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ আর ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা চলছিল।
বিলাপ করতে করতে মা শিখা রানী দাস বলেন, “সংসারের হাল ফেরাতে ছেলেটা বিয়েও করেনি। বলেছিল আরও কিছুদিন থেকে টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরে ঘর বাঁধবে। ভগবান কেন আমাদের কপাল পুড়িয়ে দিল? এখন ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর আমার মানিককেই বা কই পাব?”
শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। কান্নারত কণ্ঠে সে বলে, “রবিবার রাতে দাদার সাথে শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে পারেনি বলে দাদা খুব আফসোস করছিল। দাদাই আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাত। দাদাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এখন আমরা থাকব কোথায়? আমাদের পড়াশোনাই বা হবে কীভাবে?”
প্রতিবেশী সুমন দাস বলেন, শুভ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। এলাকার সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার এই অকাল মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
শুভসহ গত দুই দিনে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার মোট তিনজন প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় ইউপি মেম্বর শাহাদাত হোসেন বলেন, সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিনি এখন পরিবার নিয়ে থাকেন ধানের চাতালের ফেলে রাখা খুপড়ি ঘরে। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভ ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় মারা যাওয়ার খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শুভ’র মরদেহ যেন দেশে আনা হয়Ñআমরা সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি। একইসাথে এই অসহায় পরিবারটি যেন মাথা গোজার ঠাঁই পায় সে ব্যাপারেও সরকার যেন সহায়তা করেন।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সব ধরণের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অভাবের তাড়নায় যে ছেলেকে ভিনদেশে পাঠিয়েছিলেন সুরঞ্জন দাস, এখন সেই ছেলের নিথর দেহটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় কাটছে তাঁর প্রতিটি প্রহর। ঋণের বোঝা আর শোকÑদুইয়ের ভারে ন্যুব্জ এই পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।