সুন্দরবন সুরক্ষা ও আমাদের দায়িত্ব/ তারিক ইসলাম
তারিক ইসলাম
পৃথিবীর বুকে প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময় আমাদের সুন্দরবন। এর বিশাল ম্যানগ্রোভ বনভূমি কেবল আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেই রক্ষা করে না, বরং এটি হাজারো প্রজাতির উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী এবং মৎস্যসম্পদের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের কারণে এই ফুসফুস আজ সংকটের মুখে।
এই সংকট থেকে সুন্দরবনকে বাঁচাতে এবং এর জীববৈচিত্র্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে বন বিভাগ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ০১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই তিন মাস বনের অভ্যন্তরে জেলে, বাওয়াল, মৌয়াল বা গোলপাতা সংগ্রহকারী—কারও প্রবেশাধিকার থাকবে না। একই সাথে বন্ধ থাকবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগমও।
কেন এই নিষেধাজ্ঞা?
জুন থেকে আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী এবং মৎস্যসম্পদের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে সুন্দরবনের নদী-খালে থাকা মাছ ডিম ছাড়ে এবং বনের বাঘ, হরিণ, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী নির্বিঘেœ বংশবিস্তার করে।
বনের ভেতর মানুষের চলাচল, ট্রলারের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলার কারণে স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত হয়। মানুষের এই কোলাহলমুক্ত পরিবেশ পেলে বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে, এই ধরনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ফলে সুন্দরবনের প্রকৃতি আবার নিজের মতো করে সেজে ওঠে এবং বনের প্রাণসম্পদ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস এবং সমগ্র দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রতীক। তাই একে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগের একার নয়, এটি আমাদের সবার জাতীয় দায়িত্ব। এই নিষেধাজ্ঞা সফল করতে আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
আইন ও নিয়ম মেনে চলা: এই তিন মাস বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বাওয়াল, মৌয়াল ও জেলেরা যাতে কোনোভাবেই বনের ভেতর প্রবেশ না করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বনকে তার নিজস্ব গতিতে বাড়তে দেওয়া আমাদের সবার কর্তব্য।
বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা: নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ সময়ে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা থমকে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে যে খাদ্য সহায়তা বা ভিজিডি (ঠএউ) চাল দেওয়া হয়, তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সুষম ও সময়মতো বণ্টন করা হয়, সেদিকে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
পর্যটকদের সচেতনতা: ভ্রমণপিপাসু মানুষ ও পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবন ভালো থাকলে তবেই আমাদের পর্যটন শিল্প ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হবে-এই বোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।
অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে পাহারা: নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো অসাধু চক্র বা শিকারি দল যাতে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করে হরিণ শিকার বা বিষ দিয়ে মাছ ধরতে না পারে, সেজন্য বন বিভাগের পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও স্থানীয় জনগণকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, এখন সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের।”
প্রকৃতির একটি নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে। তিন মাসের এই নীরবতা সুন্দরবনকে তার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং নিজেকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করবে। সাময়িক এই ত্যাগের বিনিময়ে আমরা ফিরে পাব এক সমৃদ্ধ, সবুজ ও প্রাণবন্ত সুন্দরবন। আসুন, বনের এই প্রজননকালকে সম্মান জানাই এবং সুন্দরবন সুরক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি।
তারিক ইসলাম: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












