সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন উপকূলীয় এলাকার কথা আসে সবার আগে। আর সেই তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার নাম নিঃসন্দেহে সাতক্ষীরা। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই জনপদের মানুষ যেন বছরের পর বছর এক অনন্ত দুর্ভোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার আগ্রাসন, অন্যদিকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অবকাঠামো গত দুর্বলতাÑসব মিলিয়ে সাতক্ষীরা এখন জলবায়ু সংকটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অথচ জাতীয় বাজেটে এখনো এই জেলার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ ও স্থায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত হয়নি।
তাই আসন্ন বাজেটে সাতক্ষীরাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার দাবি শুধু যৌক্তিক নয়, অপরিহার্যও। উপকূলের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু সাতক্ষীরার বাস্তবতা অন্য অনেক জেলার চেয়ে কঠিন। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা এই জেলার মানুষকে যে ক্ষত দিয়েছিল, তার অনেক চিহ্ন আজও মুছে যায়নি। এরপর আম্পান, ইয়াস, রেমালসহ একের পর এক দুর্যোগ নতুন করে ক্ষত তৈরি করেছে। বাঁধ ভেঙেছে, গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। বহু মানুষ এখনও টেকসই ঘরবাড়ি পায়নি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু শব্দটি সবচেয়ে বেশি বাস্তব হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরাতেই। সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটগুলোর একটি হলো লবণাক্ততা।
আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটির নিচের পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। সুপেয় পানির জন্য নারীদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। কোথাও কোথাও একটি নিরাপদ পানির উৎসকে ঘিরে শত শত মানুষের নির্ভরতা। নিরাপদ পানির সংকট শুধু জীবন যাত্রাকে কঠিন করছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘ মেয়াদি ও কার্যকর প্রকল্প এখনো পর্যাপ্ত নয়। কৃষিও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে।
একসময় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ মাঠে ধানসহ নানা ফসলের আবাদ হতো। এখন সেই জমির বড় অংশ লবণাক্ততার কারণে অনুৎপাদন শীল হয়ে পড়ছে। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বিকল্প জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন। অনেকে চিংড়ি চাষে যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানেও রয়েছে নানা অনিয়ম ও পরিবেশগত ঝুঁকি। ফলে কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকার মধ্যে এক অস্বাভাবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সাতক্ষীরার মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। কিন্তু বাস্তবে সেই বাঁধই অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ও অরক্ষিত।
সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই ভেঙে যায় কোথাও কোথাও। প্রতি বছর সংস্কারের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও টেকসই সমাধান মিলছে না। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই অনেক বাঁধ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে দুর্যোগ এলেই মানুষকে আবারও একই দুর্ভোগে পড়তে হয়। জাতীয় বাজেটে তাই শুধু বরাদ্দ নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সাতক্ষীরার সামাজিক কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। জীবিকা হারিয়ে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে।
পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, বাড়ছে শিশুদের শিক্ষাছুট। নারীরা নানা ধরনের অনিরাপত্তার মুখে পড়ছেন। অথচ জলবায়ু সংকটকে কেন্দ্র করে সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তার বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑসাতক্ষীরার সংকট কোনো এক জেলার সংকট নয়। এটি জাতীয় সংকট। সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল। এই বন ও উপকূল রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে দেশের বড় অংশ আরও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সাতক্ষীরায় বিনিয়োগ মানে শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; বরং দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। জাতীয় বাজেটে সাতক্ষীরার জন্য বিশেষ জলবায়ু তহবিল গঠন করা যেতে পারে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান, আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য আলাদা বরাদ্দ জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা গুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে জলবায়ু ঝুঁকির কথা তুলে ধরে সহায়তা চায়। কিন্তু দেশের ভেতরে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য যদি কার্যকর উদ্যোগই নেওয়া না হয়, তবে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। সাতক্ষীরার মানুষ বছরের পর বছর প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে আছেন। তাদের এই সংগ্রামকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। সেই অগ্রাধিকারে সাতক্ষীরার নাম এবার সবার ওপরে থাকা উচিত। কারণ উপকূল বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
লেখক: সংববাদকর্মী